কঠোর অধ্যবসায়েই বুয়েটের শিক্ষক হন নাহিদ

জাগো নিউজ ডেস্ক
জাগো নিউজ ডেস্ক জাগো নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৩:৫৫ পিএম, ০৩ জুলাই ২০২১

আহাদুজ্জামান নাহিদের জন্ম ১৯৯১ সালের ৫ জুন। বাবা হানিফ মাহামুদ পেশায় শিক্ষক। মা মাজেদা বেগম গৃহিণী। মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার স্নানঘাটা গ্রামের স্নানঘাটা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন নাহিদ। মাদারীপুর সরকারি কলেজ (সরকারি নাজিমুদ্দিন কলেজ) থেকে এইচএসসি পাস করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ভর্তি হন। শিক্ষাজীবন শেষ করে বুয়েটে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের কেমিকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।

সম্প্রতি তার ক্যারিয়ার, সফলতা ও ভবিষ্যৎ স্বপ্নের গল্প শুনিয়েছেন জাগো নিউজকে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মমিন উদ্দিন

জাগো নিউজ: আপনার ছোটবেলা কেমন কেটেছে?
আহাদুজ্জামান নাহিদ: ছোটবেলায় খুব দুরন্ত ছিলাম। খেলাধুলা নিয়েই সারাদিন ব্যস্ত থাকতাম। স্কুল ছুটির পর কোনোভাবে খেয়েই রোজ বিকেলে মাঠে নেমে পরতাম। গোল্লাছুট, ক্রিকেট, ভলিবল, দাঁড়িয়াবান্ধাসহ কোনো খেলাই যেন বাদ যেত না। বর্ষায় জ্যোৎস্না রাতে নৌকায় ঘুরে বেড়ানো, বাড়ির সামনের ব্রিজের উপর থেকে লাফানো, আমের দিনে গাছের মগডালে বসে আম খাওয়া, গরমের দিনে বাইরে পাটি বিছিয়ে হারিকেনের আলোয় পড়তে বসে ঝিঁ-ঝিঁ পোকার ডাক শোনা আজও হৃদয় ছুঁয়ে যায়। পড়াশোনায় তখন খুব বেশি মনযোগী ছিলাম না। যদিও উচ্চ বিদ্যালয়ে ক্লাস রোল সব সময় এক (প্রথম) ছিল। সব মিলিয়ে ভালোই কেটেছে ছোটবেলা।

jagonews24

জাগো নিউজ: পড়াশেনায় কোন প্রতিবন্ধকতা ছিল কি?
আহাদুজ্জামান নাহিদ: পড়াশোনায় প্রতিবন্ধকতা ছিল অনেক। আমি বেড়ে উঠেছি গ্রামে। গ্রামের কাচা রাস্তা বর্ষায় তলিয়ে যেত। বর্ষায় স্কুলে যেতে খুব কষ্ট হতো। গ্রামে মানসম্মত শিক্ষা পাওয়া সম্ভব ছিল না। স্কুল পেরিয়ে কলেজে ভর্তি হলাম। তা-ও বাসা থেকে অনেক দূরে। যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল অনেক খারাপ। বাড়ি থেকে গিয়ে ক্লাস করা সম্ভব ছিল না। আবার কলেজের আশেপাশে ছোট্ট একটা মেসে বাবা-মাকে ছেড়ে একা থাকা জেলখানার মতো মনে হতো। মেসে খাবার না থাকায় মাঝেমধ্যে না খেয়েও থাকতে হয়েছে। যৌথ পরিবারে একমাত্র আয়ের উৎস ছিলেন আমার বাবা। আমাদের সব ভাই-বোনের পড়াশোনার খরচ চালানো খুবই কষ্টকর ছিল। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়—সব জায়গায়ই আর্থিক অনটনের মধ্যে পড়াশোনা করতে হয়েছে।

jagonews24

জাগো নিউজ: বুয়েটে পড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন কখন থেকে?
আহাদুজ্জামান নাহিদ: বুয়েট নিয়ে আমার গল্পটা খুবই ইন্টারেস্টিং। গ্রামে বেড়ে ওঠার কারণে স্কুলজীবনে আমার উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা ছিল না। কলেজের দ্বিতীয় বর্ষে ঢাকার একটি ভর্তি কোচিংয়ের লোক আমাদের ক্লাসে গিয়ে কোচিংয়ে ভর্তি হতে বললেন। সবার মতো আমিও ডাক্তার হওয়ার মত পোষণ করলাম। বিধিবাম, আমার এসএসসির রেজাল্ট খারাপ থাকায় তারা আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং করতে বললেন। কিন্তু সেখানেও ভর্তি পরীক্ষায় এসএসসি রেজাল্ট কাউন্ট হয়। বিধায় আমার চান্স পাওয়ার আশা ক্ষীণ। শুনেছি, বুয়েটে না-কি এসএসসি কাউন্ট হয় না। এছাড়া বুয়েট কোচিংয়ে ভর্তি হতে ২৫০০ টাকা ছাড় পাওয়া যাবে। এর জন্য এক বন্ধুর মাধ্যমে বুয়েট কোচিংয়েই ভর্তি হলাম। শুনেছি বুয়েট খুব ভালো। কিন্তু এটা যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়, তা জেনেছি এখানে চান্স পাওয়ার পর। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় কী—এ সম্পর্কেও তেমন কোনো ধারণাই ছিল না।

পড়াশোনার কোনো স্তরেই আমার নিজেকে সেরা মনে হয়নি। স্কুল ছেড়ে কলেজে আসার পর দেখি আমার রেজাল্ট সবার থেকে কম। এত এত ভালো ছাত্রের ভিড়ে নিজেকে তুচ্ছই মনে হতো। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আমার কলেজ থেকে একমাত্র আমিই বুয়েটে চান্স পেয়েছিলাম। কলেজ ছাপিয়ে বুয়েটে আসার পর এখানে তো আরও ভালো ছাত্রের ছড়াছড়ি। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ‘ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট’ হবো—এটি আমার কল্পনারও অতীত ছিল। আসলে অধ্যবসায়ের পাশাপাশি আল্লাহর কাছে চাইলে, আল্লাহ কাউকে নিরাশ করেন না। আমি জীবনের প্রতিটি ধাপে এটা উপলব্ধি করতে পেরেছি।

jagonews24

জাগো নিউজ: আপনার কর্মজীবনের গল্প শুনতে চাই—
আহাদুজ্জামান নাহিদ: আমার বাবা শিক্ষক হওয়ার কারণে শিক্ষকতা পেশার প্রতি আমার আগ্রহ সব সময়ই বেশি ছিল। কাউকে কিছু শেখানোর জন্য নিজেকে উজাড় করে দিতে খুব ভালো লাগে। আমার কর্মজীবন শুরু হয়েছিল বুয়েটের কেমিকৌশল বিভাগের প্রভাষক হিসেবে। সময়ের সাথে সাথে এখন পদোন্নতি পেয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে আছি। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে থাকতে ভালো লাগে। ক্লাস নেওয়া, খাতা দেখা, প্রশ্ন করা, কিছু টেস্টিং-কনসালটেন্সি ও গবেষণার কাজ করেই দিন কেটে যায়। সব মিলিয়ে ভালোই চলছে কর্মজীবন।

jagonews24

জাগো নিউজ: আপনি কর্মজীবনের পাশাপাশি সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত, কিভাবে সামলাচ্ছেন?
আহাদুজ্জামান নাহিদ: আমি সব সময় চাই—সামাজিক বিভিন্ন ভালো এবং উন্নয়নমূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে। এর জন্য যখনই সময় পাই, চেষ্টা করি সবার সাথে যোগাযোগ করার। দূরে থেকেও অনলাইনে মিটিং করে বিভিন্ন কাজের উদ্যোগ নেই। সেই কাজগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করি। অনেক সময় অফিসের কাজ শেষ করে সামাজিক কর্মকাণ্ডগুলো নিয়ে চিন্তা করি। কাজগুলোর ফলোআপ করি। যখন বাড়িতে যাই ছুটিতে; তখন বেশিরভাগ সময় নিজেকে ব্যস্ত রাখি কাজগুলোর বাস্তবায়নে। ছোটবেলায় আমার গ্রাম থেকে উচ্চশিক্ষার ব্যাপারে যেমন কোনো সহযোগিতা, পরামর্শ পাইনি। আমি চাই আমার অনুজরা যাতে আমাদের কাছ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা পায়। এ লক্ষ্যে গ্রামের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রদের নিয়ে ‘আলোকিত স্নানঘাটা’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেছি। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে আমি মনে করি, সবার আগে উচিত আমাদের সমাজের মানুষগুলোকে স্বশিক্ষিত করে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। আলোকিত মানুষ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে আলোকিত স্নানঘাটা বিভিন্ন শিক্ষামূলক কাজসহ সমাজসেবা মূলক করে যাচ্ছে। স্বপ্ন দেখি সেই দিনটির; যেদিন সবাই সবাইকে ভালোবেসে সম্মান দিয়ে বেঁচে থাকতে শিখবে।

jagonews24

জাগো নিউজ: কারো কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন কি?
আহাদুজ্জামান নাহিদ: অনুপ্রেরণা তো অবশ্যই পেয়েছি। না হলে এতদূর আসা অনেক কঠিন হয়ে যেত। সবছেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা পেয়েছি মা-বাবার কাছ থেকে। সেইসাথে আমার পরিবারের সবাই এবং আশেপাশের অনেকেই উৎসাহিত করেছেন। শত প্রতিকূলতার মাঝেও বাবা-মা সাপোর্ট দিয়ে গেছেন। এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট আশানুরূপ না হওয়ায় আমি বুয়েটে পড়ার স্বপ্ন কিভাবে দেখি—এ নিয়ে আত্মীয়-স্বজনরা মাকে অনেক কটুকথা শুনিয়েছেন। আমার মা নীরবে কেঁদেছেন। আমাকে বুঝতে দেননি। নিজেরা কষ্ট করে আমার পড়াশোনার জন্য টাকা পাঠিয়েছেন। বাবা-মায়ের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সীমাহীন সাপোর্টের কারণেই আমি আল্লাহর রহমতে এতদূর আসতে পেরেছি।

জাগো নিউজ: কর্মস্থল ও নিজের সামাজিক কাজ নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
আহাদুজ্জামান নাহিদ: কর্মজীবনে অবশ্যই সততার সাথে সফল হতে চাই। সারাজীবন চেষ্টা করব একজন ভালো শিক্ষক হয়ে শিক্ষার আলো চারিদিকে ছড়িয়ে দিতে। ভালো একজন গবেষক হয়ে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখতে চাই। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নের চেষ্টা করে যাব। সামাজিক কাজ নিয়েও ভবিষ্যতে অনেক পরিকল্পনা আছে। আমি চাই, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রতিটি জায়গায় এ ধরনের সামাজিক সংগঠন এবং সমাজসেবামূলক কাজগুলো ছড়িয়ে দিতে।

jagonews24

জাগো নিউজ: সাম্প্রতিক করোনা দুর্যোগে আপনার ভূমিকা কী?
আহাদুজ্জামান নাহিদ: সাম্প্রতিক করোনা দুর্যোগের শুরু থেকেই আমরা সংগঠনের মাধ্যমে এলাকার মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করেছি। সবার মাঝে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য গ্রামের একঝাক তরুণ নিয়ে বিভিন্ন কাজ করেছি। কোভিডের সময় সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ এবং মাইকিং করেছি। বিনা মূল্যে মাস্ক বিতরণ করেছি। বিনা মূল্যে কিছু মানুষের চক্ষুসেবার ব্যবস্থা করেছি। এলাকার অসহায় ৩৩০টির বেশি পরিবারকে ত্রাণ দিয়েছি। এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছি। সবাইকে আরও বেশি সচেতন করতে চাই এ দুর্যোগে।

এসইউ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]