শরীয়তপুরের ইদ্রিসের মৃত্যুদণ্ড
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শরীয়তপুরের পলাতক ইদ্রিস আলী সরদারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ফায়ারিং স্কোয়াডে বা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে তার দণ্ড কার্যকর করতে বলা হয়েছে ট্রাইব্যুনালের আদেশে।
বিচারপতি মো. আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের ভিত্তিতে সোমবার এ আদেশ দিয়েছেন।
ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন, বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মদ সোহরাওয়ারদী।
ইদ্রিসের বিরুদ্ধে মোট চারটি অভিযোগ ছিল। এক ও দুই নম্বর অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে, তিন নম্বর অভিযোগে তাকে দেয়া হয়েছে আমৃত্যু কারাদণ্ড। এছাড়া ৪ নম্বর অভিযোগে তাকে ৭ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। সকাল ১০টা ৩৫ মিনিট থেকে ট্রাইব্যুনাল ৪৮৬ পৃষ্ঠার রায়ের সংক্ষিপ্ত অংশ পাঠ করেছেন বিবচারকরা।
ঘোষিত রায়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান মো. আনোয়ারুল হক ও বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে রায় দেন। অপর সদস্য বিচারপতি মোহাম্মদ সোহরাওয়ারদী রায়ের ব্যাখ্যায় ভিন্ন মত পোষণ করেছেন বলে জানান আদালত।
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এটি হলো ট্রাইব্যুনালের ২৭তম রায়। এর আগে আরো ২৬টি রায় ঘোষণা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
রায় ঘোষণার সময় রাষ্ট্রপক্ষে চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, মো. আলতাফ উদ্দিন আহমেদ, জেয়াদ আল মালুম, সুলতান মাহমুদ সিমন, মোখলেসুর রহমান বাদল, সাবিনা ইয়াসমিন খান মুন্নি, রেজিয়া সুলতানা চমন, ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন, শেখ মুসফিকুর রহমান ও তাপস কান্তি বল উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষে ছিছেন আইনজীবী গাজী এমএইচ তামিম।
মামলার দুই আসামির মধ্যে সোলায়মান মোল্লা ওরফে সোলেমান মৌলভী গ্রেফতারের পর অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়ায় তাকে মামলার দায় থেকে বাদ দেয়া হয়েছে আগেই। অপর আসামি ইদ্রিস আলী সরদার পলাতক।
গত বছরের ১৪ জুন সোলায়মান-ইদ্রিসের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। ওইদিনই রাতে গোয়েন্দা পুলিশ সোলায়মান মোল্লাকে গ্রেফতার করলেও ইদ্রিস সরদার পলাতক।
২০১৫ সালের ২৯ অক্টোবর তাদের বিরুদ্ধে সাত খণ্ডে ৮৫২ পৃষ্ঠার তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে তা প্রসিকিউশনে হস্তান্তর করা হয় তদন্ত সংস্থার পক্ষ থেকে।
ওই বছর ১৬ নভেম্বর প্রসিকিউশন দুই আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর ২২ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নেয়।
চলতি বছরের ২ মে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, লুন্ঠন, অগ্নিসংযোগসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের চারটি অভিযোগে সোলায়মান-ইদ্রিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। পরে ২ নভেম্বর মামলার সর্বশেষ ধাপ উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) উপস্থাপন শেষ করার পর রায় ঘোষণার জন্য (সিএভি) অপেক্ষমান রাখা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেছেন প্রসিকিউটর হৃষিকেশ সাহা ও প্রসিকিউটর সাবিনা ইয়াসমিন খান মুন্নি রাষ্ট্রপক্ষে এবং সোলায়মানের পক্ষে তার আইনজীবী গাজী এমএইচ তামিম ও পলাতক ইদ্রিসের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আব্দুশ শুকুর খান।
২০১০ সালে শরীয়তপুরের যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সামাদ তালুকদার রাজাকার সুলেমান ও ইদ্রিস আলী সরদারসহ আরো সাতজনের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেন।
শরীয়তপুরের পালং উপজেলার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাশিপুর মুসলিম পাড়ার মৃত চাঁন মোল্লার ছেলে সোলায়মান মোল্লা (৮৯)ও একই উপজেলার মাহমুদপুরের মৃত হামিক আলী সরদারের ছেলে ইদ্রিস আলী সরদার (৬৭)।
অভিযোগ রয়েছে, সোলায়মান মোল্লা ১৯৭১ সালে পাকিস্তান দখলদার বাহিনীকে সহযোগিতা করার জন্য শান্তি কমিটি এবং সশস্ত্র রাজাকার বাহিনী গঠন করেছেন। এরপর স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় শরীয়তপুরে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুন্ঠন, অগ্নিসংযোগসহ সব ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ করেন।
সোলায়মান মোল্লা ১৯৬৩ সালের পর মুসলিম লীগের নেতা হিসেবে শরীয়তপুর জেলার পালং থানার সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
ইদ্রিস আলী সরদার ওরফে গাজী ইদ্রিস ১৯৭১ সালে শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়ে মানবতাবিরোধী একই রকম অপরাধ করেন। তিনি ১৯৬৯ সালে জামায়াতের ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র সংঘের নেতা ছিলেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ইদ্রিস ইসলামি ছাত্রসংঘের সক্রিয় কর্মী ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তারা মাদানরীপুরের এআর হাওলাদার জুট মিলে রাজাকার হিসেবে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তাদের সহায়তায় পাকিস্তানি সেনারা এলাকার কয়েকশ’ নারী-পুরুষকে গুলি করে হত্যা করে। নারীদের হত্যার আগে ক্যাম্পে নিয়ে পৈশাচিক নির্যাতন চালানো হতো।
একাত্তরের ২২ থেকে ২৫ মে পর্যন্ত তাদের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে শরীয়তপুর সদর উপজেলার তখনকার পালং থানার আংগারিয়া, কাশাভোগ, মানোহর বাজার, মধ্যপাড়া, ধানুকা, রুদ্রকরসহ হিন্দু প্রধান এলাকাগুলোতে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ করা হয়।
ওইসব গ্রামের ৯ জনকে হত্যায় সহায়তা করেন আসামিরা। তারা শহীদদের অবস্থান দেখিয়ে দেন, পরে পাকিস্তানি সেনা সদস্যরা ব্রাশফায়ার করে হত্যাকাণ্ড চালায়। তিন শতাধিক বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও নারীদের ধর্ষণ করা হয়।
এফএইচ/এনএফ/এমএস