প্রধান বিচারপতির সকল অনুষ্ঠান বর্জনের ঘোষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:১১ পিএম, ২৪ আগস্ট ২০১৭
প্রধান বিচারপতির সকল অনুষ্ঠান বর্জনের ঘোষণা

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহার সকল অনুষ্ঠান বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সদস্যরা।

বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনের দক্ষিণ হলে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ কর্তৃক আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে এ ঘোষণা দেন সংগঠনটির সদস্য সচিব ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস।

তিনি বলেন, আজ ষষ্ঠদিনের কর্মসূচি চলছে। প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা সাহেবের অপ্রাসঙ্গিক ও অগণতান্ত্রিক বক্তব্যগুলো এক্সপাঞ্জ করার যে সুনির্দিষ্ট আহ্বান আমরা রেখেছিলাম, সেদিন আজ শেষে হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট ছুটিতে (অবকাশে) যাচ্ছে। আগামী ৩ অক্টোবর ফের আমাদের কর্মজীবন শুরু হবে। আমাদের আন্দোলন চলবে, সংগ্রাম চলবে এবং একদফা যে দাবি সেই দাবি আমরা ফলপ্রসূ করব।

তিনি আরও বলেন, আমি সুনির্দিষ্টভাবে বলতে চাই, আমাদের বিচারাঙ্গন যারা কলঙ্কিত করছেন, বিচারাঙ্গনকে যারা সংসদের সঙ্গে, নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক করে তোলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তাদের বিরুদ্ধে আমাদের এ আন্দোলন। ষড়যন্ত্র নির্মূলে আমাদের সংগঠনের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। আমরা বিশ্বাস করি, আইনজীবীরাই এ সংগ্রামের নেতৃত্ব দেবেন। ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে আইনজীবীরা যেভাবে সংগ্রাম করছেন, সারাদেশের মানুষের তাতে সমর্থন আছে।

উপস্থিত আইনজীবীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তাপস বলেন, আমরা এসকে সিনহা সাহেবের সকল কর্মকাণ্ড, কর্মসূচি অবশ্যই বর্জন করব, প্রত্যাখ্যান করব এবং পরিহার করব। কোনো আইনজীবী তার (প্রধান বিচারপতি) কোনো প্রোগ্রামে যাবেন না।

তিনি বলেন, সামনে আরও আন্দোলন হবে, আমাদের এক দফা, এক দাবি। তিনি তো (প্রধান বিচারপতি) এখনও অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করেননি, এরই মাঝে তিনি তার শপথও ভঙ্গ করেছেন। শপথ ভঙের কারণে তিনি আর এই পদে আসীন থাকতে পারেন না। একজন বিচারপতি তার বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার সময় আরেকটি সাংবিধানিক পদের কাউকে অব্যাহতির যে ধৃষ্টতা দেখিয়েছিন, সেটি শুধু শপথ ভঙ্গই নয়, রাষ্ট্রদ্রোহিতারও শামিল। সুতরাং সেই পরিপ্রক্ষিতে একজন বিচারপতির যে কোড অব কনডাক্ট রয়েছে, সেটি পালনপূর্বক তিনি অচিরেই তার পদ থেকে পদত্যাগ করবেন- সেই সুনির্দিষ্ট দাবি আমরা রাখছি।

রায়ের প্রসঙ্গ টেনে ব্যারিস্টার তাপস বলেন, তিনি রায়ে বলেছেন, শ্রীলঙ্কাতে ২০১৩ সালে যে বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল তা আমাদের বাহাত্তরের সংবিধানে ছিল। একই ধারা ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যেও আছে। সেই ধারা পরিপালনপূর্বক শ্রীলঙ্কাতে প্রধান বিচারপতিকে সরানো (ইমপিচ) হয়েছে।

রায় প্রদানকারী বিচারপতিগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, কার জন্য তারা (দেশের বিচারপতিগণ) এত ভীত। রায় দেয়ার সময় কেউ যদি রাগ-বিরাগ বা ভীত হয়ে রায় দেন, সেই রায় কোনোদিনও আইনসিদ্ধ হতে পারে না এবং সেটিও আইন ভঙ্গের শামিল। সুতরাং সবদিক থেকে আপনারা অযোগ্য হয়ে গেছেন।

প্রধান বিচারপতির উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, পদটি ধরে রাখার আপনার আর কোনো যোগ্যতা নেই। আগামী অক্টোবরের আগেই আপনি এ পদ থেকে চলে যাবেন। এটাই আমাদের দাবি। তা না হলে অক্টোবর থেকে সারা বাংলাদেশব্যাপী দুর্বার আন্দোলন গেড়ে তোলা হবে।

‘আরেকটি বিষয় বলছি, তারা (রায় প্রদানকারী বিচারপতিগণ) বলেছেন, তারা নাকি সংবিধানের অভিভাবক। আপনারা প্রিয়েম্বলটি (সংবিধানের প্রারম্ভিকঅংশ) ভালো করে পড়ে দেখবেন। সেখানে স্পষ্ট বলা আছে, সংবিধানের রক্ষা-প্রতিরক্ষা শুধুমাত্র জনগণই করবে, জনগণই অভিভাবক এবং জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদ অভিভাবক হবেন। মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্রের মূল ধারা হলো অব দি পিপল, বাইদি পিপল, ফর দি পিপল। সুতরাং সেই ধারার আলোকে আপনাদের (বিচারপতি) অভিভাবক হওয়ার প্রয়োজন নেই। বাংলার জনগণ সচেতন আছে। তারাই অভিভাবক এবং সেই অভিভাবকরাই আন্দোলনের মাধ্যমে আপনাকে সেই পদ থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য করবে’- যোগ করেন ব্যারিস্টার তাপস।

আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম বলেন, এসকে সিনহা যে কর্মসূচিতে যাবেন সেই কর্মসূচি আমরা পরিহার করব। ঢাকা বারে জন্মাষ্টমীর আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানকার আইনজীবীরা বলেছিলেন, উনি (প্রধান বিচারপতি) আসলে আমরা তার গাড়ির সামনে শুয়ে পড়ব। সেই অনুষ্ঠান ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশন বাতিল করেছে। তিনি কি এর ভাষা বুঝতে পারছেন না? তিনি তো রায় দেয়ার একক অধিকারী নন।

‘তিনি (প্রধান বিচারপতি) কথায় কথায় যে ভারতের তুলনা করেন সেই ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায় তাদের সংসদ বাতিল করে দিয়েছিল। সেটি এসকে সিনহার না জানার কথা নয়। যদি সংসদ মনে করেন, উনি যে রায় দিয়েছেন তা অসঙ্গতিপূর্ণ, অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত তাহলে এ রায় তো সংসদও (বাংলাদেশ) বাতিল করে দিতে পারে।’

আমাদের সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, যদি অন্য কোনো আইন প্রণয়ন করা হয়, যে আইন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তাহলে যতটুকু সাংঘর্ষিক ততটুকুই বাতিল করা হবে। সেখানে অন্য শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের সংসদ তো অন্য কোনো আইন প্রণয়ন করেনি। আমাদের সংসদ সংবিধানে যেটা ছিল সেটাকে পুনরায় ফেরত এনেছে। সেটা অন্য কোনো আইন নয়। কাজেই সংবিধানের সঙ্গে এটাকে আলট্রা ভায়ার্স (নিয়মবিরূদ্ধ) করার সুযোগ ছিল না।

তিনি বলেন, আমাদের প্রধান বিচারপতি মেলাফাইড (বিশ্বাসঘাতকভাবে) কাজ করেছেন। আপনারা আইনজীবীরা বাইরের মানুষদের বলবেন, সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ নিয়ে চ্যালেঞ্জ ছিল। প্রধান বিচারপতি সেটাতে হ্যাঁ/না বলতে পারেন। কিন্তু প্রধান বিচারপতি সেখানে ১১৬ অনুচ্ছেদকে বাতিল করে ফেলেছেন। যে অনুচ্ছেদ নিয়ে আদৌ কোনো রুল হয়নি, যেখানে হাইকোর্ট কোনো সার্টিফিকেট ইস্যু করেনি। অথচ সেটিই তিনি বাতিল করেছেন।

রেজাউল করিম আরও বলেন, রায়ের একটি জায়গায় বেশ আপত্তিকর কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি কথাটা লাগানো নাকি আলট্রা ভায়ার্স (নিয়মবিরূদ্ধ) হয়েছে। তাহলে রাষ্ট্রপতির উপরে কি প্রধান বিচারপতি আপনি বসতে চান? সেজন্য প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আপনি রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকেও কেড়ে নিতে চান! তাহলে যদি ভবিষ্যতে কোনো প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দিতে হয় তাহলে বাবু এসকে সিনহা আপনি নিজেই কি তাকে নিয়োগ দেবেন? এ সংশয় আমাদের থেকেই যায়।

রাষ্ট্রপতির বিষয় যেখানে ছিল না সেখানে রাষ্ট্রপতির বিষয় টেনে আনায় আপনার মেলাফাইড আমাদের কাছে পরিষ্কার। আমরা দ্ব্যার্থহীনভাবে বলতে চাই, মানুষের ভাষা বুঝতে হবে। সারাদেশের মানুষের আবেগ বুঝতে হবে। সংবিধানে অপ্রাসঙ্গিক, অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত যেসব মন্তব্য রয়েছে তা বাতিল করতে হবে। বাতিল না হলে যে পরিণতি হবে সেই পরিণতির দায়-দায়িত্ব আপনাকে বহন করতে হবে’- যোগ করেন রেজাউল করিম।

সংগঠনটির আহ্বায়ক সুপ্রিম কোর্ট বারের সাবেক সভাপতি আইনজীবী ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, আমি দুটি কথা বলতে চাই। প্রথম কথা হলো: ভারতে একটি উদাহরণ আছে, সেখানে শরিয়া আইনের ওপর সুপ্রিম কোর্ট একটি রায় দিয়েছিল। সেখানকার সংসদ (লোকসভা) সেই আইন বাতিল করেছে। এটা আমাদের মনে রাখতে হবে। কাজেই, এখানে আমাদের পার্লামেন্ট ইচ্ছা করলে সেই কাজ করতে পারবে। সেই অধিকার বাংলাদেশ পার্লামেন্টের আছে।

‘আরেকটি কথা হলো এই যে, আমাদের সংবিধান অনুসারে জনগণ সকল ক্ষমতার অধিকারী। সংবিধানে বলা আছে, ক্ষমতাটা সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে ব্যবহার হবে এবং এই সংসদ রাষ্ট্রপতিকে নির্বাচিত করবেন। রাষ্ট্রপতি তাহলে কাকে শপথ পড়িয়েছিলেন? অত্যন্ত ধৃষ্টতা দেখিয়ে ফেলেছেন আপনি (প্রধানবিচারপতি)!’

তিনি আরও বলেন, একজন অবসরপ্রাপ্ত আপিল বিভাগের বিচারপতি একটি টকশোতে বলেছেন, পাঁচজন বিচারপতি ওই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে একমত হননি। সুতরাং সেই প্রেক্ষাপটে ধরা যায়, এই পর্যবেক্ষণ আপনি (প্রধান বিচারপতি) একা দিয়েছেন। আপনাকে অবশ্যই বন্ধের (সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ) মধ্যেই এই পর্যবেক্ষণ প্রত্যাহার করতে হবে। তা না হলে, আমরা যে কর্মসূচি দেব সেটা আপনি ভাবতেও পারছেন না। আইনজীবী সমাজকে নিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, এগিয়ে যাব।

ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেলকে পাকিস্তানের একটি রায়ের কথা বলেছেন। আপনাকে (প্রধান বিচারপতি) দেশের মানুষের পক্ষ থেকে একটি কথা বলতে চাই, এটি বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ, পাকিস্তানিদের দেশ নয়।

সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য সানজিদা খানম, নূর ইসলাম সুজন, আইনজীবী লায়েকুজ্জামান মোল্লা, আইনজীবী আজহারুল হক ভূঁইয়া প্রমুখ।

এফএইচ/এমএআর/আইআই