মায়াবতী : পর্ব ১২

মোহিত কামাল মোহিত কামাল , কথাসাহিত্যিক, মনোচিকিৎসক
প্রকাশিত: ০৬:০১ পিএম, ২৪ জুলাই ২০২১

কথাসাহিত্যিক মোহিত কামালের মায়াবতী বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয় মনোবৈজ্ঞানিক উপন্যাস। সাহিত্যের শব্দবিন্যাসে তিনি ব্যবহার করেছেন মনস্তত্ত্ব, সমাজের আড়ালের চিত্র। মা প্রত্যক্ষ করেছেন, মেয়েরা নানাভাবে উৎপীড়ন ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, সহজে মুগ্ধ হয়ে অবিশ্বাস্য পাতানো ফাঁদে পা দেয়। মায়ের একান্ত চাওয়া মেয়ে ক্যারিয়ার গড়ে তুলুক। বিধিনিষেধ আরোপ করেন মা। মেয়ে তখন মনে করে, মা স্বাধীনতা দিতে চায় না, বিশ্বাস করে না তাকে। মায়ের অবস্থানে মা ভাবছেন তিনি ঠিক। মেয়ের অবস্থানে মেয়ে ভাবছে, সে ঠিক। মায়ের ‘ঠিক’ এবং মেয়ের ‘ঠিক’র মাঝে সংঘাত বাধে। সংঘাত থেকে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়, ভুল করে বসে মেয়ে রিয়া। পালিয়ে যায় ঘর থেকে। এই ‘ভুল’ই হচ্ছে উপন্যাসের মূলধারা, মূলস্রোত। মায়াবতী পড়ে চিন্তনের বুননে ইতিবাচক গিঁট দেয়ার কৌশল শেখার আলোয় পাঠক-মন আলোকিত হবে। জানা যাবে টিনএজ সমস্যা মোকাবিলার কৌশল। জাগো নিউজের পাঠকের জন্য ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে সাড়া জাগানো উপন্যাসটি—

খালু ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়েছেন। তার টিনএজের দুরন্ত সময়ের সিন্দুক খুলেছেন অভিজ্ঞ হাতে। খুলেছেন দেহের পাপড়ি। একে একে খুলে খুলে ফুটিয়ে দিয়েছেন যৌবনগোলাপ। গোলাপের ঘ্রাণ নিয়েছেন। কখনো জোর করেননি। বরং নেশায় মাতিয়ে দিয়েছিলেন রাহেলাকে।

নেশার টানে ছুটে যেত রাহেলা।
একদিন মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে।
পড়ার রুমের আলো নিভে গেছে। রুমের পাশে জানালা। বাইরে থেকে রুমের ভেতর ঢুকছে আলো। আঁধার আলো। পাশের রুমে নূপুর ঘুমাচ্ছে। খালার ঘরে ঘুমাচ্ছেন তিনি। বুয়ার ঘরে ঘুমাচ্ছে বুয়া। নিস্তব্ধ রাত। নিস্তব্ধ জগৎ। নিস্তব্ধতার প্রাচীর ভেদ করে জেগে উঠছে দেহের শব্দ। দেহের পাপড়ি খোলার শব্দে জেগে উঠছে মধ্যরাতের নীরবতা। হাজারো ঊর্মিমালার গোপন উল্লাস বয়ে যাচ্ছে দেহের অণুতে, পরমাণুতে। খালুর কৌশলী অভিজ্ঞ হাতের ছোঁয়ায় খসে পড়েছে শেষ সুতোটুকু।

আচমকা নৈঃশব্দ্যের শব্দ উল্লাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে চারপাশ।
কালো মূর্তির মতো পাশে এসে দাঁড়ায় নূপুর।
একবার একটি শব্দ উচ্চারণ করে সে, বাবা!
বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয় রাহেলা। বরফের মতো জমে যায় খালু। সব শেষ।
নূপুর মুখ খোলেনি। খালা কিছুই জানেননি। পৃথিবীর আর কেউ কিছু জানেনি। কেবল নূপুর জেনেছে। নূপুর শেষ হয়ে গেছে। সে মানসিক রোগী। দিনের পর দিন পড়ে থাকে মানসিক হাসপাতালে।

খালু নেই। খালা নেই। নূপুরের কেউ ছিল না। নিজের জীবনের পচা দুর্গন্ধের সাক্ষী হয়ে বেঁচে ছিল নূপুর। নূপুরকে দেখাশোনা করেছে রাহেলা। একদিন নূপুরও চলে গেছে। কোনোদিন মুখ খোলেনি নূপুর। এ মুহূর্তে নূপুরের কথা মনে পড়ছে। চোখ বেয়ে নেমে আসছে অশ্রুকণা।

রাহেলা চৌধুরি দুলছেন। অতীত আর বর্তমান তার কাছে একাকার হয়ে গেছে।
এ সময় শেফালি এসে ডাক দেয়, আপা।
রাহেলা নড়ে ওঠেন। হাত দিয়ে চোখ মোছেন। সহজ হয়ে বলেন, কী বলবে, বলো।
কুসুম মাকে ডাকব?
কেন? কুসুমকে ডাকবে কেন?
তাইলে আপনে যান। মেহমানের সঙ্গে গল্প করেন।
রাহেলা তীক্ষ্ম চোখে দেখেন শেফালিকে।

শেফালি সামনে থেকে সরে যায়। গৃহকর্ত্রীর সুখী জীবনে আরেক চামচ বিষ ঢেলে দিয়ে সে শান্তি পায়।
জীবনের পোড়-খাওয়া অভিজ্ঞতার কারণে রাহেলা চৌধুরি ভয় পান। ভয়ের চক্রবৃত্তে ঘুরপাক খায় তার বিশ্বাস। আচরণ। কথাবার্তা। গোপন অভিজ্ঞতা তাকে গোপনে চালায়। তিনি জানেন না এ গোপন প্ররোচনার খবর। রিয়ার প্রতি তার কোনো অবিশ্বাস নেই। সচেতন মন রিয়াকে বিশ্বাস করে, পাগলের মতো রিয়াকে বুকে আটকে রাখতে চায়।
শেফালির কথায় বিষের খোঁচা থাকলেও বেপরোয়া হলেন না তিনি। তেতে উঠলেন না।
ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন বসার ঘরে। এখনো ওরা গল্প করছে। বারান্দায় বসে আলাপ করছে। ওদিকে পা বাড়িয়েছিলেন তিনি।

আবার পা থামিয়ে দেন।
চিকিৎসকের পরামর্শের কথা মনে পড়ে। সরাসরি বাধা নয়। সরাসরি বাধা পেলে টিনএজে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে সন্তান। কৌশলী হতে হবে। নিজে আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে গেলে ভুল হবে; কৌশলী হওয়া যাবে না তখন। নিজের আবেগের ঘোড়দৌড় সামলাতে হবে। নিজেকে সামলানো গেলে মেয়েকেও নিয়ন্ত্রণের কৌশল হাতে চলে আসবে।
এসব এখন বুঝতে পারেন রাহেলা চৌধুরি। ঠান্ডা মাথায় ভাবতে থাকেন। পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উপায় খুঁজতে থাকেন তিনি। পরিস্থিতি তেমন খারাপ নয়। তবুও মন মানে না এমন পরিস্থিতিকে মানিয়ে নিতে হবে, ক্ষতির বিনিময়ে না। ক্ষতি ছাড়া সমাধান কী হতে পারে?
রেজা সাহেব মেয়ের উপকার করেছেন। উপকারের শোধ নিতে চাইবেন না তিনি। তবু কৃতজ্ঞতা জানাতে হবে। জানিয়েছেনও। সামনের দিনেও কৃতজ্ঞ থাকতে হবে। প্রয়োজনে আরও সাহায্য লাগতে পারে।

এ সময় বাইরে ডোরবেল বেজে ওঠে।
রাহেলা চৌধুরি এগিয়ে গিয়ে কী-হোলে চোখ রেখে দেখেন, কুসুম দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একতোড়া অর্কিড ফুল।
দরজা খুলে রাহেলা চৌধুরি হাসলেন।
কুসুমও বিনিময়ে হাসি দিয়ে বলল, আন্টি রেজা মামা, রিয়া কোথায়?
উনি এসেছেন, জানো তুমি?
জ্বি, জানি। রিয়া বলে রেখেছিল মামা বিকেলে আসবে। বাইরে ছিলাম আসতে দেরি হয়ে গেছে। মুনা ফোন করে বলেছে, মামা এসেছে। এ কারণে বাইরে থেকে ফুল নিয়ে এলাম মামার জন্য।

রাহেলা চৌধুরির মনের মেঘ মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল। কুসুমকে ইশারা করে বসার ঘরের বারান্দার দিকে যেতে বলেন।
কুসুম দ্রুতপায়ে এগিয়ে গিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়ে।
ওয়েলকাম টু আওয়ার অ্যাপার্টমেন্ট মামা। নিন। এগুলো আপনার জন্য। বলতে বলতে রেজার হাতে ফুল তুলে দিল কুসুম।
রেজা ফুল হাতে নিয়ে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। ফুলের বেগুনি রঙের পাপড়িতে সাদা সাদা ছোপ। ডাঁটাগুলো বান্ডিল করে পলিথিন মোড়ানো। বিশ স্টিকের তোড়াটা অপূর্ব।

রেজা মামা বলল, একটা ফুলদানি দাও রিয়া।
রিয়া শোকেস থেকে অব্যবহৃত একটা ফুলদানি নিয়ে আসে। দামি গ্লাসের ফুলদানিটা বেশ লম্বা। ফুলদানির মুখ ফুলের পাপড়ি খোলার মতো ছড়ানো। ফুলদানি হাতে রেজা গেল বাথরুমে। বসার ঘরসংলগ্ন বাথরুমে ঢুকেই নিজেকে দেখতে পায় ও। সামনে বিরাট বেলজিয়াম গ্লাসের আয়না। গ্রানাইট টপে বেসিন। বেসিনের সঙ্গে আছে পানির ট্যাপ। ট্যাপ অন করে ফুলদানিতে পানি ভরে নেয় সে। অর্কিড ফুলের ডাঁটা থেকে পলিথিন খুলে নিয়ে ডাঁটাগুলো একত্র করে রেখে দেয় ফুলদানির মধ্যে।

ফিরে আসছিল রেজা।
আবার ঘুরে দাঁড়াল। নিজেকে স্পষ্ট দেখতে পেল আয়নার ভেতর। নিজেকে নিজেই চিনতে পারল না ও। মনোযোগ দিয়ে দেখল। নিজের চেহারা এবং দেহকাঠামোর সঙ্গে মনের কাঠামো খুঁজে দেখতে চায়। পারল না। বাথরুমের চারপাশের দামি স্টোনের দেয়ালে রয়েছে নীলাকাশের নীলের মনোক্রম। হালকা নীলের ভেতর দিয়ে ছোপ ছোপ সাদা মেঘের ভাসমান ঢেউ। অপূর্ব ঢেউ ক্ষুদ্র বাথরুমের ভেতর তৈরি করে রেখেছে সীমাহীন আকাশ। আকাশের শুভ্র ভেলায় কি ভেসে বেড়াচ্ছে রেজা!
আচমকা দীর্ঘশ্বাস বের হলো। বুকের ভেতর অজানা একটা পাথর আসন গেড়ে বসে গেল। পাথরের চাপে বেরিয়ে এল বড় শ্বাস। শ্বাস ছেড়েও বুক হালকা হলো না। চাপা অতৃপ্তি বুকের গহিনে সেঁটে গেল।

অতৃপ্তি বুকে। মুখে তৃপ্তি। দুয়ের মিশেলে অন্যরকম লাগছে রেজাকে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে বসার ঘরে এলো ও। ফুলদানিটা রাখল টিভি স্ট্যান্ডের শোকেসের পাশের তাকে।

ফুলদানি রাখতে রাখতে রেজা বলল, ফুলগুলো এখানে মানায়। এখানে থাকবে। কমপক্ষে দুমাস সতেজ থাকবে।
কুসুম বলল, থাকুক। আপনার চিহ্ন থাকুক। তবে দুমাস কেন? দু’বছর থাকলে অসুবিধে কি?
দুমাস থাকলেই চলবে। হাসতে হাসতে বলল রেজা।
রিয়া বলল, মামণি অর্কিড ফুল খুব পছন্দ করেন। মা পরিচর্যা করবেন। অসুবিধে নেই।
রেজা বলল, ফুল সবার জন্য। কেবল একজনের জন্য না।
রিয়া বলল, ঠিক আছে। এখানে থাকুক। গেস্ট এলে দেখতে পাবে।
কুসুমকলি ফুলের দিকে তাকিয়ে থাকে। তাকাতে গিয়ে মনের আলোয় সে দেখে পত্রিকার পাতা জড়ানো একটি কান্নামুখ। মাহিনের মুখ। চোখের বাইরেও চোখ আছে। ভেতরেও চোখ আছে। ভেতর-বাইরে এখন কুসুমের চোখে কেবল মাহিন। মাহিন। এই আনন্দ সময়েও মাহিন জড়িয়ে আছে চোখের মণি।
কুসুম নিজের অনুভবের ভেতর থেকে বলল, কিছু কিছু ফুল কেবল একজনের জন্য মানায়। সবাই দেখলে ফুলের আর সৌন্দর্য থাকে না।
রিয়া সঙ্গে সঙ্গে কথাটা লুফে নেয়। মন থেকে একধরনের প্রতিরোধ ছুটে আসে। এ ফুলগুলো একজনের জন্য মানতে চায় না ও। হাসতে হাসতেই বলল, ফুল সবার জন্য। সবার জন্য। একজনের জন্য হলে স্বার্থপরতা হয়ে যাবে।

কুসুমকলি এখন বড় স্বার্থপর। সে নিজের অবস্থান থেকে কথা বলছে। তার স্বার্থ এখন কেবলই মাহিনকে ঘিরে, জানে না সে নিজের ভেতরের খবর। ভেতরটা বাইরে চলে এলো। জোর খাটায় সে। জোর খাটিয়েই বলল, আমার চোখে এক-ই সেরা। এক-ই অনন্য। এক-ই জনম জনম।

রেজা কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। দুজনের সংলাপের গূঢ়তত্ত্ব ধরতে পারল না। দু’জনার কথার উৎস খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে অনেকক্ষণ পর সে কথায় অংশ নেয়।
আমার মতে এক বলে কিছু নেই। দুই, তিন... দশ মিলে আমরা এক। বুঝেছ, এ কারণে একের মধ্যে থাকে দশ। দশ বাদ দিয়ে একের মূল্য নেই। স্থায়ী বলে কিছু নেই। বদলায়। এক বদলায়। দুই বদলায়। জীবন পরতে পরতে বদলে গিয়ে বহুজনে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
রিয়া চুপ হয়ে গেল। মনে মনে ভাবলেন, হোয়্যার উই লিভ? আমরা কোথায় থাকি? কোথায় বাস করি? জানি কি? জানি না।

রেজার কথা শোনেইনি কুসুম। সে বসে আছে এক-এর দৃঢ় প্ল্যাটফর্মে। এক-এর গাঁথুনি বড় শক্ত। বড় শক্ত শেকড়ের বীজ রোপিত হয়ে গেছে অতলে। শেকড় উপড়াবে না। বদলাবে না। এই তার বিশ্বাস।

ওদের কথা থামিয়ে দিলেন রাহেলা চৌধুরি। আচমকা সংলাপের মাঝে এসে হাজির হয়ে বললেন, শোনো, তোমাদের মামাকে নিয়ে আজ রাতে সবাই খাবে। অন্য ক্লোজড ফ্রেন্ডদের জানাও। মুনাকে আসতে বলো।

মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তার মুখের ভাষা পড়তে পাড়ল রিয়া। মুখের ভাষার সুতো টেনে বের করে আনতে পারে মনের ভাষা। বুঝতে পারল, মা এখন একদম ফ্রি। মায়ের মনে এ মুহূর্তে কোনো টেনশন নেই। সন্দেহ নেই।

রাহেলা চৌধুরি ফিরে যাচ্ছিলেন। আবার ঘুরে দাঁড়ালেন তিনি। রেজাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনার বন্ধু ফারুক সাহেবকেও বলেন। উনিও আসুক। খুশি হব।
রেজা আচমকা বলে ওঠে, সরি। ফারুক ঢাকাতে নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশাসনিক রদবদলের কারণে ফারুক টেনশনে আছে। তার বদলি হয়নি। হতে পারে। ও আসতে পারবে না।
রাহেলা চৌধুরি একটু চিন্তিত হয়ে থমকে দাঁড়ালেন। ফিরে এলেন কিচেনে।
রিয়া ভয়ার্তচোখে এবার তাকাল রেজা মামার চোখের দিকে। তাকিয়ে বলল ফারুক সাহেব বদলি হয়ে যাবেন?
হবেন কি-না, জানি না। হতেও পারেন। বলেই রিয়ার দিকে তাকাল রেজা।
উনি তো খুব ভালো পুলিশ অফিসার। উনাকে কেন বদলি করবে? কুসুম আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করে।
আসন্ন নির্বাচন নিরপেক্ষ করার সব উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং সরকারপ্রধান। প্রশাসনিক রদবদল হবে এ কারণে। ব্যক্তির দোষ থাকুক না থাকুক, সেটি বিবেচ্য নয়। মনে হচ্ছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলেই সরকারি কর্মকর্তারা বেশি টেনশনে আছেন। গণবদলির শঙ্কায় আছেন। চৌদ্দ দলসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো বলছে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে সরিয়ে দিতে হবে। অপসারণ করতে হবে বা পদত্যাগে বাধ্য করতে হবে। আলটিমেটাম দিয়েছে তারা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান, রাষ্ট্রপতি দাবি না মানলে তাঁরও পদত্যাগ দাবি করবে চৌদ্দ দল। দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে সব দলই। দেশবাসী। চারদলীয় জোট বলেছে, সব হতে হবে সংবিধান মতে। রাষ্ট্রপতি নিজেও আশ্বাস দিয়েছেন।
তবে ফাঁক কোথায়? জানতে চায় কুসুম।
ফাঁক-ফোকর ভালো বুঝি না। তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিয়েই যত গ্যাঞ্জাম।
আজকের পত্রিকায় খবরে দেখা যাচ্ছে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন পার্লামেন্ট (ইইউপি) সদস্যরা রাজনৈতিক সহিংসতা ও অচলাবস্থা শক্ত হাতে মোকাবিলা করে সব দলের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে আন্তর্জাতিক মানের সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন ২০০৭ অনুষ্ঠানের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

কুসুম পত্রিকা পড়ে কম। তবে টিভিতে নিউজ দেখে। আগামী নির্বাচন নিয়ে দেশে সহিংসতা দেখেছে। গত কিছুদিন ধরে উত্তাপ দেখেছে রাজপথে।
জ্যান্ত মানুষ মরতে দেখেছে। বর্বরতা দেখেছে। মানুষের প্রতি মানুষের নির্মমতার ভয়াবহ চিত্র দেখেছে। ক্ষোভ জাগে। রাগ জাগে তার। রাগ নিয়ে বলল, ওপরে আপনার কেউ নেই? ফারুক মামার জন্য তদবির করা যাবে না?
নিরুদ্বেগ কণ্ঠে রেজা বলল, এখন তদবিরে কাজ হবে না। তবে আশা করছি, ফারুককে বদলি করবে না। ফারুক সৎ অফিসার।

রিয়ার ভয় কাটেনি। রেজা মামার আশ্বাস কানে ঢোকেনি। পত্রিকা হাতে নেয় ও। একটা ছোট্ট নিউজ আঙুল দিয়ে দেখায়, দেখেন সব ডিসি-ইউএনও বদলানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। চুক্তিভিত্তিক সব নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান ও প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সভাপতিত্বে গতরাতে বঙ্গভবনে জনপ্রশাসন-সম্পর্কিত উপদেষ্টা কমিটির এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পুলিশ প্রশাসনও কি বদলাবে, মামা?
রেজা বোঝানোর জন্য সহজ কণ্ঠে বলল, ফারুক বদলি হলেও সমস্যা নেই। আমাদের শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
রিয়া তাকাল রেজা মামার মুখের দিকে। আশ্বস্ত হচ্ছে না মন। চাপা দেওয়া শঙ্কা আবার তেড়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে সামনে বিপদ এড়ানো কঠিন হবে। ফারুক মামা চলে গেলে সন্ত্রাসীরা শক্তিশালী হবে। পদে-পদে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। মনে মনে আশা করে, ফারুক মামা যেন বদলি না হয়। দেশে যেন শান্তি আসে।

ফারুক চলে গেলে রিয়া নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে, বুঝতে পারে রেজা। ফারুক অবশ্য আশ্বস্ত করে বলেছে, আমি বদলি হলেও আমার জুনিয়র কলিগরা তো অনেকে থাকবে। তাদের হেল্প পাওয়া যাবে। পরোক্ষ হেল্পে বিশ্বাস নেই। প্রত্যক্ষ ঘনিষ্ঠজনের উপস্থিতিতে যে সাহস থাকার কথা সেই সাহস সব সময় মনের মধ্যে থাকবে না। বুঝতে অসুবিধে হলো না।

রাজনৈতিক কারণে মানুষের মধ্যে শঙ্কা বাড়ছে। বিপর্যয়ের পূর্বাভাস দেখা যাচ্ছে। বিপর্যয় ঠ্যাকাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের চার উপদেষ্টার প্যাকেজ প্রস্তাব নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। দেশের শান্তির জন্য ভাবতে গিয়ে নাজেহাল সাধারণ মানুষ। রেজার চিন্তা রিয়ার বিষয় ঘিরে। অথচ কী আশ্চর্য, বিষয়টার সঙ্গেও জড়িত আছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা।

মানুষ রাজনীতির ঊর্ধ্বে না। রাজনীতির প্রভাব ঘরে-বাইরে সর্বত্র একই রকম। সূক্ষ্ম চোখে ভাবতে গিয়ে মোচড় খেল রেজা। এখানে সে এক অসহায় নাগরিক। নাগরিকের অসহায়ত্বের কথা ভাববে কে। জানে না ও।

রিয়া খেয়াল করল মামার অন্যমনস্কতা। খেয়াল করল কুসুমকলির মনও এখন এখানে নেই। কুসুম যেন কেমন হয়ে যাচ্ছে। আগের কুসুম বদলে যাচ্ছে। বদলের হাওয়া আসছে কোত্থেকে?
রিয়া ডাকে, কুসুম।
ডাক শুনে চমকে ওঠে কুসুমকলি।
চমকে ওঠা কুসুমের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে রিয়া। চেনা জগৎ অচেনা লাগছে। মনের ভেতরটাও চিনতে পারছে না ও। গোপনে গোপনে দোল খাচ্ছে। ওদের বদলের হাওয়া লাগছে ঘরে। বাইরে। এই বদলে যাওয়া ক্ষণে পাশে আছে আরেক মানুষ, রেজা মামা। রেজা মামা চলে গেলে কে রাখবে ওর খবর। ভাবতে লাগল রিয়া।

তিনজন বসে আছে বসার ঘরে। তিনজনের উপস্থিতির মাঝেও নিজেকে একা লাগে। একাকী বোধ নিয়ে পত্রিকার অন্য একটা পাতা হাতে তুলে নেয় সে। ‘ঢাকায় থাকি’ পাতাজুড়ে দু’ধরনের দুটি ছবি ছাপা হয়েছে। একটি হচ্ছে ঢাকার ভিআইপি সড়কের ছবি। প্রশস্ত সড়কের দুইপাশজুড়ে রিকশার মিছিল। অবাধে চলছে অজস্র ভ্যান। রাজনৈতিক অবরোধের কারণে সড়কের শূন্যতা পূর্ণ হয়েছে, রিকশার গতিময় জোয়ারে পূর্ণ হয়েছে শূন্য সড়ক। নিজের শূন্যতা ভরাবে সে কী দিয়ে? জানে না রিয়া।
আরেকটা ছবিতে আছে নগর প্রকৃতির সৌন্দর্যের জারবেরা ফুল। তারার মতো ফুটে আছে ফুলটা। সাধারণত জারবেরার তারা হয় হলুদ রঙের। এই ফুলের রং গোলাপি। জারবেরা গাছের সবটুকু বড়ো হয় মাটির নিচে। নকশা-করা পাতা মাটির ওপরে ছড়ানো থাকে, সরু লম্বা ডাঁটির মাথায় ফোটে ফুল। ফুলটা দেখতে তারার মতো।

রিয়ার মনে হয় নিজেকে জারবেরার তারার মতো। সরু ডাঁটির ওপর ভর করে যেন আছে ও। মনে হয়, মাটি সরে যাবে। মনে হয়, ডাঁটি ভেঙে তারাটা মাটিতে লুটিয়ে পড়বে। মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজের অজান্তে বড় করে একটা শ্বাস ছাড়ে ও। মনের মধ্যে ভেসে ওঠে বখাটে মাদকসেবীদের কুৎসিত মুখ। কুৎসিত আচরণ। ভয়াবহ হুমকি মাথার ওপর ঝুলে আছে খড়গের মতো।

রেজা মামা বলল, সবাই চুপ কেন?
কুসুম বলল, আপনিও তো সবার মাঝে। আপনি চুপ কেন?
রিয়া ওদের কথায় টলে ওঠে। হাসি ফোটে মুখে। রিয়ার হাসিতে মিশে আছে মিশ্র অনুভূতির অসাধারণ এক ছবি।
রেজা বলল, রিয়া হাসলে চুপাচুপির আবহটা ভেঙে যাবে। হাসো রিয়া। জোরে হাসো।
মামার কথা শুনে হাসতে থাকে কুসুম। হাসতে থাকে রিয়া। হাসতে থাকে সবাই।
উচ্চস্বরে হাসির শব্দ পৌঁছে যায় কিচেনে।
রাহেলা চৌধুরির মুখেও হাসি ফোটে। মেয়ে ভালো আছে। মেয়ের মন খুশিতে আছে। ভাবতে গিয়ে রাহেলা চৌধুরির ম্লান মনও খুশির পরশে নড়ে ওঠে।

শেফালি কিচেনের দরজার পাশে এসে উঁকি দেয়। এখান থেকে দেখা যায় বসার ঘর।
উঁকি দিয়েই ফিরে যায়। লোকটা দুইডা মাইয়ার মাঝে বইস্যা আছে। আবার হাসে! শরম নাই ব্যাডার! কত পুরুষ দেখলাম! মনে মনে বিড়বিড় করে শেফালি।
রাহেলা চৌধুরি বললেন, কিছু বলছ শেফালি।
শেফালি জবাব দিল না। পুরুষমানুষ দেখলে তার গায়ে জ্বালা ধরে। জ্বালার কথা জানাতে পারে না। চুপ মেরে থাকে সে।
বসার ঘরের আড্ডা আবার জমে উঠেছে। কিচেনে রান্নার কাজে ব্যস্ত হাতের টুংটাং শব্দ ভেসে আসছে। বাসার পরিবেশ বদলে গেছে। শান্তি আসছে ছুটে। শান্তির দিকে কে না আবার হাত বাড়ায়। এ সময় এক টিকটিকি শোবার ঘরে ডাকতে থাকে―টিক-টিক-টিক, টিকটিকটিক...

টিকটিকির ডাক কেউ শুনতে পেল না।
সময় চলে যাচ্ছে। টিকটিকি ডাকছে। একসময় টিকটিকির ডাক থেমে যায়। থেমে যায় সবার উল্লাস।
মিসেস চৌধুরি সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, মুনা মামণিকে আসতে বলেছ, খবর দিয়েছ, কুসুম?
জ্বি আন্টি। আমি এসএমএস করেছি। সময়মতো চলে আসবে মুনা।

রাহেলা চৌধুরি খুশি হলেন। রেজার সামনে নিজের মেয়েকে তিনি নিরাপদ ভাবতে পারেন না। সচেতন মন এ কথাটা জানে না। অবচেতনে তাই আশা করতে থাকেন মুনাকে। আপন মামা রেজা। আপন মামা নিশ্চয়ই ভাগনির সামনে একজন নিরাপদ পুরুষ। মামার অস্তিত্বে খাদ থাকার কথা না। গোপন মনই সমাধান খোঁজে। খুঁজে খুঁজে তৃপ্তি পেতে চায়। পোড়-খাওয়া নারীর মন, এই মনে এখন আসন গেড়ে বসেছে সনাতন মায়ের মন। রাহেলা চৌধুরি নিজের মনের কথা ভুলে গেছেন। মাতৃত্বের কোমল টানের কাছে পরাজিত তিনি। এ মন জানে না অনেক কিছু। মানতে চায় কেবল রিয়ার কল্যাণ। শুনতে চায় রিয়ার মঙ্গলের কথা।

রিয়া মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে চিরচেনা মা চিরচেনা দাবি নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে। মায়ের ভেতরের দাবিটা এ মুহূর্তে বুঝতে বাকি থাকে না। মুনা আসবে, আনন্দের খবর। স্বাভাবিক খবর। তবে মুনার আসার আড়ালে মায়ের মনের গোপন উদ্দেশ্য রিয়ার মন কষ্টে ভরিয়ে দিয়েছে। টের পেল না কেউ। না তার মা, না রেজা মামা, না কুসুম। আপন জগতে ও যেন এখন এক বৈরাগী। এই বৈরাগ্যের ছাপ নিজেকে শূন্য থেকে শূন্যে টেনে নেয়। আনন্দের মাঝেও নিজের মনে ঢুকে যায় কষ্টের সুচ। সূক্ষ্ম সুচের খবর সে-ও জানবে না আর।

চলবে...

এসইউ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]