কুকুর এবং নাকফুল

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ
সালাহ উদ্দিন মাহমুদ সালাহ উদ্দিন মাহমুদ , লেখক ও সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৪:২৩ পিএম, ০৮ আগস্ট ২০২১

কুকুর

স্বামীহীন আবেদার একমাত্র সন্তান স্বাধীন। সন্তান জন্মের একবছর পর ডাকাতের কবলে পড়ে স্বামী মারা যায়। ফাঁকা ঘরে তাই মাঝেমাঝে চোর-চোট্টারা উঁকি মারে।

স্বাধীনের বয়স বারো কি তেরো। ভালো-মন্দ বোঝে। তাই একটি কুকুর পোষার ইচ্ছা বহুদিনের। জন্তু কুকুরটা যদি মানুষ কুকুরগুলো তাড়াতে পারে, মন্দ কী? ফলে হন্যে হয়ে কুকুরের বাচ্চা খোঁজে।

গ্রামজুড়ে অনেক কুকুর। কোনোটা পোষা, কোনোটা বেওয়ারিশ। পোষা কুকুরগুলো ভদ্র। বেওয়ারিশগুলো হিংস্র। পোষা কুকুর কেউ দিতে চায় না। কিনতেও চেয়েছে স্বাধীন। কেউ বিক্রিও করবে না।

কুকুর তো একসঙ্গে অনেক বাচ্চা প্রসব করে। বড় হয়ে সেই বাচ্চাগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায় একগ্রাম থেকে অন্যগ্রামে। কুকুরের কোনো সীমানা নেই। যখন যেখানে যায়, সেখানেই থিতু হয়ে বসে।

পোষা কুকুর না পেয়ে একদিন রাস্তার পাশে খালের কিনারে পড়ে থাকা আহত কুকুরের বাচ্চাটাকে কোলে তুলে বাড়িতে নিয়ে আসে। একবার পোষা কুকুরের বাচ্চা আনতে গিয়ে মা কুকুরের তাড়া খেয়েছিল। তাই এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখে নিয়েছে। আজ অবশ্য সেই সম্ভাবনা ছিল না। আশেপাশে মা কুকুর নেই।

ভেজা চপচপে বাচ্চাটাকে বাড়ি এনে চুলার পাশে রেখে শুকায়। ভাতের মাড় খেতে দেয়। কুকুর ছানাটি ‘কুই কুই’ করে ডাকে। সন্ধ্যা নাগাদ জীবনের ছন্দ খুঁজে পায় কুকুর ছানাটি।

রাত হলে পরম যত্নে মাটিতে চটের বস্তা বিছিয়ে বাঁশের খাঁচা দিয়ে ঢেকে রান্নাঘরে রাখে। পাটখড়ির দরজাটা টেনে রশি দিয়ে বাঁশের খুঁটির সঙ্গে আটকে দেয়।

রাতে ঘুমাতে গিয়ে আবেদা জানতে চায়, ‘কুত্তার বাচ্চাডা কইত্তন আনছোস?’ স্বাধীন বলে, ‘রাস্তার পাশে খালের কিনারে পাইছি। কেডা জানি খালে হালায়া দিছিল।’ শুনে আবেদা বলে, ‘ভালা করছোস। আহা রে, কুত্তা অইলেও তো ওইটার জান আছে।’ কথা শেষে ঘুমিয়ে পড়ে মা-ছেলে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে রান্না করতে যায় আবেদা। রান্নাঘরের দরজা খোলা দেখেই বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে। বাচ্চাটির খোঁজ নেই। মায়ের ডাক শুনে ছুটে আসে স্বাধীন। রান্নাঘরের কোণায়-কানায় খোঁজে দুজন। আহত স্বরে স্বাধীন বলে, ‘মা, কুত্তাডা গেল কই?’ আবেদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘কই আর যাইবো, এই গ্রামে কি কুত্তার অভাব আছে?’

****

নাকফুল

বাংলা বিভাগের সেমিনার কক্ষের সামনে কলেজ করিডোরে বান্ধবী সোমার সঙ্গে একটি মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। তাকে আগে কখনো কলেজে দেখিনি। তার সৌন্দর্য আমার দৃষ্টি কেড়ে নিল। মেয়েটিকে আমার খুব ভালো লাগল। ভালো লাগাই স্বাভাবিক। সুন্দরকে দেখে সবাই আকৃষ্ট হয়। আমি সৌন্দর্যের পুজারি। হয়তো এই ভালো লাগাই পরে ভালোবাসায় রূপ নিয়েছিল।

সোমার কাছে জানতে পারলাম, সে আমাদের কলেজেরই ছাত্রী। আমি ভেবেছিলাম, কারো আত্মীয় হবে। কারণ কলেজে বাইরের অনেকেই ঘুরতে আসে। উপজেলা শহরে কলেজের এত বড় ক্যাম্পাস খুবই কম দেখা যায়। যা-ই হোক, আগে হয়তো তাকে এমন চোখে কখনো দেখিনি। দেখার সময়ও পাইনি। সারাক্ষণ ক্লাস, সাহিত্যচর্চা আর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যস্ত থাকি। ফলে তার সম্পর্কে সোমার কাছ থেকে বিস্তারিত জেনে নিলাম। সোমা হেসে হেসে বলল, ‘কীরে প্রেমে পড়েছিস না-কি? এমনভাবে খোঁজ-খবর নিচ্ছিস।’ আমি মুচকি হেসে সেমিনারে চলে গেলাম।

কিছুক্ষণ পর সোমা ও তার বান্ধবী সেজুতি মেয়েটিকে আমার অজান্তেই সব কিছু বলল। সে সম্মতি দিয়েছে কি-না আমি জানি না। কিন্তু এটুকু জানি, সোমা ও সেজুতি এসে আমাকে বলল, ‘আগামীকাল তোর সাথে মেয়েটি দেখা করবে। তখন তাকে তোর ভালোবাসার কথা বলিস।’ আমি বললাম, ‘আর কিছুদিন দেখি, মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি হলে কেমন দেখায় না?’

তার পরের দিন আমি সেমিনারে বসে আছি। এমন সময় সোমা ও সেজুতি এসে আমাকে বলল, ‘চল, ওর সাথে কথা বলবি।’ আমি বললাম, ‘ওকেই বরং সেমিনারে আসতে বল।’ ওরা তা-ই করল। সব কিছু জানা সত্ত্বেও সেজুতি নাটকীয়ভাবে মেয়েটির সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিলো। মেয়েটি আমার বামপাশের চেয়ারে বসা। তাই তার চেহারার একপাশ আমার চোখে পড়েনি। কিংবা যে দু’একবার দেখেছি, তাতেও তার চেহারায় বিশেষ কোনো চিহ্ন আমার চোখে পড়েনি।

এরপর তাকে নিয়ে আমরা কলেজ ক্যান্টিনে গেলাম। আমরা দু’জন এক টেবিলে মুখোমুখি বসলাম। ভালোবাসা এবং লজ্জার নাগপাশে জড়িয়ে আমি তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকাতে পারলাম না। মাথা অবনত করেই তার সাথে কথা বললাম। কিন্তু আমি যে তাকে ভালোবাসি কথাটি তখনো বলা হয়নি। মেয়েটির অপর এক বান্ধবী আমাকে বলল, ‘আপনার সাথে কিছু কথা আছে।’ আমি বললাম, ‘বলুন।’ কী ভেবে যেন সে বলল, ‘না থাক। এখন বলব না।’ ফলে সে কী বলতে চেয়েছিল; আমার তা শোনা হয়নি।

ক্যান্টিন থেকে বের হওয়ার জন্য মুখোমুখি দাঁড়ালাম আমরা। হঠাৎ করে আৎকে উঠলাম। আমার চোখে ভেসে উঠলো তার নাকফুল। আমি জানি, একমাত্র বিবাহিত মেয়েই নাকফুল পরে। আমি কল্পনার রাজ্য থেকে বাস্তবতায় ফিরে এলাম। বুঝতে পারলাম, বান্ধবীরা আমার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এতদিন মজা করেছে। কিন্তু আমি সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছিলাম তাকে। একটা নাকফুল আমার হৃদয়টাকে ভেঙে চুরমার করে দিলো।

বান্ধবীদের ছেলেখেলায় আমার হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত হলো। হৃদয়ের সেই ক্ষত থেকে আজও রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এখনো তার নাকফুলটি আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। এখনো আমি আমার হৃদয় ভাঙার শব্দ শুনতে পাই।

এসইউ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]