চোর চোর!

অতনু দাশ গুপ্ত
অতনু দাশ গুপ্ত অতনু দাশ গুপ্ত
প্রকাশিত: ০৪:৫৪ পিএম, ২৩ আগস্ট ২০২১

প্রতিদিনের মতো আজও মিনিট বিশেক আগেই এসে পৌঁছে গেছি। ব্যাগ রেখে, ওয়াশরুমের কাজ সেরে সিডিউল দেখছিলাম। ভালো করে লক্ষ্য করলাম সুজান আজ আসেনি আর আমাকে ওর জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে- ইলেকট্রনিকস ডিপার্টমেন্টের। সকাল থেকে ওখানে কাজ করছে জেইন। আমি যাওয়ার পর ও নিজের ডিপার্টমেন্টে চলে গেল।

ওয়ালমার্টের সুপারশপে অনেক ডিপার্টমেন্ট রয়েছে। যেদিন যাকে যেখানকার দায়িত্ব দেওয়া হয়। যেমন- গতকাল আমি বেশ কয়েকটা জায়গায় কাজ করলাম- প্রথমে ক্যামিকেলসে (ডিশ ওয়াসার, ডিটারজেন্ট, টিস্যু প্রভৃতি) শুরু করে পরে হাউসওয়্যারস (গৃহস্থালি কাজ, ঘরের আসবাবপত্র)। এরপর অটোমোটিভে (গাড়ির সরঞ্জাম) চলে গেলাম। সিডিউলে দেখে নিলেও টাচ কম্পিউটারে ছবিসহ প্রতিদিনের টাস্ক দেওয়া থাকে। নিত্যদিনের কাজ ছাড়া ওগুলোও করতে হয়। এরপর রিকভারি আছে। অর্থাৎ যদি এক ডিপার্টমেন্টের জিনিস অন্য ডিপার্টমেন্টে পাওয়া যায় তাহলে সেটাকে নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দেওয়া।

আজ আমি অনেকটাই অন্য সব কাজ থেকে নিশ্চিন্ত। কারণ ইলেকট্রনিকস অ্যাসোসিয়েটের নিজ ডিপার্টমেন্টের বাইরে যাওয়া বারণ। অন্য সহকর্মীরা তার ব্রেক টাইমে এসে কভারেজ করবে। কোনো ভারী জিনিস যেমন- ঢাউস সাইজের মনিটর বহন করার জন্য অন্য অ্যাসোসিয়েটদের (স্টোর স্ট্যান্ডার্ড) কল করে ডাকা বা কোনো কাস্টমার যদি অন্য কোনো ডিপার্টমেন্টের কিছু খুঁজে না পায় তাহলেও কল করে বাকিদের ডাকা। এছাড়া বিপদে আপদে কোনো জিনিস পেছনের অফিসে থাকলে সেটা আনতে বা বিশেষ কোনো অনুমতি নিতে ম্যানেজারকে তো ডাকতেই হয়। বিশেষ অনুমতি বলতে মাঝে মাঝে ডিসকাউন্ট দেওয়ার প্রয়োজনে।

আমি কাজে কিছুটা ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। এমন সময় ওদিকেই যাচ্ছিল ব্র্যাড-লস প্রিভেনশন পারসন; সোজা কথায় চোর ধরায় সিদ্ধহস্ত ব্যক্তি। আমাদের স্টোরে চুরি অনেক বেড়ে গিয়েছিল। কর্তৃপক্ষ প্রথমে সিডনির স্টোর থেকে নিরাপত্তারক্ষী এনে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। ফলাফলে খুব একটা রফাদফা হয়নি!

সিডনি (কানাডার সিডনি) শহরে তিনটি ওয়ালমার্ট আছে- শহরের একেবারে শেষ প্রান্তে আমাদের নর্থ সিডনি স্টোর। আকারে এটাই সবচেয়ে ছোট কিন্তু এখানকার চোররাও সেরকম ধুরন্ধর! ম্যানেজারের নাকের ডগায় জিনিস নিয়ে হনহন করে বেরিয়ে যায়!

যা-ই হোক ব্র্যাড বেশ চৌকস প্রহরী! গত সপ্তাহেও কয়েকটা ছিঁচকে চোরকে আটকে দিয়েছে। সেটার গল্প করতেই আমার কাছে এসেছে। অধিকাংশ চোরেরই অন্যতম আকর্ষণের জায়গা এই ইলেকট্রনিকস ডিপার্টমেন্ট। ছোটখাটো অনেক দামি ডিভাইস আছে, যেগুলো খুব সহজেই বগলদাবা করা যায়। এখানকার চোরদের বিশেষ একটা কৌশল হচ্ছে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে কেনাকাটার ভান করা। অনেক জিনিস নিজের শপিং কার্টে নিয়ে নেওয়ার এক ফাঁকে খুব কৌশলে ওই কাঁধে ঝোলানো ব্যাগের ভেতরে টপ করে পুরে নেওয়াটাই থাকে এদের প্রধান উদ্দেশ্য! পরে ধরা পড়লে খুব সহজেই নানারকম ভনিতা করা বা অন্য দোকান থেকে নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা বা উপহারস্বরূপ কারও কাছ থেকে পাওয়া বলা এবং আরও হাজারো বানিয়ে নেওয়া কারণ তো আছেই! ম্যানেজারের পক্ষে হাজারো কাজের মাঝে এক চোরের পেছনে লেগে থাকা অনেকটাই অসম্ভব পর্যায়ে। তাই ব্র্যাডকে এ গুরু দায়িত্ব দেওয়া। কারণ যাকে দোষী সাব্যস্ত করা হচ্ছে তাকে হাতেনাতে ধরতে হবে। শুধু ম্যানেজার আর নিরাপত্তারক্ষী এ কাজ করার ক্ষমতা রাখেন, বাকিরা কোনো গ্রাহকের টিকিটিও ধরতে পারবেন না! ব্র্যাডের পেশাদার উপস্থিতিও এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখে। ওকে সিকিউরিটি হিসেবে বোঝা মুশকিল। কারণ সে সাধারণ মানুষের মতোই চলাফেরা করে আর সবার সার্বক্ষণিক গতিবিধি লক্ষ্য রাখে। এমনকি আমাদেরও! কোনো কর্মচারীর গতিবিধি সন্দেহজনক মনে হলে তাকে সরাসরি কিছু না বলে ম্যানেজারকে রিপোর্ট করে দেয়।

যা-ই হোক, এখন আসা যাক ওইদিনের ঘটনায়। ব্র্যাড গত সপ্তাহের ঘটনা বলছিল- স্পোর্টস ডিপার্টমেন্টে কার্ড চোরকে পাকড়াও করে! এরপর চোর বক্স ওখানে ফেলে রেখেই পগার পার। তাই ও আমাকে বলে সবদিকেই খেয়াল রাখতে আর সন্দেহজনক কিছু দেখলেই জানাতে।

আমি কাস্টমার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যথারীতি। লক্ষ্য করলাম অতি বাচাল স্বভাবের এক দম্পতি আমাকে গেমসের লকার খোলার অনুরোধ জানিয়ে ওদিকেই চলে গেছে। আমি লকার খুলে দিতেই পতিদেব রাজ্যের সব প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে ফেললো। পত্নীর কাজ ছিল গেমসের সিডি গায়েব করা! ওই নারীর কাঁধে বেশ বড় সাইজের একটা ব্যাগ ছিল। এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন ওভাবে ব্যাগ ঝুলানোর উদ্দেশ্য! বেশ কুটকৌশলি ওই ভদ্রলোক! আমাকে এত প্রশ্ন করতে লাগলেন মনে হচ্ছিল ওই ক্যাবিনেটের সবগুলো গেমস আজই কিনে ফেলবেন তিনি! একবার বাম দিক থেকে ডানে আবার ডান থেকে বামে- সবই চাই তার। এরই ফাঁকে আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম তার স্ত্রী কয়েকটি সিডি বগলদাবা করে ফেলেছেন! সবই দেখতে পেলাম কিন্তু অসহায়ের মতো তাকিয়ে থাকা ছাড়া কিছুই করতে পারলাম না! অ্যাসোসিয়েটরা কোনো কাস্টমারকে চুরি করার দায়ে প্রশ্ন করতে পারেন না অর্থাৎ জেরা করতে পারবেন না। কে পারবেন তা আগেই জানিয়েছি। আবার তৎক্ষণাৎ রেজিস্টারে ফিরে গিয়ে কল করে ম্যানেজারকে রিপোর্ট করবো সেটাও পারছি না। আমি সাক্ষাৎ দাঁড়ানো অবস্থায় যখন জিনিস গায়েব হয়ে যাচ্ছে তখন আমার অনুপস্থিতিতে কী হবে! ওরা আরও অনেক প্রশ্ন করলো কিন্তু তখন মোক্ষম কাজ হাসিল হওয়ায় তীব্রতা কমে এসেছে।

মিনিট দশেকের মধ্যে তারা ইলেকট্রনিক্স ডিপার্টমেন্টের বাইরে যেতেই আমি এরিককে ফোন করে ওরা মেইন গেটে পৌঁছানোর আগেই আটকাতে বললাম- এটাও জানালাম ওদের পরনে আছে হালকা সবুজ রঙের টপস আর কালো রঙের শার্ট, বাদামি রঙের টুপি। ওদিকে ব্র্যাডকেও ফোন করে দিলাম।

মিনিট ১৫ পরে এরিক এসে হাজির- ওইদিনের ডিউটি ম্যানেজার। জানালো চোর ধরা পড়েছে কিন্তু ওদের কাছ থেকে মাল উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশও এসেছিল কিন্তু ওদের ছেড়ে দিয়েছে। তবে সতর্ক করা হয়েছে! পুলিশের ওই মুহূর্তে আরও গুরুত্বপূর্ণ কল চলে আসায় ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য হয়েছিলাম এরিকের প্রশ্ন শুনে, ও এসেই জিজ্ঞেস করেছিল, ‘ওরা চুরি করে ডিপার্টমেন্টের বাইরে গেল কীভাবে?’ আমি কিছুক্ষণ অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থেকে বললাম, ‘হেঁটে’!

এরপর ব্র্যাড এলো, খুব খুশি মনে হলো তাকে! কারণ সময়মতো ফোন করায় চোররা ধরা পড়েছে। এটাও বললো যে, এ দম্পতিকে আগেও সে চুরি করতে দেখেছে!

এরা চুরি করে বেশ কয়েক মাসের জন্য উধাও হয়ে যায়, এরপর এভাবেই আবার আচমকা হাজির হয়ে চুরি করে।

বলাবাহুল্য, ওর পরবর্তী কথা সত্যি হয়েছিল!

এসএইচএস/জেআইএম

লক্ষ্য করলাম অতি বাচাল স্বভাবের এক দম্পতি আমাকে গেমসের লকার খোলার অনুরোধ জানিয়ে ওদিকেই চলে গেছে। আমি লকার খুলে দিতেই পতিদেব রাজ্যের সব প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে ফেললো। পত্নীর কাজ ছিল গেমসের সিডি গায়েব করা!

অধিকাংশ চোরেরই অন্যতম আকর্ষণের জায়গা এ ইলেকট্রনিকস ডিপার্টমেন্ট। ছোটখাটো অনেক দামি ডিভাইস আছে যেগুলো খুব সহজেই বগলদাবা করা যায়। এখানকার চোরদের বিশেষ একটা কৌশল হচ্ছে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে কেনাকাটার ভান করা।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]