শিশু

তামান্না ইসলাম
তামান্না ইসলাম তামান্না ইসলাম , প্রবাসী লেখিকা
প্রকাশিত: ০২:০৫ পিএম, ০৬ অক্টোবর ২০২১

'শুক্রবার সন্ধ্যায় চলো র‌্যাডিসনে সব বাচ্চা গুলোকে নিয়ে ঘুরে আসি। সাদ, রাদ, রাইনা আর আমাদের গুলা। ' সামির কথা শুনে আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। ও ভীষণ আমুদে। দেশে আসলে একটা মিনিট বসে থাকতে চায় না, খালি টই টই। দেশে এসেছি এক সপ্তাহ হয় নাই। মায়ের বাড়ি, শ্বশুর বাড়ি দৌড়াতে দৌড়াতে এখনো মায়ের কাছে শান্তি করে দুদিন কাটানো হয় নাই, মন ভরে মায়ের রান্নাও খাওয়া হয় নাই। অবশ্য যাই খাই না কেনো, মায়ের মন ভরে না আমাদেরকে খাইয়ে।। 'তোমাকে তো শিং মাছের ঝোল খাওয়ানো হয় নাই।' 'এখনো তো গত কোরবানির কুজটা খেলে না। ' 'নুহার জন্য সমোচা করেছি, পরেই রইলো। প্লেনে ওঠা পর্যন্ত এই আফসোস চলতে থাকে। সঙ্গে আছে বাবা। দেশে আসলে আমার মনে পড়ে যায় পৃথিবীতে এতো রকমের মাছ, সবজি, শাক, ফলমূল আছে। শ্বশুর শাশুড়িও কম যান না। খুঁজে খুঁজে বড় মাছ, পিঠা, মিষ্টি জোগাড় করেন। তাই দেশে আসলে আমি বড্ড বিপদে পড়ে যাই এই খাওয়া নিয়ে। কাকে ফেলে কাকে খুশি করি করতে যেয়ে বাইরের খাওয়াটা বাদ দিতে হয়।

সামি অবশ্য এগুলো তোয়াক্কা করে না। মুখের ওপর সবাইকে না করতে পারে। ওর যখন যা মন চায় ও সারা জীবন তাই করেছে। যতো ঝামেলা আমার। আমি আবার কাউকেই 'না' করতে পারি না। বাবা এতো বাইরে নিয়ে যায় বলে বাচ্চাগুলোও বাপ ভক্ত। এমনকি আমার ভাইয়ের ছেলে, মেয়ে সাদ, রাদ আর রাইনাও ফুপার নেওটা।

আমি হ্যাঁ, না কিছু বলছি না দেখে সামি একটু আশাহত হলো। ও ভেবেছে এমন প্রস্তাবে আমি নেচে উঠবো। আমার মাথায় আসলে অন্য কথা ঘুরছে। ভাবছি শুধু বাচ্চাদের নিয়ে যাবো? আমি জানি বাচ্চাদের সাথেই সামির জমে ভালো। তবুও মন খচ খচ করছে। মা, বাবাকে ছাড়া দেশে আসলে আমি পারত পক্ষে কোথাও যাই না। কিন্তু খালি মা, বাবাকে নিয়ে গেলে খারাপ দেখা যায়। শ্বশুর শাশুড়িও সারাদিন ঘরেই থাকেন। ওনাদেরকে না নিলে আমার খারাপ লাগবে। কিন্তু সামিকে আমি চিনি। ওর মাথায় যখন যেই আইডিয়া আসে সেটা বদলানো কঠিন। তাছাড়া ওর বাবা তেমন একটা আজকাল কোথাও যায় ও না। তবুও আমি চেষ্টা করলাম।

'একেক জনের খরচ কতো?' সব আট ঘাট বেঁধে প্রস্তাব দিতে হবে যেন নাকচ না হয়। কিন্তু এতে উল্টো ফল হলো। ও ভেবেছে আমি হিসেব করছি।

'খরচ যাই হোক আমি বাচ্চাদের কথা দিয়েছি।' আমি বলতে যাচ্ছিলাম 'ও বলে ফেলেছো?' কথাটা গিলে ফেলে শেষ পর্যন্ত আমি বলেই ফেললাম 'আচ্ছা, চল যাই। তবে মা, বাবা, আর আব্বা, আম্মাকেও নিয়ে যাই। ওনারা কখনো যায় নাই। অনেক খুশি হবে।'

যা ভেবেছিলাম। আমার কথায় সামি বেশ বিরক্ত হলো। 'তুমি কি পাগল হয়েছো? বাবার শরীরে অনেক সমস্যা। মা, বাবা দুই জনেরই খাওয়া দাওয়ার অনেক নিষেধ। তুমি কি ওদেরকে মেরে ফেলতে চাও? প্রশ্নই উঠে না। '

ওর কথা শুনে আমি ফাটা বেলুনের মতো চুপসে গেলাম। নিজেকে ধিক্কার দিলাম মনে মনে। এই ব্যাপারটা মাথায়ই আসে নাই। মনে হচ্ছে যেন আমি খুব কেয়ারলেস ছেলের বউ, শ্বশুর শাশুড়ির স্বাস্থ্য নিয়ে কোন চিন্তাই করি না। সামির কথা এমনই, খুব চাঁছা ছোলা। এতোদিনে আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তবু মাঝে মাঝে এতো কষ্ট হয়। ও ভালো করেই জানে ওনাদেরকে আমি কতোটা খেয়াল করি।

মনে পড়ে গেলো বছর কয়েক আগে একবার আমেরিকাতে এক নামকরা রেস্টুরেন্টে আমরা আমাদের মা, বাবাদের চার জনকে নিয়ে গিয়েছিলাম। সেবার সামির উৎসাহ ছিল সবচেয়ে বেশি। ওনারা কিছুই খেতে পারে নাই সেই ফরাসী মেন্যু। প্রায় অভুক্ত হয়ে বের হয়ে এসেছিলেন চারজনই। মুখ শুকনো করে বলেছিলেন 'সুন্দর জায়গা, এমন হোটেলে আমরা কখনো আসি নাই। একটা অভিজ্ঞতা হলো।' আমরা দুজনেই সেবার আফসোস করেছিলাম খেতে পারলো না বলে। কিন্তু এটাও তৃপ্তি ছিল যে ওনাদের সখটা তো মিটলো। সামি কিন্তু কৃপণ না, আমার বাবা, মাকেও যথেষ্ট খেয়াল করে। কিন্তু এখন আর ও ওর বাবা, মাকে নিয়ে খাওয়ার জায়গায় যেতে রাজি না। যেহেতু নিজের মা, বাবাকে নিচ্ছে না, আমাকেও আর বলল না যে তোমার মা, বাবাকে নিয়ে চলো। অগত্যা আমিও আর আমার মা, বাবাকে নিতে পারলাম না। ঐ যে 'না' করতে পারি না। তাছাড়া সামির এতো আগ্রহে ভাটা পড়ুক চাচ্ছিলাম না, তাই রাজি হয়ে গেলাম।

শুক্রবার সন্ধ্যায় সেজে গুঁজে হই চই করে খেতে গেলাম। তবে ভাইয়ের বাচ্চাদের তুলতে যখন বাবার বাসায় গিয়েছি কেমন যেন খারাপ লাগছিলো বাবার সামনে। মনে হলো বাবা জোর করে একটা শুকনো হাসি দিলেন। হয়তো আমার দেখার ভুল। জোর করে ভাবনাটা ঠেলে দিয়ে মুখে হাসি খুশি ভাবটা টেনে আনলাম। পাছে বাচ্চারা বা ওদের বাবার চোখে পড়ে। আর কেউ না হলেও মেয়ে ঠিকই বুঝে যাবে। অসাধারণ কাটলো সন্ধ্যাটা। আমার বাচ্চারা, ভাইয়ের বাচ্চারা ভীষণ খুশি। আর সামিও বেজায় খুশি।

এরপর আমরা আবার আমাদের এই স্বল্পকালীন ছুটি কাটাতে ব্যাস্ত হয়ে গেলাম। দেশে আসলে চোখের নিমেষে সময় চলে যায়। দেখতে দেখতে আমাদের ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে গেলো। আগামীকাল আমাদের ফ্লাইট। বড় চাচার শরীর বেশ অসুস্থ। বাঁচে নাকি ঠিক নাই। ওনার সাথে দেখা করতেই হবে যাওয়ার আগে। বাবা, মাকে সাথে নিয়ে যাচ্ছি ওনার বাসায়। র্যাডিসনের সামনে দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে। বাবা হটাত বললেন 'মা, এখানকার খাওয়া খুব মজা? ' আমি অসহায় ভাবে বললাম 'হ্যাঁ বাবা। তবে সব আইটেম না। কিছু কিছু আইটেম। ' আমার বাবা খুব ভোজন রসিক। ছোট বাচ্চাদের আমরা যেভাবে সান্ত্বনা দেই 'এই খেলনাটা ভালো না' অনেকটা সেই সুরে আমি বাবাকে সান্ত্বনা দিলাম। বাবা তবু বাচ্চাদের মতো জেদ শুরু করলো ' রাদ আর সাদ যে বলল খুব মজা ছিল আর অনেক অনেক আইটেম, স্টেক, শর্মা , অনেক কিছু?

তুমি ওদের সবাইকে নিয়ে গেলে, আমাকে কেনো নিয়ে গেলে না মা? আমার বুঝি খেতে ইচ্ছা করে না মজার মজার খাওয়া? কতদিন এটার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ভেবেছি একবার যাবো খেতে। যাওয়া তো হয় না। তুমিও আমাকে নিয়ে গেলে না? ' সেই মুহূর্তে আমার মনে হলো আমার সামনে পাঁচ ছয় বছরের এক শিশু বসে আছে। আমার মনে পড়ে গেলো আরেকটি শিশুর কথা। সেই শিশুটি আমি। আমি যখন ছোট ছিলাম, শেরাটন বা সোনারগাঁয়ে নিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য ছিল না বাবা, মায়ের। বাবা কালে ভদ্রে মিটিঙয়ে গেলে সবার চোখ বাঁচিয়ে লাঞ্চ বা ডিনারের এক টুকরো স্যান্ডউইচ, কেক বা পেস্ট্রি নিয়ে আসতো আমার জন্য। আমার চোখ চকচক করতো খুশিতে।

এইচআর/জেআইএম

শুক্রবার সন্ধ্যায় সেজে গুঁজে হই চই করে খেতে গেলাম। তবে ভাইয়ের বাচ্চাদের তুলতে যখন বাবার বাসায় গিয়েছি কেমন যেন খারাপ লাগছিলো বাবার সামনে। মনে হলো বাবা জোর করে একটা শুকনো হাসি দিলেন। হয়তো আমার দেখার ভুল। জোর করে ভাবনাটা ঠেলে দিয়ে মুখে হাসি খুশি ভাবটা টেনে আনলাম। পাছে বাচ্চারা বা ওদের বাবার চোখে পড়ে।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]