মায়াবতী: পর্ব ১৮

মোহিত কামাল মোহিত কামাল , কথাসাহিত্যিক, মনোচিকিৎসক
প্রকাশিত: ০২:৪০ পিএম, ০৮ অক্টোবর ২০২১

কথাসাহিত্যিক মোহিত কামালের মায়াবতী বাংলা সাহিত্যে দ্বিতীয় মনোবৈজ্ঞানিক উপন্যাস। সাহিত্যের শব্দবিন্যাসে তিনি ব্যবহার করেছেন মনস্তত্ত্ব, সমাজের আড়ালের চিত্র। মা প্রত্যক্ষ করেছেন, মেয়েরা নানাভাবে উৎপীড়ন ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়, সহজে মুগ্ধ হয়ে অবিশ্বাস্য পাতানো ফাঁদে পা দেয়। মায়ের একান্ত চাওয়া মেয়ে ক্যারিয়ার গড়ে তুলুক। বিধিনিষেধ আরোপ করেন মা। মেয়ে তখন মনে করে, মা স্বাধীনতা দিতে চায় না, বিশ্বাস করে না তাকে। মায়ের অবস্থানে মা ভাবছেন তিনি ঠিক। মেয়ের অবস্থানে মেয়ে ভাবছে, সে ঠিক। মায়ের ‘ঠিক’ এবং মেয়ের ‘ঠিক’র মাঝে সংঘাত বাধে। সংঘাত থেকে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়, ভুল করে বসে মেয়ে রিয়া। পালিয়ে যায় ঘর থেকে। এই ‘ভুল’ই হচ্ছে উপন্যাসের মূলধারা, মূলস্রোত। মায়াবতী পড়ে চিন্তনের বুননে ইতিবাচক গিঁট দেয়ার কৌশল শেখার আলোয় পাঠক-মন আলোকিত হবে। জানা যাবে টিনএজ সমস্যা মোকাবিলার কৌশল। জাগো নিউজের পাঠকের জন্য ধারাবাহিক প্রকাশিত হচ্ছে সাড়া জাগানো উপন্যাসটি—

কলেজের গেটে বেশ জটলা। গেটের বাইরে থেমে গেল গাড়ি। গাড়ি থেকে নেমে আসে চারজন। গেটের কাছে এসে দেখল পুরো গেট খুলে দেয়নি। মানুষ চলাচলের জন্য খুলে রাখা হয়েছে মূল ফটকের ছোট প্যাসেজ।

একজন একজন করে ঢুকছে ভেতরে। এজন্য এত জটলা।
লাইন করে দাঁড়িয়ে গেল সবাই। দু-চারজন লাইন ছাড়া ঢোকার চেষ্টা করছে। এজন্য পাশ থেকে শাউটিং হচ্ছে।
ব্যাপার কী, এত ভিড় কেন? জানতে চায় যূথী।
‘সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা’ সাতটার আগে শুরু হবে না। এখন মাত্র ছ’টা বাজে। একঘণ্টা আগে এত ভিড় কেন? রিয়াও প্রশ্ন করে। অনুষ্ঠান উপস্থাপন করবে ও। তবে অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় আছে মুনাসহ আরও অনেকে। ওর ইতোমধ্যে ভেতরে থাকার কথা।
পাশ থেকে একজন বলল, আসিফ আসবে। ফাতেমা-তুজ-জোহরা আসবে। আরও আসবে পাপিয়া সারোয়ার। ভিড় হবে না?

পাপিয়া সারোয়ারের কথা শুনে তৃপ্ত হয় কুসুম। শান্তি জাগে মনে। পাপিয়ার গলার অসাধারণ ভক্ত সে। রিয়াও। আর যূথী ভক্ত আসিফের। বাঁধন সবার ভক্ত। বাঁধনকে নিয়ে আরেক জ্বালা। টিভি মুখ। সবাই চেনে। সবাই অন্যরকম খাতির করে। আলাপ জমাতে চায়।

কুসুম গানের সুরে টেনে টেনে বলল, আমাদের সঙ্গে থাকুন। ট্র্যাকচ্যুত হবেন না প্লিজ।
বাঁধনের মধ্যে জড়তা নেই। মুখে সব সময় হাসি লেগেই থাকে। কুসুমের কথা শুনে ওর উল্লাস আরও বেড়ে গেল। সুর করে সে-ও বলল, লাইনে আছি। চ্যুতির মধ্যে নাই। রাগবেন না প্লিজ।
বাঁধনের কথার ধরন দেখে হুল্লোড় আরও বেড়ে গেল। হাসির ঝড় ওঠে। হইহুল্লোড়ের মধ্যদিয়ে মূল ফটকের ভেতর চলে এলো ওরা।

ক্যাম্পাসের ভেতর আছে রেইনট্রি। গাছটার বিশাল বাহুতলে জড়ো হতে থাকে অনেকে। গাছের তলে চারপাশ ঘিরে রয়েছে বসার ব্যবস্থা। যূথী একটা ফিক্সড সিমেন্টের চেয়ারে বসে পড়ল। পাশে বসার জন্য টেনে ধরে রিয়াকে।
রিয়া বসার সুযোগ পায়নি। ওর সেট বেজে ওঠে।
মুনা কল করেছে। দ্রুত হাতে কল রিসিভ করে রিয়া।
মুনা সরাসরি জানতে চায়, তুই এখন কোথায়?
ক্যাম্পাসে। রেইনট্রি-তলে আছি।
দ্রুত চলে আয় অডিটোরিয়ামে। ড্রেসিংরুমে ভাইস প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডাম অপেক্ষা করছেন। অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ডেকেছেন তিনি। দ্রুত আয়।
আমার সঙ্গে কুসুম, বাঁধন, যূথী আছে। ওদের নিয়ে আসতে পারব ওখানে?
নিয়ে আয়। ওদের অডিটোরিয়ামের ভেতরে বসার ব্যবস্থা করব আমি। তুই ড্রেসিংরুমে চলে আয়। ওদের ড্রেসিংরুমের পাশের লবিতে থাকতে বল। আমি ব্যবস্থা করছি।

রিয়া কুসুমের হাত ধরে। ঝাঁকি দেয় হাতে। যূথীকে টান দেয় অন্য হাতে। আয়। আয়। মুনা ডাকছে। ড্রেসিংরুমে যেতে হবে।
বাঁধন কোথায়?
নেই। পাশে নেই। উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে সে।
ওই যে বাঁধন, অটোগ্রাফ দিচ্ছে।
রিয়া বলল দ্রুত চল। বাঁধনকে নিয়ে আয়। ড্রেসিংরুমের বাইরে তোরা থাকিস।
মহিলা রাজ্য। মহিলা কলেজ। ক্যাম্পাসে কিশোরী তরুণীর ঢল বাড়ছে।
ভিড় ঠেলে সামনে এগোয় রিয়া। বাঁধনের হাত শক্ত করে ধরে টেনে নিয়ে আসে।
সবাইকে নিয়ে সরাসরি ড্রেসিংরুমে ঢুকে গেল রিয়া।

ড্রেসিংরুমে আছেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের দায়িত্বে নিয়োজিত দুজন ম্যাডাম। ম্যাডামদের সঙ্গে কথা বলছেন ভাইস প্রিন্সিপ্যাল। উনাদের পাশে দাঁড়িয়ে কথা শুনছেন প্রোগ্রাম ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত ছাত্রীরা।
ভাইস প্রিন্সিপ্যাল সবার সঙ্গে আলাপ করে বেশ খুশি।
খুশি মন নিয়ে ফিরে যাচ্ছিলেন তিনি, রিয়াকে দেখে থমকে দাঁড়ালেন।
কেমন আছো, রিয়া?
জি ম্যাডাম, ভালো।
পুরোপুরি সুস্থ এখন?
জি! বলেই মুখ তুলে তাকাল, বিস্ময়ান্বিত চোখে প্রশ্ন ছুড়ে দেয় সে, অসুস্থতার প্রশ্ন আসছে কেন, ম্যাডাম?
তোমাকে না সন্ত্রাসীরা তুলে নিয়ে গিয়েছিল? মানসিক বিপর্যয় ঘটেছিল তোমার। তুমিই তো সেই রিয়া, নাকি?
কুসুম পেছন থেকে সামনে এসে দাঁড়াল। খুব শীতলকণ্ঠে ভারী গলায় বলল, ম্যাডাম। ভুল করছেন। সন্ত্রাসীরা ওকে তুলে নিয়ে যায়নি। ওর কোনো মানসিক বিপর্যয় ঘটেনি।
সেকি! শুনেছিলাম ওকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। কয়েকদিন আটকে রেখেছিল। পুলিশ উদ্ধার করেছে।
মুনা রেগে উঠে বলল, ভুল শুনেছেন ম্যাডাম।

আচমকা এমন একটা ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না ভাইস প্রিন্সিপ্যাল। আকস্মিক প্রশ্ন করে ফেঁসে গেছেন তিনি। বুঝতে দেরি হলো না তাঁর। এমনিতে ভালো সুনাম রয়েছে, শিক্ষিকা হিসেবে জনপ্রিয় তিনি। ছাত্রীদের আঘাত করার ইচ্ছা ছিল না। চট করে ঘটে গেছে এমনটা।

প্রোগ্রামের দায়িত্বপ্রাপ্ত নুসরাত ম্যাম পরিস্থিতি সামাল দিয়ে হাসিমুখে বললেন, আপা, রিয়া খুব ভালো উপস্থাপক। আমাদের কলেজের মেধাবী ছাত্রী। আজকের অনুষ্ঠান সে-ই উপস্থাপন করবে।
ওহ! সরি। হ্যাঁ। আমি তো জানি। ওর সুনাম আমার জানা আছে। ঠিক আছে। তোমরা যে যার রোল একবার ম্যাডামের সামনে রিহার্সাল দিয়ে নাও। বলেই ভাইস প্রিন্সিপ্যাল চলে গেলেন।

রিয়া মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
ভাইস প্রিন্সিপ্যাল চলে যাওয়ার পরও স্তব্ধতা পুরোপুরি কাটেনি। সহজ হওয়ার চেষ্টা করছে। সহজ হতে পারছে না।
একজন টিচার ওকে হাত ধরে পাশের লবিতে নিয়ে এলো। তুমি কষ্ট পেয়ো না। ম্যাডাম বুঝে কিছু বলেননি। না-বুঝে নিজের অজান্তে প্রশ্ন করেছেন।
ম্যাডাম। ঠিক আছে। উনি তো বলবেনই।
না। বলা ঠিক হয়নি। বলবেন কেন? তবে আমি নিশ্চিত, উনি অনিচ্ছাকৃতভাবে ব্যাপারটা তুলেছেন। তুমি সহজ হয়ে যাও। অনুষ্ঠানসূচি নিয়ে স্টেজে গিয়ে কয়েকবার একা একা প্ল্যান করো, কীভাবে অনুষ্ঠান সুন্দর করা যায়, সেদিকে মন দাও।
রিয়া বলল, আমি চেষ্টা করব ম্যাম।
এই তো, লক্ষ্মী মেয়ে! বলেই ম্যাম ওর ডান হাত ধরে শক্ত করে একবার চাপ দিলেন, সাহস দিয়েই নিজের কাজে অন্যদিকে চলে গেলেন। যাওয়ার সময় বললেন, ঠিক সাতটায় অনুষ্ঠান শুরু হবে। প্রস্তুত থেকো।
রিয়া বলল, আচ্ছা ম্যাম। প্রস্তুত থাকব।
কুসুম, মুনা, বাঁধন ও যূথী একসময় রিয়ার পাশে এসে দাঁড়াল। অন্যরাও।
রিয়াকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ওরা স্টেজের দিকে রওনা হয়।
মুনা বাকিদের অডিটোরিয়ামের সামনের দিকের আসনে বসিয়ে দিয়ে আসে।

সন্ধ্যা সাতটা।
অডিটোরিয়ামের স্টেজের কালো স্ক্রিন এখনও ওঠেনি। মঞ্চে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে রিয়া।
বিশাল স্ক্রিন, ছাদের কাছ থেকে ঝুলে আছে মঞ্চের পাটাতন বরাবর।
একটা সরু আলোর বিম বাঁ অ্যাঙ্গেল থেকে থ্রু করা আছে রিয়ার মুখের ওপর। মুখ স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছে। চারপাশে অন্ধকার।
রিয়া চোখ বুজে আছে। উপস্থাপক রিয়ার মূল আকর্ষণই হচ্ছে ন্যাচারাল লুক। গ্ল্যামার নয়। সহজ সাধারণ লুক, প্রাণবন্ত সজীব অভিব্যক্তি, শুদ্ধ শব্দচয়ন, উচ্চারণের মধুর প্রক্ষেপণই ইতোমধ্যে কলেজে রিয়াকে পপুলার করে তুলেছে।
এই মুহূর্তে রিয়ার লুক ন্যাচারাল মনে হচ্ছে না। আর্টিফিসিয়াল লাগছে। মুনা পাশ থেকে বলল, রিয়া, মাই ফ্রেন্ড বি ইজি।

রিয়া শুনতে পেল শব্দটা।
চোখ বন্ধ করে কল্পনার চোখে দেখছিল ভাইস প্রিন্সিপ্যাল ম্যাডামের মুখ! বুকের ফাটল দিয়ে ছুটে আসছিল কান্নার ঢেউ। বন্ধ চোখের পাতার ভেতর টলেটলে উঠছিল অশ্রুকণা। স্ক্রিনের ওপারে বসে আছেন অসংখ্য দর্শক। সামনের সারিতে সম্মানিত অতিথিরা। স্ক্রিন সরে গেলেই সবার চোখ এসে পড়বে তার মুখের ওপর। কিছুই ভাবনায় ছিল না। মুনার কণ্ঠ শুনে রিয়া ফিরে এলো বাস্তবে। সামনে তাকাল। সামনে কালো স্ক্রিন। অন্ধকার। অন্ধকারের বুক বিদীর্ণ করে ও একটু দূরেই দেখতে পেল আরেক অন্ধকার জগৎ। ওই জগতে সে যেতে চায় না। কিছুতেই না। ফিরে আসতে চায় বর্তমান আলোয়। ফিরে আসতে চায় হাজারো দর্শকের মাঝে। বুকের ভেতর থেকে ডাক আসে। সাহস আসে। সাহস নিয়ে মনে মনে বলল, শক্তি চাই। আলো চাই। অনেক আলো। আলোর বন্যায় ভেসে যাক সামনের অন্ধকার।

...স্ক্রিন খুলে যাচ্ছে। রিয়ার ন্যাচারাল লুক জেগে উঠেছে। রিয়া শুরু করেছে অনুষ্ঠান...

চলবে...

এসইউ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]