তাইজুল ইসলামের গল্প: খোকন সোনা

সাহিত্য ডেস্ক
সাহিত্য ডেস্ক সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:৩৪ পিএম, ০৭ জুন ২০২২

 

জানো তো, খোকন সোনাটা আর আগের মতো নেই। সে এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। অনেক বদলে গেছে। খোকনের আব্বু! কখনো কি ভেবেছিলে, আমাদের খোকন এতটা বদলে যাবে? কখনো কি ভেবেছিলে, খোকন এরকম রাত করে বাড়ি ফিরবে? কখনো কি ভেবেছিলে, খোকনকে ছাড়া এই ঘরটায় থাকবো? কতো ভালোই না ছিল আমাদের খোকন, বলো! আমরা কি কখনো ভেবেছি, আমাদের খোকন এমনটি হবে!

জানো, খোকনের ছেলেবেলাটা না খুব মনে পড়ছে। তোমার কি মনে পড়ে খোকনের সেই আধো আধো বুলি? তোমার কি মনে পড়ে খোকনের পাগলামিগুলো? খুব মনে পড়ছে জানো তো! জানো, খোকনের স্কুলবেলা না এখনো আমার চোখে ভীষণভাবে ভেসে বেড়ায়! তোমার কি মনে পড়ছে খোকনের প্রথমদিনের স্কুলে যাওয়ার কথা? খোকনের সবকিছু খুব মনে পড়ছে জানো তো! আমি না খোকনকে ছাড়া রাতে ঘুমোতেই পারি না। এখনো রাতে উঠে ওর রুমটায় যাই, ও ঘুমোচ্ছে কি না দেখতে। কিন্তু খোকনকে আর দেখি না। ঘরটা বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগে খোকনকে ছাড়া।

ঘর আলো করে এসেছিল আমাদের খোকন। ছেলে হওয়ার আনন্দে সামান্য রোজগারের পয়সা দিয়ে কত কী-ই না করেছিলে সেদিন! ভীষণ মনে পড়ছে গো সেই দিনটা। খোকন যখন থেকে ভালোভাবে আব্বু আম্মু বলে ডাকতে লাগলো, তখনো কিন্তু অতটা আনন্দ হতো না, যতটা আনন্দ হতো যখন খোকনটা তার আধো আধো বুলিতে আব্বা আম্মা বলে ডাকতো। মনে হয়েছিল, পৃথিবীর সব সুখ এনে দিয়েছে আমাদের খোকন সোনা। তোমাকে প্রথম আব্বা বলে ডেকেছিল বলে কতো খুনসুটিই না করতে আমার সঙ্গে! মনে পড়ে তোমার সেই দিনগুলোর কথা?

জানো তো, আমার এখনো মনে হয় কুপির আলোয় বসে আমি আমার খোকন সোনার হাত ধরে অ-আ-ক-খ লিখছি। আর আমার খোকনও না আমার মুখটি চেয়ে টপাটপ করে পড়ছে সেগুলো। কত সুন্দর করেই না ছড়া কাটতো বলো! আমাদের কুটিরে তুমি আমি আর আমাদের খোকন সোনা মিলে খেজুর পাতার পাটিতে শুয়ে কত গল্পই না করেছি বলো!

মনে পড়ে তোমার, তুমি খোকনকে নতুন নতুন ছড়া শেখাতে আর খোকনও কেমন সুন্দর করে আওড়াতো সেগুলো? জানো, আমি আজও হাতড়ে বেড়াই সেসব! তোমাকে ঠিকই পাই, কিন্তু আমাদের খোকনটাকে আর আমাদের মধ্যখানে পাই না। জানো, আমি আজও শুনি তোমার সেই ছড়াগুলো। কিন্তু খোকনটা আর তোমার সঙ্গে পড়ছে না।

আচ্ছা, তোমার কি খোকনের সেই স্কুলে যাওয়ার প্রথম দিনটার কথা মনে আছে? ওই তো আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, আমার খোকন স্কুলে যাচ্ছে। আমার খোকন আজ প্রথম স্কুলে যাবে, তাই ভালো-মন্দ রান্না করেছি। খোকনকে নিজের হাতে আদর করে খাইয়ে দিচ্ছি। খোকনের যখন খাওয়া শেষ, অমনি আমি হাত ধুয়ে খোকনকে স্কুল ড্রেসটা পরিয়ে দিচ্ছি। আমার খোকনটা না বড্ড দুষ্টু। চুলে মোটে সিঁথি কাটতে দিতেই চাইতো না। কত প্রশংসা করে করে যে সিঁথিটা কাটতে হতো ওর!

তোমার আর আমার হাত ধরেই খোকনের সেদিন প্রথম স্কুলে যাওয়া। খোকনও কত খুশি ছিল বলো! জানো, খুব মনে পড়ছে সেই দিনটার কথা। মনে পড়ছে খোকনের স্কুলে যাওয়ার দিনগুলো। আমাদের খোকন তো নিয়মিত স্কুলে যেত। তুমি প্রতিদিন খোকনের হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যেতে। আমি বাড়ির সামনের পথটায় দাঁড়িয়ে তোমাদের যাওয়া চেয়ে চেয়ে দেখতাম। খোকনকে স্কুলে দিয়ে ওই পথে অমনই কাজে চলে যেতে তুমি। ছুটির সময়টায় আমি গিয়ে খোকনকে নিয়ে আসতাম।

জানো, তুমি তো ওকে স্কুল অবধি ছেড়ে যেতে। কিন্তু আমি যখন ওকে আনতে যেতাম, স্যার-ম্যাডামরা যে কত প্রশংসা করতো আমাদের খোকনকে নিয়ে! জানো তো, খোকনের কথা শুনে আমার বুকটা ভরে যেত। তুমিও তো সব সময় বলতে, আমাদের খোকনবাবুর মাথাটা ভীষণ ভালো। দেখবে, ও আমাদের নাম উজ্জ্বল করবে। বলতে না বলো? খুব মনে পড়ছে গো সেই দিনগুলো।

দেখতে দেখতে খোকন সোনাটা কেমন বড় হয়ে গেল। ফাইভে ভালো রেজাল্টও এলো। হাইস্কুলে ভর্তি হলো আমাদের খোকন। নিয়মিত স্কুলে যেতে লাগল ও। সেখানেও স্যারেরা ওর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কত তাড়াতাড়িই সেই দিনগুলো যেতে লাগল বলো! বছর শেষ হচ্ছে। আমাদের খোকন ভালো রেজাল্ট করছে আর ওপরের ক্লাসে উঠছে। খোকনটা স্কুল থেকে এসেই বলতো, ‘আম্মু খেতে দাও!’ আমিও খোকনের জন্য বসে থাকতাম, কখন আসবে আমার বাবুটা।

জানো তো, আজও খোকনের জন্য খাবার নিয়ে বসে থাকি। কিন্তু খোকন সোনাটা একটি বারের জন্যও বলে না, ‘আম্মু ভাত দাও, ক্ষিধে পেয়েছে খুব!’ জানো তো, আমি আজও একঘুম পরে বলে উঠি, ‘খোকন সোনা আমার, অনেক রাত হয়েছে, এখন ঘুমোও। এত রাত করে ঘুমোলে তোমার যে আবার শরীর খারাপ করবে বাবু!’ ভালোই কাটতে লাগলো দিনগুলো আমাদের।

আমাদের খোকন ম্যাট্রিকেও খুব ভালো করলো। তোমার কথা রেখেছে। আমাদের মুখ উজ্জ্বল করেছে। খোকন সোনাটা বরাবরই আমাদের মুখ উজ্জ্বল করে এসেছে। তোমার মনে পড়ে, পাড়াসুদ্ধ সবাই একবার আমাদের ছেলেটার প্রশংসা করতো? সবাই বলতো, আমাদের খোকন ঠিক আমাদের মতোই হয়েছে। খুব মনে পড়ছে গো সেই দিনগুলো! জানো, আজ না কিছুতেই মনে করতে পারছি না, শেষ কবে খোকনের নামে প্রশংসা শুনেছি! কিছুতেই মনে করতে পারছি না, শেষ কবে খোকন সোনাটা একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছিল।

মাধ্যমিক দেওয়ার পরে আস্তে আস্তে কেমন যেন হয়ে গেল আমাদের খোকনটা। ভাবলাম, বেশ কিছুদিন ছুটি পেয়েছে, তাই হয়তো একটু ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু দিন যায় আর বদল আসে। দু’একটা নালিশও আসতে শুরু করলো বাড়ি। কত করে বলেছি, খোকনবাবু আমার, তুমি ওদের সঙ্গে মিশো না বাবা! তোমার আব্বু তোমার জন্য কত কষ্টটাই না করে বলো! কেউ যদি তোমাকে নিয়ে তোমার আব্বুকে কথা শোনায়, তবে তার খারাপ লাগে না বলো!

জানো, খোকনটা না তখন ধমক দিয়ে বসতো! জানো, খোকন যেদিন প্রথম আমায় ধমক দিলো, আমার সঙ্গে তর্ক করলো, সেদিন কয়েকটা আঁচড় কেটেছিল বুকের ভেতরটায়। জানো, আমি খোকনের হাত ধরে, চোখের জল ফেলে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি। খোকন আমায় সান্ত্বনা দিতো। মিথ্যে সান্ত্বনা। আচ্ছা, আমরা কি কখনো ভেবেছি, আমাদের খোকন এমন হবে? কখনো কি ভেবেছিলে, যেই খোকন বইপড়ার জন্য রাত জাগতো, সেই খোকন বন্ধুদের সঙ্গে নেশায় ডুবে থাকবে রাতভর?

জানো, আমি না চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকতাম। চোখের পাতায় ঘুম নামতো না। খোকন যদি ভয় পায়! পড়া শেষ করে ও যখন ঘুমুতে যেতো, আমিও তখন ওর সঙ্গে ঘুমোতাম। আমি না কখনো ভাবতেই পারিনি, আমার সেই খোকন নেশাগ্রস্ত হয়ে রাত করে বাড়ি ফিরবে। জানো, খোকন নাকি কলেজে না গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে নেশা করে বেড়াতো। চোখের সামনে খোকনটা আমাদের শেষ হয়ে যাচ্ছিল। সারারাত তুমি আর আমি খোকনের যন্ত্রণায় ছটফট করতাম। খোকন কি একটুও বুঝতো না?

দু’দিন পরপর খোকন অসুস্থ হয়ে পড়তো। অসুস্থ হলেই বলতো, ‘আম্মু, আমি আর ওসব করবো না।’ আমিও খোকনকে বোঝাতাম। কিন্তু খোকন সব সময়ই আমাদের ঠকালো বলো! সুস্থ হলেই আবার শুরু করে দিতো। জানো খোকনের আব্বু, দিনগুলোর কথা আমি একটুও ভুলতে পারছি না গো!

জানো খোকনের আব্বু, সেদিন রাতের কথা আজও আমায় ঘুমোতে দেয় না। খোকনটা ওইদিন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরলো। তুমি আর আমি কতো খুশি হয়েছিলাম বলো তো! আর ওই রাতেই খোকন আমাদের শেষবারের মতো খুশি করে গেলো। খোকনের আব্বু, আমরা তো সুখেই ছিলাম বলো। কিন্তু এরকম সুখ কি আমরা কখনো চেয়েছি বলো?

কখনো কি ভেবেছি, আমাদের বাবুসোনাটা দিনের পর দিন বিষ খেয়ে ঘরে ঢুকবে! কখনো কি ভেবেছি, আমাদের এই আলোর ঘর অন্ধকারে ঢেকে আমাদের বুক খালি করে চলে যাবে আমাদের খোকন! আমাদের খোকনটা কেন এমন করলো! বলো না খোকনের আব্বু! বলো না!

আমার যে খোকনকে খুব মনে পড়ছে। কাছে পেতে ইচ্ছে করছে। খোকনকে ভেবে আঁচল উঁচিয়ে খোকনকে কেন পাই না বলো তো? ওকে যে বড্ড বুকে জড়াতে ইচ্ছে করছে। এই তো খোকনকে দেখছি। তাহলে মুখ বাড়িয়ে চুমু খেতে গেলেই কেন পারছি না বলো তো! ওকে যে ভীষণ চুমু খেতে মন চাইছে। একবার ভীষণ বুকে জড়াতে ইচ্ছে করছে। আজ যে আমার খোকন সোনার জন্মদিন।

গল্পকার: শিক্ষার্থী, সম্মান ৪র্থ বর্ষ, ইংরেজি বিভাগ, সরকারি বঙ্গবন্ধু কলেজ, গোপালগঞ্জ।

এসইউ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]