গল্পের মোড়কে মানুষ: প্রেমের অন্তরালে মানবিক বিশ্ব

সাহিত্য ডেস্ক
সাহিত্য ডেস্ক সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:২৮ পিএম, ২৮ নভেম্বর ২০২১

পলিয়ার ওয়াহিদ

রিপন আহসান ঋতুর উপন্যাসটি শহীদুল জহিরের ‘ডুমুরখেকো মানুষ’ গল্পের কথা মনে করিয়ে দেয়। ‘গল্পের মোড়কে মানুষ’ তাই পিপাসা জাগায়। তাড়িয়ে নিয়ে চলে উপন্যাসের চরিত্র ও বয়ানে। অমিয় আর হাসনাহেনার গল্প বলতে গিয়ে ঋতু শুধু তাদের গল্পের খাঁচায় বন্দি থাকেননি। অমিয় ও হাসনাহেনার চারপাশও পর্যবেক্ষণ করেছেন নিবিড়ভাবে। যত্নের সঙ্গে তুলে ধরেছেন স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা, যাতনা ও সংগ্রাম। সাথে সাথে ব্যর্থতার কালি ও সফলতার সুরমাও তিনি মাখিয়ে দিয়েছেন এসব গল্পের চোখে-মুখে।

অমিয় আগাগোড়া প্রেমিক, প্রতিবাদী ও বিশ্বচেতনের অধিকারী। প্রেমিকা হারিয়ে সে শহরে পাড়ি জমায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। ক্যাম্পাসে তার তুখোড় পাঁচজন বন্ধুও জোগাড় হয়ে যায়। ডালিয়া ও হাসান লেখাপড়ায় সিরিয়াস। সিঁদুল আর সাগুফতা পুরো উল্টো। তাদেরও ভাঙা আয়নার মতো জড়ো করে মমতার সঙ্গে। সবচেয়ে বেশি চর্চিত সিঁদুল বাংলা সাহিত্যে পড়লেও আঁকাআঁকিই তার মন ও মগজজুড়ে গনগন করে। ফলে অমিয়র সঙ্গে সিঁদুলের সম্পর্কটাই শেষ পর্যন্ত আসতে দেখা যায়। কারণ দুজনই শিল্পমনস্ক ও মানবিক। কিন্তু সিঁদুলের শিল্পিত খাপছাড়া অভ্যাস ও তার প্রেমিকা নিয়ে পাহাড়ে গিয়ে ছবি আঁকতে আঁকতে তাকে হারিয়ে ফেলার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পাঠকের রক্তে।

আরেক ব্যক্তি গল্পের মোড়কে বাজান অদৃশ্য বাঁশি। সে ফিরোজা রঙের কামিজ পরা কাশ্মিরী আপেল রঙের মেয়ে। দেশপ্রেমে মরণোন্মুখ সংগ্রামী নায়কের বর্ণনা খুব কম সময়ে হলেও পাঠককে ছুঁয়ে যায়। মন টনটন করে ওঠে প্রতিবাদে। নায়কের মোড়কে সেখানে আমরা প্রতিবাদ, নির্যাতন আর রাষ্ট্রের কায়েমি স্বার্থের জন্য জনগণকে শত্রু করে তোলার যে পরিচর্যা, তা ঋতু চোখে আঙুল ঢুকিয়ে দেখিয়ে দেন। সবচেয়ে বেশি যত্ন করে গড়ে তোলা হাসনাহেনা ও বৃক্ষপ্রেমিক কাদের চাচাকে কেউ ভুলতে পারবে না।

প্রেমিক থেকে বৃক্ষপ্রেমিক অমিয় ক্রমেই যে পরিবেশ পুঁজিবাদের লোভের ছুরিতে কাটা পড়ছে, তাতে যেন লতাপাতার রস দিয়ে সারিয়ে তুলতে চান। অমিয় সত্যিই যেন গল্পের বা উপন্যাসের নায়ক নন, আমাদের পরিবারের, সমাজের, রাষ্ট্রের তথা দেশের নায়ক, তা ডুব-সাঁতারে জানান দেয়। সুন্দর পৃথিবী যতই আতঙ্কিত আর ভয়ের হোক না কেন তা সুন্দর করে তুলতেই তার যুদ্ধ। কোনো অজুহাত ছাড়াই পরম যত্নে চরিত্রের বুনন সোনালি দিনের পাতায় ও রূপালি স্বপ্নের আঙিনায় উত্তম পুরুষের বর্ণনা করে ঢুকে পড়ে। এই যে নিজের নায়ক মনকে তিনি উপন্যাসের নায়ক শরীরে ভরিয়ে দিচ্ছেন সেখানেও দরদী মনের পাগলামি।

রিপন আহসান ঋতুর নিটোল বর্ণনা, চরিত্রের বিচিত্রতা, মানবিক ও বিশ্বমনের সমন্বয়, বৃক্ষ ও গানের পৃথিবী রচনার যে স্বপ্ন অমিয়কে দিয়ে দেখিয়েছেন, তা সত্যিই অমূল্য ও প্রসংশার দাবি রাখে। তাই বলে মোজ্জামেল চেয়ারম্যানকে মোড়ল রূপে দেখে ধিক্কার দিতে ভুলবে না পাঠক। গাছের গুণ নিয়ে ‘রাতের ময়ূর’ তৈরি করা সেই শিক্ষককেও ভুলতে পারবে না অনেক পাঠক। সেভাবে অমিয় ভুলতে পারে না হাসনাহেনাকে। সে যেন হাসনাহেনা ফুলের মতো ঘ্রাণ ছড়িয়ে তাকে সারাজীবন ব্যাকুল করে রাখে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার খবর পাওয়ার পরও সে হেনার স্বপ্নে বিভোর হয়ে রয়। প্রেমিকের এই শিশুসুলভ মনকে পাঠকের চোখে পানি এনে দেয়। যেন বাতাসও বলে ওঠে অমিয়.. হেনা...

কিন্তু উপন্যাস হিসেবে এটাকে আরও কমে শেষ করা যেত। বর্ণনার কিছু ভারিক্কি চোখে পড়ে। অনেক জায়গায় নিজের মুন্সিয়ানা দেখাতে গিয়ে বাক্যের শরীরে বাড়তি অলংকার দৃষ্টিকটু লাগে। দারুণ একটা সফলতা হলো, যখন দেখি কোথাও হাসনাহেনার উপস্থিতি না ঘটিয়েও সবখানেই হাসনাহেনাকে উপস্থাপন করা হয়েছে। উপন্যাসটি স্রেফ ৪৮ পৃষ্ঠায় শেষ করতে পারলে নিটোল ও রোমান্টিক, বৃক্ষময় বিশ্বসহ নানাভাবে সমাদৃত হতে পারত। হে মরমী পাঠক, অন্যের মুখে ঝাল না খেয়ে আপনিও হাসনাহেনার তলায় থানকুনি ও অ্যালোভেরাও খুঁজে পাবেন। তুলসি ও আমলকিকে তুলতে না পারলেও ভুলতে পারবেন না কখনো। এই হলো এ উপন্যাসের উন্মুল সার্থকতা।

বইয়ের ধরন: উপন্যাস
প্রকাশনী: শুদ্ধ প্রকাশ
প্রকাশকাল: বইমেলা ২০২০
প্রচ্ছদ: চারু পিন্টু
মূল্য: ২৫০ টাকা

এসইউ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]