ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. অর্থনীতি

দুরবস্থায় সরকারি ব্যাংক

মামলায় ঝুলে আছে এক লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ‘মন্দ ঋণ’

সাঈদ শিপন | প্রকাশিত: ১০:০৩ এএম, ১২ এপ্রিল ২০২৬

রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় বাণিজ্যিক ব্যাংক- সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বিডিবিএল (বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড) ও বেসিক ব্যাংকের মোট ৪৭ হাজার ৭১৪টি মামলা বর্তমানে বিচারাধীন। এসব মামলার মধ্যে রয়েছে অর্থঋণ, রিট ও সার্টিফিকেট মামলা। এসব মামলায় আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ ৪৩ হাজার কোটি (এক লাখ ৪২ হাজার ৭০৭ কোটি ৫৫ লাখ) টাকা।

জাগো নিউজের নিজস্ব অনুসন্ধান এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় বাণিজ্যক ব্যাংকের মামলার এ তথ্য পাওয়া গেছে। মামলাজটের কারণে বিপুল অঙ্কের অর্থ দীর্ঘদিন আটকে থাকায় তা ব্যাংক খাতের ঝুঁকি ও চাপ ক্রমেই বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশ্লেষক ও ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণের মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকায় ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। তারল্য ও স্থিতিশীলতায় চাপ তৈরি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ আদালত স্থাপন, অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া অপরিহার্য।

তারা আরও বলেন, ব্যাংকের অর্থ মূলত জনগণের আমানত, তাই এই অর্থ আত্মসাৎ বা অপব্যবহারকে সাধারণ খেলাপি হিসেবে দেখা উচিত নয়। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শক্তিশালী আইন কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে। সরকার চাইলে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে স্বল্প সময়ে এসব মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব।

অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, ২০২৫ সালের শেষে সোনালী ব্যাংকের মোট মামলা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ২৬৪টি। এসব মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ ২৫ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩৮৭টি অর্থঋণ মামলায় ২৫ হাজার ২১৯ কোটি টাকা, ২৬৮টি রিট মামলায় ১৬৩ কোটি এবং ৬ হাজার ৬০৯টি সার্টিফিকেট মামলায় ৫১ কোটি টাকা আটকে রয়েছে।

বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণের মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকায় ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ আদালত স্থাপন, অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া অপরিহার্য।- সোনালী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী

এক বছর আগে অর্থাৎ ২০২৪ সালে ব্যাংকটির মামলা সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৪৭টি এবং অর্থের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে মামলার সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৯৯৮টি এবং অর্থের পরিমাণ ২৪ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা।

জনতা ব্যাংকের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের শেষে মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ২২৪টি। এসব মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ ৭০ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা, যা ছয় ব্যাংকের মধ্যে সব থেকে বেশি। এর মধ্যে ২ হাজার ৪১৩টি অর্থঋণ মামলায় ৫৯ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা, ১৮৩টি রিট মামলায় ১১ হাজার ২৯৯ কোটি এবং ৮ হাজার ৬২৮টি সার্টিফিকেট মামলায় ৩৯ কোটি টাকা রয়েছে।

এর আগে ২০২৪ সালে ব্যাংকটির মামলার সংখ্যা ছিল ১২ হাজার ৪১টি এবং অর্থের পরিমাণ ছিল ২৮ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা। আগের বছর ২০২৩ সালে মামলার সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৮৩৪টি এবং অর্থের পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা।

আরও পড়ুন
দুই মাসে ব্যাংকের বাইরে নগদ বেড়েছে ১৩৬০০ কোটি টাকা 
বাজেট ২০২৬-২৭: বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতি ও সুশাসনের ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ 
মধ্যপ্রাচ্যনির্ভরতায় ঝুঁকিতে রেমিট্যান্স 

অগ্রণী ব্যাংকে ২০২৫ সালের শেষে মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৫৪টি, যা ছয় ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এসব মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ ১৭ হাজার ৫৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৪ হাজার ৪৭৮টি অর্থঋণ মামলায় ১৫ হাজার ১১৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা, ২৫৮টি রিট মামলায় এক হাজার ৮৭৪ কোটি ৪ লাখ টাকা এবং ১৫ হাজার ৩১৮টি সার্টিফিকেট মামলায় ৬৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা রয়েছে।

ব্যাংকটির ২০২৪ সালে মামলার সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৩৯২টি এবং অর্থের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ১২৬ কোটি টাকা। তার আগের ২০২৩ সালে মামলার সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ৭০৬টি এবং অর্থের পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৭৮৩ কোটি টাকা।

রূপালী ব্যাংকে ২০২৫ সালের শেষে মামলা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭০২টি। এসব মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ ১১ হাজার ১৭৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৪৮টি অর্থঋণ মামলায় ১১ হাজার ১৭১ কোটি ৪ লাখ টাকা এবং ২ হাজার ৫টি সার্টিফিকেট মামলায় ৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা আটকে রয়েছে। তবে ব্যাংকটির ১৪৯টি রিট মামলায় আটকে থাকা অর্থের তথ্য পাওয়া যায়নি।

২০২৪ সালে ব্যাংকটির মামলার সংখ্যা ছিল ৪ হাজার ৪৭৩টি এবং অর্থের পরিমাণ ছিল ৯ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে মামলার সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ১০৮টি এবং অর্থের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৫১৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা।

২০২৫ সালের শেষে বিডিবিএলের মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৮০টি এবং জড়িত অর্থের পরিমাণ ২ হাজার ১৩ কোটি ১২ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৬৫২টি অর্থঋণ মামলায় ২ হাজার ১ কোটি ৩১ লাখ টাকা এবং ২৪টি সার্টিফিকেট মামলায় ১১ কোটি ৮১ লাখ টাকা রয়েছে। তবে ১০৪টি রিট মামলার অর্থের তথ্য পাওয়া যায়নি।

ব্যাংক মূলত আমানতকারীদের টাকাই ঋণ হিসেবে বিতরণ করে। সেই অর্থ যদি ফেরত না আসে, তাহলে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, যা পুরো খাত ঝুঁকির মুখে ফেলে।- অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার

২০২৪ সালে ব্যাংকটির মামলার সংখ্যা ছিল ৫৬৮টি এবং অর্থের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭৯৯ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এর আগে ২০২৩ সালে মামলার সংখ্যা ছিল ৫৪২টি এবং অর্থের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭৯০ কোটি টাকা।

বেসিক ব্যাংকে ২০২৫ সালের শেষে মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৯০টি। এসব মামলায় জড়িত অর্থের পরিমাণ ১৬ হাজার ৬০ কোটি টাকা, যা পুরোপুরি অর্থঋণ মামলার আওতাভুক্ত। ব্যাংকটির ৫৩৫টি অর্থঋণ মামলা ও ১৫৫টি রিট মামলা রয়েছে, তবে কোনো সার্টিফিকেট মামলা নেই।

প্রতিষ্ঠানটির ২০২৪ সালে মামলার সংখ্যা ছিল ৬১০টি এবং অর্থের পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। ২০২৩ সালে মামলার সংখ্যা ছিল ৫২১টি এবং অর্থের পরিমাণ ছিল ১৩ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা।

আরও পড়ুন
ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ: সংসদে অর্থমন্ত্রী 
সন্ধ্যায় শপিংমল-দোকান বন্ধ হওয়ায় বিক্রিতে ধস, ধাক্কা বৈশাখী বাজারেও 
জ্বালানি সংকটের মধ্যে সোলার পণ্যের বিক্রি চাঙা 

রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মামলার বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ও সোনালী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, দেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে একটি জটিল ও চক্রাকার সংকটে আটকে আছে, যা থেকে উত্তরণে সমন্বিত ও বহুমাত্রিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

তিনি বলেন, বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণের মামলাগুলো বছরের পর বছর ঝুলে থাকায় ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ আদালত স্থাপন, অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া অপরিহার্য।

মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী আরও বলেন, ব্যাংকের অর্থ মূলত জনগণের আমানত। তাই এই অর্থ আত্মসাৎ বা অপব্যবহারকে সাধারণ খেলাপি হিসেবে দেখা উচিত নয়। খেলাপিদের দুই ভাগে (সাধারণ ও ইচ্ছাকৃত) বিভক্ত করে বিশেষ করে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শক্তিশালী আইন কাঠামো প্রণয়ন করতে হবে।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ আদালত খেলাপিদের প্রতি তুলনামূলক কম সহানুভূতিশীল হচ্ছে, যা ইতিবাচক দিক। তবে আদালতগুলোকে আরও দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে, কারণ এসব অর্থ জনগণের সম্পদ।

অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ছয় ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ ঋণ মামলায় আটকে থাকায় পুরো ব্যাংক খাত দুর্বল হয়ে পড়ছে। প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার মতো অর্থ বিভিন্ন মামলায় আটকে থাকায় সময়মতো আদায় সম্ভব হচ্ছে না, ফলে ব্যাংকগুলোর তারল্য ও স্থিতিশীলতায় চাপ তৈরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, ব্যাংক মূলত আমানতকারীদের টাকাই ঋণ হিসেবে বিতরণ করে। সেই অর্থ যদি ফেরত না আসে, তাহলে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, যা পুরো খাতকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।

দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক ঋণ মামলা ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে বলেও জানান তিনি। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ এবং সরকারের কার্যকর উদ্যোগ জরুরি বলে মত দেন সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ।

তিনি আরও বলেন, একটি মামলার পেছনে আদালত, আইনজীবীসহ নানান প্রক্রিয়া জড়িত থাকলেও সরকার চাইলে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে স্বল্প সময়ে এসব মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব। ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দ্রুত ঋণ আদায় ও মামলা নিষ্পত্তির কোনো বিকল্প নেই।

এমএএস/কেএসআর/এমএফএ