পাঠকের মননই তো লেখকের তীর্থস্থল: নুসরাত সুলতানা
ফাইল ছবি
নুসরাত সুলতানা দ্বিতীয় দশকের কবি এবং কথাসাহিত্যিক। তার কবিতায় যেমন আছে উপমা, উৎপ্রেক্ষা আর গভীর বোধের সম্মিলন। তেমনই গল্পেও আছে দারুণ ন্যারেটিভস সমৃদ্ধ দৃশ্যকল্প, চিত্রকল্প এবং দারুণ সব অভিঘাত। চরিত্র নির্মাণে তিনি এরই মধ্যে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। সম্প্রতি তার পথচলা এবং সাহিত্যচর্চা নিয়ে কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে। তার সাথে আলাপচারিতায় মেতে উঠেছেন তরুণ প্রাবন্ধিক ও গবেষক রত্না মাহমুদা—
জাগো নিউজ: সাহিত্য জগতে আপনার পথচলার শুরু কীভাবে?
নুসরাত সুলতানা: সাহিত্য তো জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত একটা প্রেক্ষিত বা বিষয়। খুব ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের সাথে আমার গভীর প্রেম। অষ্টম শ্রেণিতে বসে পড়েছিলাম নজরুলের গল্প ‘জীনের বাদশা’, ডিএইচ লরেন্সের উপন্যাস ‘লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার’, আল মাহমুদের উপন্যাস ‘ডাহুকী’। তার আগে কবিতা পড়তাম খুব। তখন থেকেই সিরিয়াস সাহিত্যের প্রতি সমর্পণ তৈরি হয়। প্রথমে মুখে মুখে একটা ছড়া বলেছিলাম চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময়। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় লিখতাম। এরপর চাকরি, সংসার, মাতৃত্ব, বাবা-মা, ভাই-বোনের দায়িত্ব। অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই সাহিত্য থেকে। দ্বিতীয় মেয়াদে লিখতে শুরু করি মায়ের মৃত্যুতে যখন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ি। তখন আমার স্বামী আজিজুল ইসলাম আমাকে লিখতে উদ্বুদ্ধ করেন। সেটা ২০১৭ সাল। তারপর লিখে যাচ্ছি।
জাগো নিউজ: একটি কবিতা বা গল্প জন্ম নেওয়ার প্রক্রিয়াটি কেমন হয়?
নুসরাত সুলতানা: কবিতা লেখার সময় হয়তো একটা শব্দ মাথায় আসে বা একটা বাক্য। কিংবা গভীর আবেগ, উপলব্ধি, ক্ষোভ, হতাশা যে কোনো কিছু। তারপর মাকড়সার মতো জাল বোনা চলে মগজে ও মননে। আর গল্পের কথা যদি বলি, একটা দৃশ্যকল্প চোখের সামনে ভেসে ওঠে। অথবা চরিত্রের যে কোনো একটা সংলাপ। এরপর এগিয়ে যায় আলো-আঁধারির খেলা। তবে চরিত্র অনেক সময়ই কথা শোনে না। নিজের ইচ্ছে মাফিক হাঁটে। সব সময় গল্পকার এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতেও পারেন না। জগৎ সংসারে কে কার কথা শোনেন! নিজের মন-মগজও খামখেয়ালি করে যখন-তখন।
জাগো নিউজ: আপনি কি নিয়মিত লিখতে বসেন নাকি অনুভূতির তীব্রতা এলে তবেই লেখেন?
নুসরাত সুলতানা: আসলে প্রকৃত অর্থে আমি সব সময়ই লেখায় বাস করি। যদিও চাকরি, সংসার, ছেলের পড়াশোনা, প্রার্থনা সবই করি। কিন্তু আমার লেখার ভাবনা বা চরিত্ররা আমার সাথে ছায়ার মতোই থাকে। গল্পের বা উপন্যাসের চরিত্ররা খুবই উৎকৃষ্ট সঙ্গী।
জাগো নিউজ: সামাজিক বাস্তবতা ও ব্যক্তিগত অনুভূতি—আপনার লেখায় কোনটি বেশি জায়গা পায়?
নুসরাত সুলতানা: ব্যক্তি যেমন সমাজের শক্তিশালী উপাদান। তেমনই সমাজ কাঠামো বা রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যক্তির মনোস্তত্ত্বের গঠন বা চিন্তা প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। তাই আমি এই দুটোকে খুব আলাদা করে দেখি না। রাষ্ট্র ব্যবস্থা ভালো না হলে ব্যক্তি স্বপ্ন দেখতে পারে না। কবি প্রেমের কবিতা লিখতে পারেন না। শালিক দম্পতি ঠোঁটে ঠোঁট মহাকাব্য লেখে না। বিগত আঠারো মাসে আমরা তার প্রমাণ দেখেছি। আমাদের মনস্তত্ত্ব ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। তারপরও বলবো, ব্যক্তির মনস্তত্ত্ব, প্রেম, স্বপ্ন, হতাশা, নারীর যাপিত জীবনের ক্লেদাক্ততা এসবের ভেতর থেকেই আমি সমাজ কাঠামো দেখাতে চাই এবং সভ্যতার ছদ্মবেশ টেনে ছিঁড়ে ফেলতে চাই।
জাগো নিউজ: ভাষার নান্দনিকতা ও বর্ণনার মধ্যে আপনি কীভাবে ভারসাম্য রাখেন?
নুসরাত সুলতানা: এই ভারসাম্য রক্ষায় সাহিত্যের ইশারা বা ইঙ্গিত খুব ফলপ্রসূ টোটকা। চরিত্রের মনস্তত্ত্ব এবং লেখকের ব্যক্তিগত জীবন দর্শনও বেশ কাজ দেয় এই ক্ষেত্রে।
জাগো নিউজ: কোন লেখক বা বই আপনাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে?
নুসরাত সুলতানা: তোরো-চৌদ্দ বছর বয়স থেকেই সিরিয়াস সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক ছিল। যে কোনো একজন লেখক বা একটা বইয়ের কথা বলা কঠিন। তবে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শহীদুল্লাহ কায়সার, আলাউদ্দিন আল আজাদ, বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর, মানিক বন্দোপাধ্যায়, বেগম রোকেয়া, নীলিমা ইব্রাহিম, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শহিদুল জহির, কমল কুমার মজুমদার, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসসহ বহু লেখককে পড়েছি। এখনো পড়ি। এ তো গেল বাংলা সাহিত্য। বিশ্ব সাহিত্যের কয়েকজন লেখক খুব প্রিয়—দস্তয়েভস্কি, ম্যাক্সিম গোর্কি, পার্ল এস বাক, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, মাসুদ নাইয়ার, এলিস মুনরো, চিনুয়া আচেবে এবং হারুকি মুরাকামির বেশ কিছু কাজ আমি পড়েছি এবং খুঁজে খুঁজে পড়ি।
জাগো নিউজ: সমসাময়িক সাহিত্য সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কী?
নুসরাত সুলতানা: সময় এবং জীবন প্রবাহমান নদী। সাহিত্য সময় এবং জীবনেরই নিবিড় এবং নিবিষ্ট চিত্রকল্প। এই সময়ে অনেকেই ভালো লিখছেন। কিন্তু পড়ার আগ্রহ এবং ধৈর্য এবং একনিষ্ঠ পাঠক হওয়ার চেষ্টা আমাদের সবারই করা দরকার মনে হয়। আর শব্দচয়নে আমাদের আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন মনে করি। অর্থাৎ আমি সৈয়দ শামসুল হকের সেই কথাতেই আস্থা রাখি—স্বাভাবিক চলন-বলনের ভাষা আর সাহিত্যের ভাষা অবশ্যই বেশ কিছুটা আলাদা।
জাগো নিউজ: পাঠকের প্রতিক্রিয়া আপনার লেখাকে কতটা প্রভাবিত করে?
নুসরাত সুলতানা: পাঠকের পছন্দ মাফিক লেখা লিখতে পারেন কেবল বই বিক্রি করে খাওয়া মুনাফাখোর লেখকরা। প্রকৃত বা সিরিয়াস সাহিত্যিক মহাকালের বুকে লিখে যান—মানুষের কাম-ঘাম এবং শ্রমণের চিত্রকল্প। তবে একথা অবশ্যই সত্য—পাঠক যখন গ্রহণ করেন; তখন লেখক সৃষ্টির সার্থকতা খুঁজে পান। পাঠকের মননই তো লেখকের তীর্থস্থল।
জাগো নিউজ: বর্তমানে প্রকাশনা জগতে নতুন লেখকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন?
নুসরাত সুলতানা: চ্যালেঞ্জ অবশ্যই আছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—নিজের লেখাটি ভালো করে লেখা। লেখাটি অন্যের পড়ার উপযোগী করে লেখা। একটা ভালো লেখা নিজেই নিজের অ্যাম্বাসেডর। নতুনদের ভেতর অনেকেই খুব দ্রুত লেখক খ্যাতি চান। আসলে লেখক হওয়ার কোনো শর্টকাট রাস্তা নেই। ভেতরের মানুষটি লেখক হয়ে উঠলে, বাইরে তার প্রতিফলন ঘটবেই। পূর্ণ চাঁদ উঠলে ধরা জোছনা প্লাবিত হবেই। তারপরও বলবো দায়িত্বশীল প্রকাশকদের নতুনদের প্রতি আরও উদার হওয়া প্রয়োজন।
জাগো নিউজ: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম লেখালেখির জগৎকে কীভাবে বদলে দিয়েছে বলে মনে হয়?
নুসরাত সুলতানা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রজন্মের পাঠাভ্যাস নষ্ট করছে। তবে লেখক-কবিদের সাহিত্য সম্পাদকের প্রতি নির্ভরশীলতা অনেক কমিয়েছে। অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাহিত্যচর্চা করছেন। এটি একটা ইতিবাচক দিক। তবে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডুবে যাওয়া মারাত্মক ক্ষতিকর। পড়ার অভ্যাস যেন নষ্ট হয়ে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে ভালোভাবে।
জাগো নিউজ: সম্প্রতি কী নিয়ে কাজ করছেন?
নুসরাত সুলতানা: উপন্যাস লিখছি। গল্প লিখলাম তিনটি। নজরুলের গল্প নিয়ে প্রবন্ধ লিখলাম। কবিতা লিখছি যখন মাথায় আসছে। আসলে জীবন যেমন প্রবাহমান, লেখাও তেমন স্রোতস্বিনী নদীর মতোই প্রবাহমান।
জাগো নিউজ: বর্তমান সমাজে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
নুসরাত সুলতানা: নারীর কর্মপরিধি এখন ব্যাপক। নিরাপত্তা শুধু শারীরিক নয়, মানসিক, সামাজিক ও ডিজিটাল নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নারীবান্ধব সমাজ বা প্রতিষ্ঠান সেই অর্থে এখনো তৈরি হয়নি। তবে নারীর নিজের ঘরে সবার আগে ভালো থাকা, নিরাপদ থাকা দরকার। রাস্তায় যতটা নারী শারিরীক-মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়; তারচেয়ে ঘরে আরও বেশি হয়। পুরুষদেরই সবার আগে নারীর অধিকার, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সোচ্চার হতে হবে।
জাগো নিউজ: লেখক হওয়ায় নিরাপত্তা-বিষয়ক কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন কি?
নুসরাত সুলতানা: সেরকম অভিজ্ঞতা হয়নি বলা চলে। তবে এ দেশে কিছু কবি-লেখক আছেন। যারা মনে করেন, যে মেয়ে লিখতে এসেছে; তার সাথে প্রেম করা খুব সহজ। ইনবক্সে কয়েকদিন শুভ সকাল লিখে এবং খেয়েছেন? ঘুম থেকে কখন উঠলেন? এসব প্রশ্ন করেই বিরাট প্রেমিক হয়ে যেতে চান তারা। রাত একটায় কেমন আছেন জিজ্ঞেস করা, যখন-তখন ইনবক্সে খাজুরে আলাপ—এসব বাজে বিড়ম্বনা প্রচুর সয়েছি। নারীকে কৌশলী হয়ে নিজের কাজে নিবিষ্ট হতে হবে। কারো উটকো আলাপে কান না দিলেই হলো।
জাগো নিউজ: নারীর চলাচল, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা—সাহিত্যে এসবের যথেষ্ট প্রতিফলন ঘটছে বলে মনে করেন?
নুসরাত সুলতানা: বেগম রোকেয়া লিখেছেন অবরোধ বাসিনী, মতিচূর, সুলতানার স্বপ্নসহ আরও অনেক লেখা। নীলিমা ইব্রাহিম লিখেছেন বিশ শতকের মেয়ে, আমি বীরাঙ্গনা বলছি, নাসরীন জাহান লিখেছেন উড়ুক্কু। পাপড়ি রহমান লিখেছেন আমার একলা পথের সারথী। এ ছাড়াও সমকালীন নারীরা লিখছেন। আমার তিনটি গল্প আছে অদ্ভুত গোলাপ বাগান, নাচের শহর রূপেশ্বরী, জুবুথুবু খরগোশ ছানা। তারপরও বলবো, নারীর কলম থেকেই নারীর সমস্যা, স্বপ্ন, সংগ্রাম সব উঠে আসতে হবে। পুরুষ লিখলে তা হবে কাল্পনিক। তাতে প্রকৃত চিত্রকল্প এবং গাঢ় বেদনার নির্যাস অনুপস্থিত থাকার সম্ভাবনা থাকে। সেটা কাম্য নয়।
জাগো নিউজ: একজন লেখক হিসেবে আগামী প্রজন্মের নারীদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
নুসরাত সুলতানা: সুশিক্ষিত হয়ে নিজেকে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী করা এবং জ্ঞানের নিরবচ্ছিন্ন সাধনা করা। বাহ্যিক ঝলমলে সৌন্দর্যের প্রতি মনোনিবেশ না করে নিজের শারীরিক সুস্থতা, মানসিক যত্ন এবং পড়াশোনা করে সত্যিকার অর্থেই নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে সচেষ্ট হওয়া। নিজেকে ভালোবাসার, সম্মান করার কোনো বিকল্প নেই।
এসইউ