ভিডিও ENG
  1. Home/
  2. মতামত

হামের কারণে চোখের ক্ষতি ও করণীয়

ডা. মো: আরমান হোসেন রনি | প্রকাশিত: ১০:১০ এএম, ০৬ এপ্রিল ২০২৬

হাম বা Measles (মিজলস) কেবল একটি সাধারণ জ্বর বা ত্বকের র্যাশ নয়; এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে সাময়িকভাবে দুর্বল করে দেয় এবং বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। হামের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাবগুলোর একটি হলো চোখের ক্ষতি। সঠিক সময়ে ব্যবস্থা না নিলে একজন মানুষ চিরতরে অন্ধ হয়ে যেতে পারেন।

হাম কীভাবে চোখের ক্ষতি করে?

হাম ভাইরাস সরাসরি চোখের টিস্যুকে আক্রমণ করতে পারে অথবা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিয়ে অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। প্রধানত তিনটি উপায়ে এটি চোখের ক্ষতি করে—

১. ভিটামিন-এ এর অভাব
হাম হলে শরীরে সঞ্চিত ভিটামিন-এ দ্রুত হ্রাস পায়। কর্নিয়ার সুস্থতার জন্য ভিটামিন-এ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর অভাবে কর্নিয়া শুকিয়ে গিয়ে অন্ধত্বের ঝুঁকি তৈরি হয়।

হামের কারণে অন্ধত্ব একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য ট্র্যাজেডি। সামান্য সচেতনতা, সময়মতো ভিটামিন-এ সেবন এবং টিকাদানের মাধ্যমে আমরা এই ভয়াবহ পরিণতি থেকে শিশুদের রক্ষা করতে পারি। হামের সময় চোখে অতিরিক্ত লালভাব, ব্যথা বা দৃষ্টিশক্তি কমে গেলে দেরি না করে চক্ষু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।

২. সরাসরি ভাইরাল আক্রমণ
হামের ভাইরাস চোখের কর্নিয়া ও কনজাংটিভায় প্রদাহ সৃষ্টি করে, ফলে চোখ লাল হয়ে যায় এবং দৃষ্টিশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

৩. সেকেন্ডারি ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় চোখ সহজেই ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণের শিকার হয়, যা গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে।

হামের ফলে চোখের সম্ভাব্য জটিলতা

১. কনজাংটিভাইটিস (চোখ ওঠা)
হামের শুরুতেই অধিকাংশ রোগীর চোখ লাল হয়ে যায়, পানি পড়ে এবং আলোতে তাকাতে কষ্ট হয়।

২. কর্নিয়াল আলসার
চোখের সঠিক যত্ন না নিলে কর্নিয়ায় ঘা হতে পারে, যা মারাত্মক ব্যথা সৃষ্টি করে এবং চিকিৎসা না করলে কর্নিয়া ছিদ্র হতে পারে।

৩. জেরোপথালমিয়া
ভিটামিন-এ এর ঘাটতিজনিত চোখ শুকিয়ে যাওয়ার অবস্থা, যা প্রথমে রাতকানা এবং পরে কর্নিয়া গলিয়ে (কেরাটোম্যালাসিয়া) স্থায়ী অন্ধত্ব ঘটাতে পারে।

৪. অন্ধত্ব
কর্নিয়ায় স্থায়ী দাগ পড়ে গেলে দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে বা সম্পূর্ণ হারিয়ে যেতে পারে।

হাম হলে চোখের সুরক্ষায় করণীয়

ক) ভিটামিন-এ ক্যাপসুল (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ)
হাম শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উচ্চমাত্রার ভিটামিন-এ দিতে হবে। World Health Organization-এর নির্দেশনা অনুযায়ী, আক্রান্ত শিশুদের দুই দিনে দুটি ডোজ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

খ) চোখ পরিষ্কার রাখা
• পরিষ্কার তুলা বা নরম কাপড় কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে চোখ পরিষ্কার করতে হবে
• একই কাপড় দিয়ে বারবার দুই চোখ মোছা যাবে না

গ) পুষ্টিকর খাবার
বুকের দুধ, ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার (গাজর, মিষ্টি কুমড়া, ছোট মাছ, শাকসবজি) এবং পর্যাপ্ত তরল খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে।

ঘ) আলোর তীব্রতা কমানো
রোগীকে মৃদু আলোযুক্ত ঘরে রাখতে হবে, যাতে চোখের ওপর চাপ কম পড়ে।

ঙ) চিকিৎসকের পরামর্শে আই ড্রপ
সংক্রমণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক ড্রপ ব্যবহার করতে হবে। নিজে থেকে স্টেরয়েড ড্রপ ব্যবহার করা বিপজ্জনক।

যা করা যাবে না (সতর্কতা)

• চোখ রগড়ানো যাবে না
• অপরিষ্কার হাতে চোখ স্পর্শ করা যাবে না
• চোখে গোলাপ জল, দুধ, মধু বা গাছের রস ব্যবহার করা যাবে না

প্রতিরোধই শ্রেষ্ঠ উপায়: এমআর টিকা

হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। শিশুদের ৯ মাসে প্রথম এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ MR vaccine দেওয়া উচিত। এই টিকা হামের ঝুঁকি প্রায় ৯৫% পর্যন্ত কমিয়ে দেয়।

শেষ কথা

হামের কারণে অন্ধত্ব একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য ট্র্যাজেডি। সামান্য সচেতনতা, সময়মতো ভিটামিন-এ সেবন এবং টিকাদানের মাধ্যমে আমরা এই ভয়াবহ পরিণতি থেকে শিশুদের রক্ষা করতে পারি। হামের সময় চোখে অতিরিক্ত লালভাব, ব্যথা বা দৃষ্টিশক্তি কমে গেলে দেরি না করে চক্ষু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।

লেখক : কনসালটেন্ট (চক্ষু) দীন মোহাম্মদ আই হসপিটাল, সোবাহানবাগ, ঢাকা।

এইচআর/এএসএম

আরও পড়ুন