নীলফামারীর ডালিয়া ভ্রমণ: প্রথম পর্ব
মাসুদ চয়ন
ডালিয়ার মাটি, মানুষ ও প্রকৃতির গল্প অন্যরকম—একক বিশেষণে বিশেষায়িত করার মতো নয়। আমি যখন নাবিল বাস থেকে ডালিয়া ব্রিজে নামলাম—নেমেই ডালিয়ার নরম, স্নিগ্ধ গন্ধ নিতে শুরু করলাম। খুব ধীরে শ্বাস নিচ্ছিলাম। ফুসফুসের অক্সিজেন লেভেল হঠাৎ করে শান্তিপূর্ণ শীতলতা নিয়ে এসেছিল।
তারপর বালির আস্তরণে চুমু খেয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার হাড়কাঁপানো শীত বেশ থমকে দিচ্ছিল। ভোর ৫টা ৩০ মিনিট তখন। সুবহে সাদিকের পাখিরা আমাকে সাদর সম্ভাষণ জানাতে ছুটে এলো।
ডালিয়া ব্রিজে খননের কাজ চলছে—পানি নেই। একদম শুকনো তেপান্তর যেন। এই ভোরবেলায় দেওয়াল টপকে ডালিয়া কলোনিতে প্রবেশ করলাম। ডালিয়া শিশু নিকেতন—আমার শৈশবের বিদ্যাপীঠ। ফেলে আসা স্মৃতিগুলো আলোক-উজ্জ্বল আভা হয়ে ফিরে এলো।
ডালিয়া কলোনির প্রকৃতি হয়তো আগের মতো সুন্দর নেই। লোকসমাগম হয় না আর। আবাসিক ফ্ল্যাটগুলোও বসবাসের উপযোগিতা হারিয়ে ফেলছে—মানুষ বসবাস না করলে যা হয় আর কী। ৩০ মিনিট ঘুরে যখন বেরিয়ে এলাম, অজান্তে কোনো এক আবেগী ঢেউ এসে প্রবলভাবে কাঁপিয়ে দিলো। প্রাণের ডালিয়া কলোনির এমন পরিণতি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। খাঁ খাঁ বিরান বনভূমি যেন—ইতিহাসের যুদ্ধবিধ্বস্ত, পরিত্যক্ত লোকেশন।
ডালিয়া ২ নম্বর বাজারের পর ১ নম্বর বাজার। শৈশবের বন্ধু রাসেল কাজির বিজনেস সেন্টারের সামনে এসে দাঁড়ালাম—বন্ধ। প্রবল শৈত্যপ্রবাহ। এত সকাল সকাল লোকসমাগম একদমই ছিল না। হেঁটেই এখানে-ওখানে যাচ্ছিলাম।
ডালিয়া ১ নম্বর বাজারে প্রথম উত্তরবঙ্গীয় চা ও পানি পান। তারপর ডাল-রুটি। চা প্রতি কাপ ৫ টাকা। ডাল ১০ টাকা। ১টা রুটি ৫ টাকা। ২০ টাকায় খুব আয়েশি নাশতা হয়ে গেল। ঢাকার মতো পিচ্চি পাতলা রুটি নয়—বেশ স্বাস্থ্যসম্মত।
মানুষজন আমার দিকে থ হয়ে চেয়ে থাকছিল। মজা করে বলেছিলাম—আমি গুরুত্বপূর্ণ কেউ নই হে, আপনাদেরই সাদামাটা সাধারণ সন্তান। কবি তো—ঘোরাঘুরিটা পায়ে হেঁটেই করি।
এক মুরুব্বি চাচা বলে উঠলেন—‘তো বউ কোটে বাউ!’
‘বউ নেই তো! কবিতার সাথেই সংসার চলছে—’
আরও পড়ুন
নয়নাভিরাম চন্দ্রনাথ পাহাড়
যে কারণে নদী ভ্রমণে ছুটছেন পর্যটকেরা
ভোর সাড়ে ৬টা। ঝিরিঝিরি শব্দ। শৈত্য ঝরছে—সাথে বাতাসের মৃদু প্রবাহ। উদ্দেশ্য ডালিয়া তিস্তা ব্যারেজ—১ নং বাজার থেকে ১৫ মিনিটের পায়ে হাঁটা দূরত্ব। পথেই সীমান্ত বাজার—তিস্তা ব্যারেজের হাতছোঁয়া দূরত্বে। মাদ্রাসা থেকে শিশুরা বাড়িতে ফিরে আসছে। কনকনে শীতের সকালেও অদ্ভুত তারুণ্য—হাসি, উদ্যম। ওদের দেখে শারীরিক শীতের তীব্রতা উৎসাহ পেল ওমের জন্য—কিছুটা ওম এলো। সীমান্তের তথ্য দরকার—সেই তাগিদে সীমান্তের এত কাছে চলে আসা।
রেস্ট হাউজের দারোয়ান চাচা খুব বিনয়ী মানুষ—বিনা খরচেই আমাকে ফ্রেশ হওয়ার সুযোগ করে দিলেন। তিস্তার পাড় ঘেঁষে বিস্তীর্ণ রেস্ট হাউজটি সবুজ প্রকৃতিতে আচ্ছন্ন—চারপাশে বনভূমির মতো অবারিত বিস্ময়। তাকিয়ে থাকায় অগাধ প্রশান্তি। আমার ডাস্ট অ্যালার্জির সমস্যা কিছুটা—কিন্তু এমন স্নিগ্ধ পরিবেশে একবারের জন্য ফিল হচ্ছিল না। ডালিয়ার বাতাসে সতেজ অক্সিজেন আর সুনসান নীরবতাই অনুরণিত হচ্ছিল।
রেস্ট হাউজে ১০ মিনিট অবস্থান করে দারোয়ান চাচার হাতে ১০০ টাকা ধরিয়ে দিয়ে বের হয়ে এসেছিলাম সেই মুগ্ধকর পিচঢালা পথে। নিতে চাচ্ছিলেন না—হাতে মুঠো করে দিয়ে বলেছিলাম, ‘সকালের চা-নাস্তাটা করে নেবেন। আমি আপনার ছেলের মতো।’
তারপর নিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘যা বাবা, দোয়া করোং (করি) তোর জন্য।’ অহমিকাহীন মাটির মানুষ এরা। ডালিয়ার পথে-ঘাটে কত সহস্র স্মৃতি—কথা বললেই মন ভালো হয়। ঢাকার যান্ত্রিক জীবনের সাথে বিস্তর ফারাকটা খুব করে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তিস্তা ব্রিজে উঠেই শীতের তীব্রতা আরও দৃঢ়ভাবে জেঁকে বসলো। তাপমাত্রা ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে মনে হচ্ছিল—আসলে ততটা নয়। গুগলে চেক করে দেখেছিলাম ১০ ডিগ্রি। কিন্তু ফিল লাইক ৩-৪ ডিগ্রি। মৃদু বাতাস, শৈত্যপ্রবাহ, তিস্তা নদীর শ্রান্ত প্রবাহের কারণে এমন অনুভূত হয়েছিল। নদীতে পানি খুব কম। চারদিকে শুধুই চরাঞ্চল—বসতি নেই—বহুদূর বিস্তৃত শূন্যতা শুধু।
তিস্তা বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ সেচপ্রকল্প—উত্তরবঙ্গের কৃষিজমির প্রাণ। প্রয়োজনীয় পানির সংকট নিরসনে অদ্বিতীয় অবিকল্পের মতো। ৫২ গেটবিশিষ্ট ব্যারেজটি শুকনো মৌসুমে পানি ধরে রেখে জল সমস্যা নিরসনে পরিপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে বর্ষায় বিপদ নামে পাহাড় সমান—ভারত থেকে বয়ে আসা প্রবল স্রোতের তাণ্ডবে প্রবল ভাঙনের সম্মুখীন হতে হয় তিস্তাবাসীকে। পানির স্রোতের তীব্রতা এত বেশি থাকে যে, রুখে দেওয়া অসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। এ জন্য ঋতুভেদে তিস্তার প্রকৃতিও আলাদা—শীত ও বর্ষায় তিস্তার রূপ সবচেয়ে শৈল্পিক।
নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের গেটের সামনে দায়িত্বরত আরেক চাচার সাথে দেখা। তিনি তিস্তা কলোনি থেকে ব্যারেজে এসে ডিউটি করেন—সেই ভোরবেলাই এসেছেন। অনেক তথ্য জেনেছিলাম তার কাছ থেকে। তিনি জানিয়েছেন, প্রকৃতির এই অপূর্ব নিসর্গ নিয়ে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন হয়নি তেমন। এরশাদ সরকার যতটুকু করে গেছেন; সেটুকুতেই সীমাবদ্ধ এখনো। নারীদের পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই—পরিবার নিয়ে এলে বিপদের সম্মুখীন হতে হয় নিয়মিতই।
অধিকাংশ বনভূমি পরিত্যক্ত ও নিরাপত্তাহীন অবস্থায় ফেলে রাখা হয়েছে। গ্রেট পর্যটন কেন্দ্র হয়ে ওঠার কথা যার, সে এখনো এরশাদ আমলের নির্মাণাধীন মনুমেন্ট হিসেবেই পড়ে আছে। সৌন্দর্যের তুলনা অসীম—কিন্তু নিরাপত্তা ও আধুনিক সুবিধায় অগাধ শূন্যতা। তিস্তা প্রজেক্ট কবে যে বাস্তবায়ন হবে! বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ সেচপ্রকল্প একদিন সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ সাপ্লাই কেন্দ্র হয়ে উঠুক—সেই কামনাই হৃদয়ে ধারণ করেছিলাম।
লেখক: কবি ও কথাশিল্পী।
এসইউ