নকশার ত্রুটি ও নিম্নমানের বিয়ারিং প্যাডেই মেট্রোরেলে দুর্ঘটনা

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:৩৩ পিএম, ০১ জানুয়ারি ২০২৬
মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড পড়ে একজনের মৃত্যুর ঘটনায় সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কমিটি/ছবি: সংগৃহীত

মেট্রোরেলের নকশার ত্রুটি ও নিম্নমানের বিয়ারিং প্যাডের কারণে সেটি খুলে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। কমিটি এ দুর্ঘটনার পেছনে নাশকতার কোনো প্রমাণ পায়নি বলেও জানিয়েছেন উপদেষ্টা।

সম্প্রতি মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে একজন নিহত হওয়ার ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা এ কথা জানান। এর আগে উপদেষ্টার কাছে তদন্ত প্রতিবেদন হস্তান্তর করেন কমিটির সদস্যরা।

উপদেষ্টা বলেন, প্রাথমিক অনুসন্ধানে বিচ্যুত বিয়ারিং প্যাডের হার্ডনেস, কম্প্রেশন সেট ও নিওপ্রিন কন্টেন্ট প্রচলিত স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী সঠিক ছিল না বলে কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়। তবে বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য দেশের বাইরের ল্যাবরেটরিতে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন।

এছাড়া বিয়ারিং প্যাড কিছুটা ঢালু অবস্থায় (০.৮% স্লোপ) সন্নিবেশিত করা হয়েছে। বিয়ারিং প্যাড বিচ্যুতির ক্ষেত্রে এর কিছুটা প্রভাব রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ফার্মগেট মেট্রোরেল স্টেশনটির উভয় প্রান্তে বৃত্তাকার এলাইনমেন্ট অবস্থিত জানিয়ে উপদেষ্টা বলেন, প্রতীয়মান হয় যে, ভায়াডাক্টের অ্যালাইনমেন্টের সোজা অংশ ও বৃত্তাকার অংশের মধ্যে কোনো ধরনের ট্রানজিশন কার্ড ব্যবহার করা হয়নি। কমিটির অনুসন্ধানে মেট্রোরেলের এই অ্যালাইনমেন্টের নকশায় ত্রুটি থাকতে পারে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। কার্ড এলাইনমেন্টের জন্য পৃথকভাবে মডেলিং ও অ্যানালাইসিস করা হয়নি। সোজা এলাইনমেন্টের মডেলিং ও এনালাইসিস দিয়েই কার্ড এলাইনমেন্টের জন্য নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে।

মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান আরও বলেন, কমিটি ট্রেন চলাকালীন পরিচালিত কম্পন পরিমাপে বিচ্যুত বিয়ারিং প্যাড সংশ্লিষ্ট পিয়ারসমূহে (পিয়ার নং-৪৩০ ও পিয়ার নং-৪৩৩) অন্যান্য পিয়ারের তুলনায় কম্পন অনেক বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। কার্ড অ্যালাইনমেন্টে নকশায় সম্ভাব্য ত্রুটির কারণে এ অংশে অযাচিত পার্শ্ববল এবং সংশ্লিষ্ট কম্পনের উদ্ভব হচ্ছে, যার সঙ্গে বিয়ারিং প্যাডের বিচ্যুতির সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, অনুসন্ধানে দেখা যায়, কার্ড এলাইনমেন্ট এবং নিকটস্থ স্টেশনে রেলট্র্যাকের নিচে নিওপ্রিন রাবার ম্যাস-স্প্রিং ড্যাম্পার সিস্টেম ব্যবহার করা হলেও মধ্যবর্তী দুর্ঘটনার স্থান সংশ্লিষ্ট ট্রাকের জায়গায় রিজিড ট্র্যাক রাখা হয়েছে। ধারণা করা হয় যে, এসব জায়গায় ম্যাস-স্প্রিং ড্যাম্পার সিস্টেম ব্যবহার করা হলে ভাইব্রেশন কমানো সম্ভব হতো। তবে কমিটি ঘটনার সঙ্গে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের কোনো যোগসাজশ পায়নি।

কমিটির সুপারিশগুলো তুলে ধরে ফাওজুল কবির খান বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য কার্ড এলাইনমেন্টের সংশ্লিষ্ট স্থানে বিয়ারিং প্যাড যাতে সরে যেতে না পারে সেজন্য যথাযথ কারিগরি ব্যবস্থা জরুরি ভিত্তিতে সন্নিবেশিত করতে হবে। যার কার্যক্রম ডিএমটিসিএল কর্তৃক বাস্তবায়িত হচ্ছে।

বিয়ারিং প্যাড সরে যাওয়ার কারণ সুনিশ্চিতভাবে নির্ণয়ের জন্য থার্ড পার্টি ইন্ডিপেডেন্ট কনসালট্যান্ট দিয়ে বিস্তারিত অ্যানালাইসিসের মাধ্যমে ভায়াডাক্টের স্ট্রাকচারাল ডিজাইন ও ট্র্যাক ডিজাইনের গভীর পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। মেট্রোরেলের সার্বিক প্রজেক্ট ডিজাইনের ওপর একটি থার্ড পার্টি সেফটি অডিট পরিচালনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য অতি দ্রুত একটি কার্যকর ও যথাযথ স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং সিস্টেম স্থাপন করতে হবে। সর্বোপরি, মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিদেশি পরামর্শকের কাছ থেকে স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের কাছে টেকনোলজি ট্রান্সফার নিশ্চিতে জোর প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে।

আরও পড়ুন
ফার্মগেটে মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড পড়ে পথচারীর মৃত্যু

সড়ক পরিবহন উপদেষ্টা বলেন, রিপোর্টটা (প্রতিবেদন) আমরা ডিএমটিসিএলের পরিচালনা পর্ষদে দেব। তারা আলোচনা করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে। তদন্ত কমিটির পুরো রিপোর্টটি ডিএমটিসিএলের ওয়েবসাইটে দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

মেট্রোরেল পরিচালনাকারী ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) চেয়ারম্যান এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, আমরা এই প্রতিবেদনটি বোর্ড সভায় উপস্থাপন করব। সেখানে আমাদের কয়েকজন কারিগরি সদস্য রয়েছেন, তারা দেখবেন। যখন এ ঘটনার পেছনে দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করার বিষয়টি আসবে, সেক্ষেত্রে যদি কাউকে দোষী পাওয়া যায় আমরা সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেব।

কমিটির সদস্য বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. খান মাহমুদ আমানত সাংবাদিকদের বলেন, কারিগরি দিক থেকে মেট্রোরেল অত্যন্ত জটিল একটি প্রকল্প। এটি আমাদের দেশে প্রথম হয়েছে। বিয়ারিং প্যাড পড়ে যাওয়াও একটি বিরল ঘটনা। গত ৫০ থেকে ১০০ বছরের মধ্যে হয়তো এরকম ৪/৫টি ঘটনা আছে।

তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা তদন্তের ক্ষেত্রে সময় এবং উপায় লাগবে। সেটি এই কমিটির ছিল না। আমাদের কাছে যেসব তথ্য-উপাত্ত, ডিজাইন-ডকুমেন্ট সরবরাহ করা হয়েছিল তা থেকে আমরা কয়েকটি পটেনশিয়াল ক্ষেত্র বের করেছি, যেটা থেকে মনে হয়েছে ডিজাইনটা ত্রুটিপূর্ণ। ওই সমস্ত ত্রুটির কারণে অতিরিক্ত কম্পনের সৃষ্টি হয়েছে এবং সেখান থেকে সম্ভবত বিয়ারিংটি পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

অধ্যাপক ড. খান মাহমুদ আমানত বলেন, পুরো প্রকল্পটি অ্যানালাইসিস করে দেখার জন্য আমাদের একটা সুপারিশ আছে। নকশার কোথায় কোথায় খুঁত থাকতে পারে সেটারও সম্ভব্য ক্ষেত্রগুলো আমরা বলে দিয়েছি। যারা ডিজাইনটা ভুল করেছে এটা তাদের দায়।

তিনি আরও বলেন, মেট্রোরেল যেভাবে অপারেশন হচ্ছে, সেভাবে হতে পারে। এ বিষয়ে আমরা কোনো নিষেধাজ্ঞা দেইনি। আমরা কোনো পরামর্শ দেইনি যে, মেট্রোরেল বন্ধ করে দিতে হবে। মেট্রোরেলের চলাচল স্বাভাবিকভাবে চলবে, তবে বিয়ারিং প্যাডগুলো নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।

ল্যাবে পরীক্ষা করে দুটি বিয়ারিং প্যাড নিম্নমানের পাওয়া গেছে। তবে এর ভিত্তিতে মেট্রোরেলের অন্যান্য বিয়ারিং প্যাডগুলো ত্রুটিপূর্ণ—এটি বলা সম্ভব নয় বলেও জানিয়েছেন কমিটির সদস্যরা।

কমিটির প্রধান ও সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, বিয়ারিং প্যাড সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে, তাদের প্যাডগুলো মানসম্মত ছিল। তাই তৃতীয় কোনো পক্ষের মাধ্যমে অন্যান্য বিয়ারিং প্যাডগুলো পরীক্ষা করা যেতে পারে। কাউকে শাস্তি দিতে হলে তো সত্যটা আগে বের করতে হবে। এছাড়া শাস্তির বিষয়টি চুক্তির মধ্যেই উল্লেখ থাকে। এ বিষয়গুলো বোর্ডে আলোচনা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিটির প্রধান ছাড়াও সদস্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক ড. এ বি এম তৌফিক হাসান, এমআইএসটির সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জাহিদুল ইসলাম, বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিযারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. খান মাহমুদ আমানত উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ২৬ অক্টোবর দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে ফার্মগেটে মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড পড়ে আবুল কালাম নামের একজন পথচারী নিহত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নিহত ওই ব্যক্তি ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। মেট্রোরেল চলার সময় হঠাৎ একটি বিয়ারিং প্যাড ওপর থেকে ওই ব্যক্তির মাথায় পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার দিনই সেতু বিভাগের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

আরএমএম/এমএমকে/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।