বাড়ি ভাড়া

উত্তর সিটির নির্দেশিকায় বাড়ি মালিকের লাভ, ক্ষতি ভাড়াটিয়াদের!

মুসা আহমেদ
মুসা আহমেদ মুসা আহমেদ
প্রকাশিত: ১২:০১ পিএম, ২২ জানুয়ারি ২০২৬
ঢাকায় ভাড়াটিয়াদের অনেক ক্ষেত্রে আয়ের ৫০-৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়ায় ব্যয় করতে হচ্ছে/সংগৃহীত ছবি

ভাড়াটিয়াদের অধিকার নিশ্চিত করতে ঢাকা শহরে বাড়িভাড়া সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। অথচ এ নির্দেশিকা বাস্তবায়ন হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন খোদ বাড়ি মালিকরা। আর ঘুরেফিরে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন ভাড়াটিয়ারাই।

বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯১ অনুযায়ী তৈরি ডিএনসিসির নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, দুই বছরের আগে কোনো অবস্থাতেই বাড়িভাড়া বাড়ানো যাবে না। আর এ মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণ করা ও ভাড়ার বার্ষিক পরিমাণ সংশ্লিষ্ট বাড়ির বাজারমূল্যের শতকরা ১৫ ভাগের বেশি হবে না।

অর্থাৎ, একজন বাড়ি বা ফ্ল্যাটের মালিক দুই বছর পরপর তার বাড়ির বাজারমূল্যের হিসাব করবেন। তারপর ওই বাড়ি বা ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য ধরে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ ভাড়া বাড়াতে পারবেন। বিষয়টি আরও সহজ করে বললে, একটি ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য এক কোটি টাকা হলে, বছরে ওই ফ্ল্যাটের ভাড়া ১৫ লাখ টাকা হবে। এর মধ্যে প্রতি মাসের ভাড়া হবে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। আবার দুই বছর পর যদি বাড়ি বা ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য বাড়ে, তখন ক্রমান্বয়ে ভাড়াও বাড়তে থাকবে।

এ বিষয়ে মানবাধিকারকর্মী ও পরিবেশবাদী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জাগো নিউজক বলেন, বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯১ অনুযায়ী সিটি করপোরেশন যে নির্দেশিকা প্রচার করছে, সেটি অকার্যকর। এ আইন নিয়ে আমাদের প্রশ্ন আছে। এ আইন বর্তমান প্রেক্ষাপটে চলবে না। এটি বাতিলের জন্য আমরা রিট করেছি। বিচারক মারা যাওয়ায় আবার শুনানি হচ্ছে। সুতরাং যে আইন চলবে না, সেটার রেফারেন্সে তো নির্দেশিকা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে করি না।

নগরের ভাড়াটিয়াদের অভিযোগ, উত্তর সিটির ওই নির্দেশিকা বাস্তবে ভাড়াটিয়াদের জন্য নতুন আশঙ্কা তৈরি করছে। এখন এ নির্দেশিকার ব্যাখ্যা নিজেদের মতো করে প্রয়োগ করবেন বাড়ি মালিকেরা। এতে বাড়ি ভাড়া যে আরও বাড়বে, সেই আশঙ্কাও অমূলক নয়। অথচ বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণে বছরের পর বছর দাবি জানিয়েছে আসছেন নগরবাসী।

এখন ঢাকা শহরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের বসবাস। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ মিলিয়ে মোট বাড়ির সংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ। ফলে শহরের একটি বড় অংশই ভাড়াটিয়া। গ্রাম থেকে শহরমুখী অভিবাসন, ব্যক্তিগত অভিবাসন এবং প্রশাসনিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় নগরীর ওপর চাপ বাড়ছে—ডিএনসিসির তথ্য

তবে ডিএনসিসি সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ রয়েছে। তবে বাস্তবায়নজনিত জটিলতা ও অস্পষ্টতা থাকায় ওই আইন বাস্তবায়নি হয়নি। আর ওই আইনের ১৩ ধারায় বাড়ির বাজারমূল্যের সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ ভাড়া বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। সিটি করপোরেশন সেই ধারাটি নির্দেশনায় তুলে ধরেছে।

তারা বলেছেন, এই আইন অনুযায়ী যদি বাড়ি মালিকরা ভাড়া চান, তাহলে বছরের পর বছর ভাড়াটিয়া পাবেন না। তাই ভবন বা ফ্ল্যাটের বাজারমূল্যের ৫-৭ শতাংশের মধ্যেই ভাড়া নির্ধারণ করবেন মালিক ও ভাড়াটিয়া। সেটা বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়া দুপক্ষ আলোচনা করেই নির্ধারণ করবেন।

ডিএনসিসির রাজস্ব বিভাগ সূত্র জানায়, এখন ঢাকা শহরে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের বসবাস। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ মিলিয়ে মোট বাড়ির সংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ। ফলে শহরের একটি বড় অংশই ভাড়াটিয়া। গ্রাম থেকে শহরমুখী অভিবাসন, ব্যক্তিগত অভিবাসন এবং প্রশাসনিক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় নগরীর ওপর চাপ বাড়ছে। যার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে আবাসন খাতে।

দেশে বাড়িভাড়া আইন কখনো জোরালোভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। আইনের বিধিমালাই হয়নি এবং বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রক নিয়োগ করেনি সরকার। খুব অল্পসংখ্যক মানুষ এ আইনের অধীনে প্রতিকার পেতে আদালতে যান

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, একটি শহরে মানুষের আয়ের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ যদি আবাসনে ব্যয় হয়, তাহলে তা গ্রহণযোগ্য ধরা হয়। কিন্তু ঢাকায় অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে আয়ের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়ায় ব্যয় করতে হচ্ছে।

কী আছে নির্দেশিকায়
গত ২০ জানুয়ারি রাজধানী ঢাকার বাড়িভাড়ার চাপ কমাতে ঢাকঢোল পিটিয়ে ডিএনসিসি নতুন করে বাড়িভাড়া সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। ওই নির্দেশিকায় ১৬টি বিষয়ে বলা হয়েছে। এর মধ্যে ৮ নম্বর নির্দেশিকায় দুই বছরের আগে কোনো অবস্থাতেই বাড়িভাড়া বাড়ানো যাবে না। দুই বছর পর মানসম্মত বা দ্বিপক্ষীয় আলোচনা সাপেক্ষে ভাড়ার পরিবর্তন করা যাবে। আবার ১১ নম্বর নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণ করা ও ভাড়ার বার্ষিক পরিমাণ সংশ্লিষ্ট বাড়ির বাজারমূল্যের শতকরা ১৫ ভাগের বেশি হবে না।

আরও পড়ুন
ঢাকায় বাড়িভাড়া নির্ধারণ করে দেবে উত্তর সিটি: প্রশাসক এজাজ
ঢাকায় বছর ঘুরলেই বাড়ে বাসা ভাড়া
বছর ঘুরলেই বাড়তি বাড়িভাড়ার চাপ

রাজধানীর আফতাবনগরে প্রায় ১২ বর্গ ফুট আয়তনের একটি বাসায় ভাড়া থাকেন বেসরকারি একটি ব্যাংকের চাকুরে মহসিন আলী। তাকে মাসে ২৫ হাজার টাকা ভাড়া গুনতে হয়। এর বাইরে সার্ভিস চার্জ হিসেবে দিতে হয় আরও পাঁচ হাজার টাকা।

ডিএনসিসির নতুন নির্দেশনা জানতে পেরে জাগো নিউজে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান মহসিন আলী। বলেন, আমি যে ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকি, সেটির বাজারমূল্য প্রায় এক কোটি টাকা। এ হিসাবে ওই ফ্ল্যাটের ভাড়া মাসে এক লাখ ২৫ হাজার টাকা। আবার এটি যদি দুই বছর পরপর বাড়তে থাকে, তাহলে তো আর কিছু বলারই থাকে না। তাই এক কথায় বলা যায়, ডিএনসিসির নির্দেশিকা কাদের সুরক্ষা দেবে। আগামী দিনে নগরে নিম্নআয়ের মানুষের টিকে থাকা আরও চ্যালেঞ্জিং হবে।

সমস্যা যেখানে
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) ডিএনসিসির নগর ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে বাড়িভাড়ার বার্ষিক পরিমাণ ১৫ শতাংশ—নির্দেশিকার এ অংশটি পড়ার সময় উত্তর সিটির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ জানান, বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ধরেই তারা বিষয়টি নির্দেশিকায় রেখেছেন।

সংবাদ সম্মেলন শেষে ওই ১৫ শতাংশের বিষয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে প্রশাসক এজাজ বলেন, একেকটি বাড়ির ফিটিংস এবং লোকেশন, কোনো বাড়ির বারান্দা ছোট-বড়, সেই অনুযায়ী বাসার ভ্যালুয়েশন (মূল্য) আছে। সেই ভ্যালুয়েশন ধরে, সেটার ১৫ শতাংশ হিসাব করে সর্বোচ্চ ভাড়া নেওয়া যাবে।

তিনি আরও বলেন, সরকারি আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই সেটাই তারা নির্দেশিকায় রেখেছেন। তবে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়া দর-কষাকষি করে ভাড়া নির্ধারণ করতে পারেন।

বাড়িভাড়া আইন-১৯৯১-এর ১৫ নম্বর ধারায় নিয়ন্ত্রকের ক্ষমতা ও দায়িত্ব অংশে বলা আছে, নিয়ন্ত্রক, বাড়ির মালিক বা ভাড়াটিয়ার আবেদনের ভিত্তিতে কোনো বাড়ির মানসম্মত ভাড়া নির্ধারণ করবেন। এমনভাবে তা নির্ধারণ করবেন যেন ভাড়ার বার্ষিক পরিমাণ বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে স্থিরকৃত ওই বাড়ির বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের সমান হয়।

সমস্যা হলো, দেশে বাড়িভাড়া আইন কখনো জোরালোভাবে প্রয়োগ করা হয়নি। আইনের বিধিমালাই হয়নি এবং বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রক নিয়োগ করেনি সরকার। খুব অল্পসংখ্যক মানুষ এ আইনের অধীনে প্রতিকার পেতে আদালতে যান। ফলে বাড়িভাড়া নির্ধারণে মূল্যের ১৫ শতাংশের ধারাটি নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন ছিল।

২০ জানুয়ারি ওই নির্দেশিকা ডিএনসিসির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে শেয়ার দেয় কর্তৃপক্ষ। তখন ওই পোস্টের মন্তব্যে শহিদ জামান নামে একজন লেখেন, ‘বাড়িওয়ালার সুবিধা হলো, আগে তিন বছর পর ভাড়া বাড়াতো ৫০০ টাকা, এখন দুই বছর পর ভাড়া বাড়াবে ৩০০০ টাকা (২০ হাজার টাকা ভাড়ার ক্ষেত্রে)।’

সিটি করপোরেশন যে নির্দেশিকা দিয়েছেন, সে অনুযায়ী এখন একটি ফ্ল্যাটের ভাড়া যদি হয় ৩০ হাজার; আবার ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য ধরা হলে ভাড়া হবে এক লাখ। তাই এটিকে আইন বা নির্দেশিকা বলা যাবে না। বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনটিই একটি জংলি আইন—আইনজীবী মনজিল মোরসেদ

ওই পোস্টের নিচে মোহাম্মদ বদরুদ্দোজ্জা নামে আরেকজন লেখেন, ‘ভাড়া বৃদ্ধি ১৫% কোন যুক্তিতে? এলাকা ভিত্তি করে ৫% থেকে ১০% এর মধ্যে রাখা উচিত ছিল। ভাড়া বৃদ্ধির ব্যাপারটা আরেকবার চিন্তা করা উচিত।’

ডিএনসিসির ওই নির্দেশিকা তৈরি করেছেন সংস্থাটির প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মুহাম্মদ হাবিবুল আলম। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, এই নির্দেশিকা মানলে বাড়িতে ভাড়াটে পাবেন না মালিকেরা। তাই দুই-পক্ষকে আলোচনার মাধ্যমেই ভাড়া নির্ধারণ করতে হবে। তিনি বলেন, বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ওই ধারা সংশোধন করতে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেবে ডিএনসিসি।

বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে হাইকোর্টে রিট
বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও আইন কার্যকর করার দাবিতে ২০১০ সালে হাইকোর্টে একটি রিট করে মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ। ২০১৫ সালের ১ জুলাই রিটের রায় ঘোষণা করেন তৎকালীন বিচারপতি বজলুর রহমান ও বিচারপতি রুহুল কুদ্দুসের হাইকোর্ট বেঞ্চ। রায়ে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ ভাড়া নির্ধারণের জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে ছয় মাসের মধ্যে একটি ‘উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন’ কমিশন গঠন করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

গঠিত কমিশন যেসব সুপারিশ করবে, তা আইনি কাঠামোয় রূপ না পাওয়া পর্যন্ত বিদ্যমান ১৯৯১ সালের বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী প্রতিটি ওয়ার্ডে বিশেষ করে ঢাকায় বাড়িভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একজন করে নিয়ন্ত্রক নিয়োগের উদ্যোগ নিতে বলেন হাইকোর্ট।

তবে রায় ঘোষণা করা হলেও তা সইয়ের আগে বিচারপতি বজলুর রহমানের মৃত্যু হয়। পরে আরেক বেঞ্চে রিট শুনানির জন্য যায়। এর মধ্যে ২০১৯ সালে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৫ নম্বর ধারা (বাড়িভাড়া নির্ধারণ সংক্রান্ত) চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। সেটা আদালতে শুনানি পর্যায়ে রয়েছে।

জানতে চাইলে রিট আবেদনকারীর আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বুধবার (২১ জানুয়ারি) জাগো নিউজকে বলেন, সিটি করপোরেশন যে নির্দেশিকা দিয়েছেন, সে অনুযায়ী এখন একটি ফ্ল্যাটের ভাড়া যদি হয় ৩০ হাজার; আবার ফ্ল্যাটের বাজারমূল্য ধরা হলে ভাড়া হবে এক লাখ। তাই এটিকে আইন বা নির্দেশিকা বলা যাবে না। বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনটিই একটি জংলি আইন।

এমএমএ/এমকেআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।