ক্ষত সারিয়ে নির্বাচনি নিরাপত্তায় ঢাকার থানাগুলো কতটা প্রস্তুত
জুলাই আন্দোলনের সময় দেশজুড়ে আক্রান্ত হয় সাড়ে চারশটির মতো থানা ও ফাঁড়ি। হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয় এসব থানায়। লুট হয় অস্ত্র-গুলি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অধীনে থাকা ৫০ থানার অধিকাংশই আক্রান্ত হয়। সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বাহ্যিক ক্ষত সারিয়ে, মনোবল ফিরিয়ে থানাগুলো সেবা দিতে মোটামুটি প্রস্তুত বলে মনে করছেন দায়িত্বশীলরা।
কোটা সংস্কার আন্দোলন কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলন সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নিলে সহিংস হয়ে ওঠে। আন্দোলন দমাতে মারমুখী হয় পুলিশ। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। বিক্ষুব্ধ জনতা ক্ষোভে এর আগে-পরে থানায় হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে। আগুনে পুড়ে যায় অনেক থানা। বেশ কিছুদিন সব ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকেন পুলিশ সদস্যরা।
অভ্যুত্থান পরবর্তীসময়ে (৬ আগস্ট ২০২৪) বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত ইন্সপেক্টর থেকে অধস্তন কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশে সংস্কার দাবি জানিয়ে ‘গুলি চালাতে বাধ্য করে তাদের ভিলেন বানানো হয়েছে’ বলে জানানো হয়।
এতে বলা হয়, আপনারা জানেন সারাদেশে শত শত পুলিশ এরই মধ্যে শাহাদতবরণ করেছেন। আমরা বিশ্বাস করি এগুলো কোনো ছাত্রদের কাজ নয়। নিঃসন্দেহে কোনো দুষ্কৃতকারীর কাজ। দেশবাসী আমাদের অর্থাৎ পেশাগত বাহিনী পুলিশকে তাদের শত্রু মনে করে। আমরা পুলিশ জনগণের সেবক।
থানা-ফাঁড়ি, পুলিশি স্থাপনা ও পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা চেয়ে বলা হয়, গতকাল (৫ আগস্ট ২০২৪) ৪৫০টির বেশি থানা আক্রান্ত হয়েছে। এগুলো আপনাদেরই সম্পদ, দেশের সম্পদ। প্রতিটি পুলিশ সদস্যের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা কর্মবিরতি ঘোষণা করছি। আমরা বৈষম্যহীন পুলিশ বাহিনী চাই।

পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র সে সময় জানায়, জুলাই-আগস্টে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থানাসহ নানা স্থাপনায় ব্যাপক লুটপাট হয়। অস্ত্র-গুলি, মামলার নথিসহ কোটি কোটি টাকার মালামালের হদিস এখনো মেলেনি। সহিংস হামলায় ব্যাপক ক্ষতি হয় ১২০টি থানায়। এর মধ্যে ৫৮টি থানা পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ভাঙচুরের শিকার হয় ৬২টি থানা। ফাঁড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১১৪টি। ১ হাজার ৭৪টি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সব মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ শত কোটি টাকার বেশি।
রাজধানীতে অধিক ক্ষতিগ্রস্ত থানাগুলোর মধ্যে ছিল উত্তরা, বাড্ডা, ভাটারা, রামপুরা, খিলগাঁও, যাত্রাবাড়ী, বংশাল, পল্টন, মতিঝিল, মোহাম্মদপুর, আদাবর, দারুসসালাম, মিরপুর, পল্লবী, রূপনগর, খিলক্ষেত, শ্যামপুর, কদমতলী, কোতোয়ালি, লালবাগ, হাজারীবাগ, হাতিরঝিল, ধানমন্ডিসহ কয়েকটি থানা।
ডিএমপি সূত্র জানায়, অভ্যুত্থান-পরবর্তীসময়ে ডিএমপির এক হাজার ৮৯৮টি অস্ত্র খোয়া যায়। এর মধ্যে ৬৪১টি অস্ত্র এখনো হাতছাড়া। এখন পর্যন্ত এক হাজার ২৫৭টি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।
আরও পড়ুন
গুলি চালাতে বাধ্য করে আমাদের ভিলেন বানানো হয়েছে
ইউনিফর্ম-লোগো পরিবর্তন কাজে আসবে না যদি কার্যকলাপ পরিবর্তন না হয়
জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন থানায় চালানো হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে পুলিশের অবকাঠামো ও কার্যক্রম বড় ধরনের ধাক্কা খায়। একাধিক থানা ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, নষ্ট হয় গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, অস্ত্র ও যানবাহন। সেই ক্ষত কাটিয়ে ওঠার মধ্যেই সামনে এসেছে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিতে কতটা প্রস্তুত এসব থানা? যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রাজু জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা নির্বাচনে দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। কোনো ধরনের সংকট বা কোনো সমস্যা নেই।’

দারুসসালাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম জাকারিয়া বলেন, ‘আমাদের কোনো ধরনের সংকট নেই। আমরা সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত।’
আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউর রহমান বলেন, আমরা নির্বাচনে দায়িত্ব পালনে শতভাগ কাজ করে যাচ্ছি। এখন পর্যন্ত কোনো বাধা-বিপত্তি পাচ্ছি না। আমাদের যে রুটিনকাজ আছে সেগুলো করছি।’
নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের সংকট আছে কি না জানতে চাইলে বলেন, ‘কোনো ধরনের সংকট নেই। থানায় হামলার সময়ে যে অস্ত্রগুলো লুট হয়েছিল সেগুলো উদ্ধারের চেষ্টা করছি। কিছু উদ্ধারও হচ্ছে। নির্বাচনে নিরাপত্তা নিশ্চিতে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডিএমপিতে পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। শুধু থানা নয়, ২২টি বিভিন্ন পুলিশি স্থাপনা।’

আসন্ন নির্বাচনে ক্ষতিগ্রস্ত থানাগুলো নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোনো ধরনের সংকট আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পুলিশের তো গাড়ির সংকট আছেই। এখন নির্বাচন সামনে রেখে আমরা যদি বলি আমাদের এক হাজার গাড়ি দরকার, ৫০০ গাড়ি দিয়েছে আর বাকি ৫০০ তো রাতারাতি সম্ভব নয়। তাছাড়া থানাগুলোতে সব ধরনের সংস্কার ও অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন হয়েছে। লোকোবলও পর্যাপ্ত আছে। কোনো ঘাটতি নেই। ডিএমপিতে ৩৪ হাজার জনবল। দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি প্রস্তুত।’
আরও পড়ুন
ধ্বংসস্তূপ থানা, করা যাচ্ছে না জিডি-মামলা
পুলিশের অস্ত্র লুট নিরাপত্তার জন্য হুমকি, শিগগির অভিযান
নির্বাচনের তো আর বেশি দিন বাকি নেই। এখন পর্যন্ত আপনাদের সক্ষমতা কতটা জানতে চাইলে র্যাবের মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি (গ্রেড-১) একেএম শহিদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা মনে করি আমাদের যে জনবল, যে লজিস্টিক এটার সর্বোচ্চ ব্যবহার করে আমরা সর্বোত্তম ক্ষমতার মাধ্যমে এই দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবো।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের জনবল প্রায় ৯ হাজারের কাছাকাছি। এনিয়েই আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করবো। আমরা স্টাইকিং হিসেবে ব্যবহৃত হবো। ভোটকেন্দ্রে পুলিশ, আনসার থাকবে। মোবাইল ডিউটি হিসেবে বিজিবি, সেনাবাহিনীসহ স্টাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করবো।’
জানা যায়, আসন্ন নির্বাচন ঘিরে রাজধানীর প্রতিটি থানায় অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন, টহল জোরদার ও কুইক রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও ভোটকেন্দ্র চিহ্নিত করে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং নিয়মিত পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে ক্ষতিগ্রস্ত রাজধানীর থানাগুলো অভ্যুত্থানপরবর্তী ধকল সামলে নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রস্তুত।
কেআর/এএসএ/এমএফএ/এমএস