কৈশোরে পাকিস্তানে পাচার, বৃদ্ধা হয়ে দেশে ফিরছেন পাঁচ নারী
ভোলার লালমোহন উপজেলার মনোয়ারা খাতুন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে হারিয়ে যান তিনি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাননি স্বজনেরা। অবশেষে সেই মনোয়ারার খোঁজ মিলেছে। তবে তার বর্তমান অবস্থান দেশের কোনো অঞ্চলে নয়, তিনি থাকেন সুদূর পাকিস্তানে। বর্তমানে তিনি ৬৫ বছরের বৃদ্ধা। পাকিস্তানেই বিয়ে করে থিতু হয়েছিলেন তিনি। সেখানে তার পরিবারে আছে দুই ছেলে। আগামীকাল শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সেই মনোয়ারা দেশে ফিরছেন। দীর্ঘদিন পর মনোয়ারার ফেরার খবরে আনন্দের বন্যা বইছে বাংলাদেশে থাকা তার স্বজনদের মধ্যে।
শুধু মনোয়ারা নন, তার মতো আরও চার নারী শুক্রবার পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরছেন। তারা হলেন রাবেয়া বিবি, জায়েদা, হাজেরা ও আমেনা। তাদের গ্রামের বাড়ি বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায়। বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানে পাচার ও হারিয়ে যাওয়ার সময় তাদের বয়স ছিল ১২ থেকে ১৬ বছর। এখন তাদের প্রায় সবাই বয়োজ্যেষ্ঠ বা বৃদ্ধ। এ দীর্ঘ সময় তারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। যোগাযোগের কোনো মাধ্যম ছিল না। পাসপোর্ট না থাকাসহ নানা জটিলতায় দেশে ফিরতে পারেননি তারা। শুক্রবার ভোরে তারা ফ্লাইটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবেন। তাদের স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে যাবেন স্বজনরা।
ওই নারীদের বাংলাদেশে ফেরাতে সহযোগিতা করছে মানবাধিকার সংগঠন ‘খোঁজ’। সংগঠনটির সংশ্লিষ্টরা জানান, ১৯৭১ সালের আগে ও পরে ওই নারীরা পাকিস্তানে পাচার এবং হারিয়ে গিয়েছিলেন। পাকিস্তানের এক মানবাধিকার কর্মীর সহযোগিতায় তাদের খুঁজে বের করা হয়েছে। পাঁচ নারী হলেন মনোয়ারা খাতুন, রাবেয়া বিবি, জায়েদা, হাজেরা ও আমেনা।
মনোয়ারা খাতুনের ভাই মো. জামাল জাগো নিউজকে বলেন, যুদ্ধের আগে মনোয়ারা খাতুন হারিয়ে যান। কিন্তু কীভাবে হারিয়ে যান তা জানা নেই। অনেক খুঁজেও তাকে পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি মানবাধিকার সংগঠন ‘খোঁজ’র মাধ্যমে মনোয়ারা বেগমের একটি ভিডিও দেখে তার সন্ধান পান।
মো. জামাল আরও বলেন, মনোয়ারা পাকিস্তানে বিয়ে করেছে। তার দুই ছেলে আছে। এর মধ্যে এক ছেলে মো. হাবিব বাংলাদেশে বেড়াতে আসবেন। হাবিবের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়েছে। তারা বাংলা-উর্দু মিলিয়ে কথা বলেন। তাদের স্বাগত জানাতে পরিবারের লোকজন নিয়ে ভোরে শাহজালাল বিমানবন্দরে যাব।
রাবেয়া বিবির গ্রামের বাড়ি রংপুরের কোতোয়ালিতে। এখন তার বয়স প্রায় ৭০ বছর। তিনিও স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানে হারিয়ে যান। রাবেয়া বিবির নাতি আলমিন ইসলাম গগন বলেন, পরিবারের জ্যেষ্ঠদের থেকে শুনেছি, নানিকে চাকরি দেওয়ার কথা বলে যুদ্ধের আগে পাকিস্তান নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধের পর তার আর সন্ধান মেলেনি। পাকিস্তান যাওয়ার আগে দেশে তার বিয়ে হয়েছিল। বাংলাদেশে একজন মেয়ে আছে। তবে পাকিস্তান যাওয়ার আগে তার স্বামী মারা যান।
পাকিস্তানে অবস্থানরত বাংলাদেশি এক বৃদ্ধা/ছবি: সংগৃহীত
আলমিন ইসলাম আরও বলেন, খোঁজের মাধ্যমে সম্প্রতি রাবেয়া বিবির সঙ্গে কথা হয়েছে। নানি জানিয়েছেন, পাকিস্তানে হারিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ ফেরার কোনো উপায় ছিল না। সেখানে একজনকে বিয়ে করে সংসার করছেন। ওই সংসারে তার ছেলে-মেয়ে আছেন। এখন তিনি বেড়াতে বাংলাদেশে আসবেন। আমরা তাকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুতি নিচ্ছি।
১৮ থেকে ২০ বছর আগে ভোলা থেকে হারিয়ে যান হাজেরা। এখন তার বয়স প্রায় ৫২ বছর। তিনিও পাকিস্তানে গিয়ে এক ব্যক্তিকে বিয়ে করেছেন। হাজেরার ভাইয়ের ছেলে মো. বিল্লাল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ফুফু হারিয়ে যাওয়ার পর তাকে অনেক খুঁজেছেন দাদা-দাদি। কিন্তু কোথাও তাকে পাওয়া যায়নি। একপর্যায়ে তারা জানতে পারেন, ফুফু হয়তো আশপাশের দেশে পাচার হয়েছেন। এখন জানতে পারেছি, তিনি পাকিস্তানে আছেন, সেখানে বিয়ে করেছেন। দেশে এলে বাকিটা জানতে পারবো, আসলে তার সঙ্গে কী ঘটেছিল।
২০১৯ সালে বিদেশে পাচার ও হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে কাজ করছে মানবাধিকার সংগঠন ‘দেশে ফেরা’। সম্প্রতি এ সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে নতুন নামকরণ করা হয়েছে ‘খোঁজ’।
‘খোঁজ’র সদস্যরা জানান, পাকিস্তানের মানবাধিকার কর্মী ওলিউল্লাহ মারুফের মাধ্যমে ওই পাঁচ নারীকে খুঁজে বের করা সম্ভব হয়েছে। ওলিউল্লাহ মারুফ এমন পাচার ও হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের খুঁজে বের করেন। তারপর তাদের ভিডিও করেন। ওই ভিডিওতে ভুক্তভোগীদের নাম-ঠিকানা থাকে। তখন জেলা, উপজেলা, স্থানীয় ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে তাদের পরিবারদের খুঁজে বের করা হয়।
খোঁজের সংগঠক তানভীর হাসান জাগো নিউজকে বলেন, তারা বেশ কয়েক বছর বিদেশে পাচার ও হারিয়ে যাওয়া নাগরিকদের ফেরাতে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ২৭০ জনকে বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশ আসতে সহযোগিতা করেছেন। তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন সয়ম একেক করে আসছেন। কিন্তু এবারই প্রথম একসঙ্গে পাকিস্তান থেকে পাঁচজন নারী দেশে ফিরবেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর তাদের এই দেশে ফেরা মানবিক ও গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাদের স্বাগত জানাতে খোঁজের সদস্যরা বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া তাদের পরিবারের সদস্যরাও যাবেন।
এমএমএ/এমএমকে