আইনমন্ত্রী
নারীর সম্পত্তির পূর্ণ অংশ নিশ্চিতে বিকল্প আইনি পথ খোঁজার আহ্বান
অনেক ক্ষেত্রে শরীয়াহ আইনের কারণে মেয়েরা সম্পত্তির পূর্ণ অংশ পায় না। এ বিষয়ে বিকল্প আইনগত পথ খুঁজে দেখা যেতে পারে বলে মনে করেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান।
মঙ্গলবার (মার্চ ১০) বিজয় সরণির সামরিক জাদুঘরে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে এক বিশেষ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
নারীর সম্পত্তির অধিকার প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, অনেক ক্ষেত্রে শরীয়াহ আইনের কারণে মেয়েরা সম্পত্তির পূর্ণ অংশ পায় না। এ বিষয়ে বিকল্প আইনগত পথ খুঁজে দেখা যেতে পারে।
তিনি জানান, ইসলামে ‘হেবা’ বা গিফটের বিধান রয়েছে। পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের ১৯৬৪ সালের একটি রায়ে বলা হয়েছে, বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি হেবা করার সময় নিজের জীবদ্দশায় ভোগদখলের অধিকার রেখে দিতে পারেন। বাংলাদেশের ট্রান্সফার অব প্রপার্টি আইনে এই ধরনের বিধান আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা যায় কি না, সে বিষয়ে গবেষণা করার জন্য তিনি বিশেষজ্ঞদের আহ্বান জানান।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আজকে আমরা ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেছি।
ফ্যামিলি কার্ডের মালিকানা পরিবারের পুরুষ সদস্যের নয়, নারীর নামে। এটি নারীর প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধের প্রতিফলন এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তিনি বলেন, নির্বাচনি জনসভায় গিয়ে তিনি প্রায়ই নারীদের উদ্দেশে একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। অনেক নারী নিজেদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, ‘কিছু করি না, বাসায় থাকি।’ কিন্তু বাস্তবে তারাই সবার আগে ঘুম থেকে ওঠেন, ঘর পরিষ্কার করেন, হাঁস-মুরগি দেখেন, রান্নাবান্না করেন, স্বামী-সন্তানকে খাইয়ে কাজে পাঠান এবং সারাদিন সংসারের কাজ সামলান। দিনের শেষে সবাইকে খাওয়ানোর পর তারাই সবচেয়ে শেষে ঘুমাতে যান।
আইনমন্ত্রী বলেন, এই নারীরাই সংসারকে ভালো রাখেন, আর সংসার ভালো থাকার কারণেই দেশ ভালো থাকে। অথচ অনেক সময় তাদের কাজের মূল্যায়ন হয় না; বরং বলা হয় তারা কিছুই করেন না।
তিনি জানান, নারীদের এই বাস্তব অবদান তুলে ধরতে তিনি ১১৭টি জনসভায় একই বক্তব্য দিয়েছেন, যেন নারীরা নিজেদের অধিকার ও মর্যাদা সম্পর্কে সচেতন হন।
নারী অধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, দেশে নারী কমিশন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন রয়েছে। তবে নতুন কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান কমিশনগুলোর সঙ্গে যেন দায়িত্বের দ্বন্দ্ব তৈরি না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, মানবাধিকার কমিশনের পাশাপাশি গুম কমিশন গঠনের পর অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বের ওভারল্যাপ তৈরি হয়েছে। ফলে আইন প্রণয়নের সময় এসব বিষয় নতুন করে বিবেচনা করতে হচ্ছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনি এলাকায় গিয়ে তিনি দেখেছেন কিছু মৌলবাদী গোষ্ঠী নারীদের লক্ষ্য করে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে ভোট প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। তারা কোরআন শরীফ নিয়ে বসে তালিমের কথা বলে পরে ভোটের জন্য প্রভাবিত করছে।
তিনি বলেন, কেউ কেউ দাবি করছে—নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিলে ‘বেহেশতের টিকিট’ পাওয়া যাবে। এটি ধর্মীয়ভাবে ভুল এবং শিরকের শামিল।
তার মতে, বেহেশত বা দোজখের সিদ্ধান্ত একমাত্র আল্লাহই কিয়ামতের দিন নির্ধারণ করবেন। তাই এসব অপপ্রচার থেকে নারীদের সচেতন করা জরুরি।
আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার গুমের সংস্কৃতি বন্ধ করতে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার অবসান ঘটাতে কাজ করছে। একই সঙ্গে মিথ্যা মামলার প্রবণতাও কমানোর চেষ্টা চলছে।
তিনি একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, তার নির্বাচনি এলাকায় এক নারী নির্যাতনের ঘটনায় গ্রাম থেকে ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছিল। পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার পর দেখা যায়, ঘটনায় প্রকৃতপক্ষে একজনই জড়িত। পরে তার বিরুদ্ধেই মামলা করা হয়।
আইনমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে গত ১৬ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। এই অর্থ দিয়ে বিদেশে ‘বেগমপাড়া’ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, আমাদের মন্ত্রীদেরও জনগণের নজরদারির মধ্যে থাকতে হবে, যেন আমরা এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে পারি।
তার মতে, অর্থপাচার রোধ করে সেই অর্থ দেশের উন্নয়ন ও নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে ব্যবহার করা গেলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ৩০ দিনের মধ্যে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে সংসদে তোলা হবে।
তিনি আরও জানান, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ এখনো তালিকায় নেই, তবে তথ্য অধিকার আইনের সংশোধনসহ বিভিন্ন প্রস্তাব তিনি নোট নিয়েছেন এবং বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন- বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেতো রেংগলি, এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. দাউদ মিয়া, ইউএন উইমেন বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ গীতাঞ্জলি সিং, জাতিসংঘের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মতামতবিষয়ক বিশেষ দূত আইরিন খান এবং বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) -এর নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন।
এসইউজে/এমআরএম