কৃত্রিম সংকট তৈরি করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে: সিপিডি
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে কৃত্রিমভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর প্রচেষ্টা (পাঁয়তারা) হচ্ছে বলে মনে করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) ধানমন্ডিতে সিপিডির নিজস্ব কার্যালয়ে মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এ অভিযোগ করে গবেষণা সংস্থাটি। এতে সূচনা বক্তব্য ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনা করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
এক প্রশ্নের জবাবে সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হেলেন মাশিয়াত প্রিয়তি বলেন, যখন যুদ্ধ শুরু হয় তখন বিপিসি থেকে বলা হয় ২৬-২৭ দিনের রিজার্ভ আছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয় এপ্রিল মাস চলার মতো রিজার্ভ আছে। তারপরেও আর্টিফিসিয়াল ক্রাইসিস (কৃত্রিম সংকট) দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের সংকট হলে জোগান কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে মূল্য বাড়ানোর প্রক্রিয়া আমরা দেখতে পারি। মধ্যস্বত্বভোগী যারা আছে তাদের মাধ্যমে, এক্ষেত্রে আসলে তাই হয়েছে।
তিনি বলেন, গণমাধ্যমে দেখেছি ডিজেল, পেট্রোল ১৫ দিনের মতো রিজার্ভ আছে। অকটেন আছে ২৪ দিনের। পেট্রোল, অকটেন বাংলাদেশে যা হয় তা দিয়ে চাহিদা মেটাতে পারি। এক্ষেত্রে এই ক্রাইসিস কে ব্যবহার করে আর্টিফিসিয়ালি দাম বাড়ানোর প্রচেষ্টা বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছে।
ভোক্তার ঘাড়ে জ্বালানির বাড়তি মূল্য না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট বলেন, এই ক্রাইসিসটা স্বল্প থেকে মধ্যমেয়াদি। এখানে যে চাপ আসবে সেখানে দাম না বাড়িয়ে, ভোক্তার উপরে সে দায় না দিয়েই বিপিসি এটা ট্যাকেল করার কথা।
তিনি বলেন, দুই বছর আগে বিপিসি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে দাম সমন্বয় করে, আমরা বলেছি সেটার মধ্যে কিছুটা ফল্ট আছে। সেই দাম সমন্বয়ের মধ্যে তারা কিছুটা তাদের মার্জিন রেখে গ্লোবাল মার্কেটে যতটা কমার কথা সেটা দামে রিফ্লেক্ট হয় না। যে কারণে বিপিসি কয়েক বছর ধরে অনেক লাভে আছে। স্বল্প মেয়াদি ধাক্কাটা জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে- বিপিসির লাভের অংশ ব্যবহার করে এই স্বল্প থেকে মধ্য মেয়াদি ধাক্কাটা ট্যাকেল করা উচিত। ভোক্তার উপর দেওয়া উচিত না।
আরও পড়ুন
যুদ্ধের ধাক্কায় বিশ্বের তেলবাজারে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড়’ সংকট
এশিয়ার কোন দেশে জ্বালানি তেলের মজুত কত?
সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের তেলের দাম স্থানীয় বাজারে কতটুকু প্রতিফলিত হবে, সে ব্যাপারে সরকারের কাছে বিভিন্ন নীতি উপাদান (পলিসি ইনস্ট্রুমেন্ট) রয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মুনাফার বাইরেও জ্বালানির ওপর দেশে প্রায় ২০-২৫ শতাংশ বিভিন্ন ধরনের কর রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে সরকার এই কর কমিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পায়।
বর্তমানে দেশে ডিজেল, অকটেন ও অন্যান্য জ্বালানির কয়েক সপ্তাহের মজুত রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বড় সমস্যা হলো জ্বালানি তেলের কোনো স্থায়ী স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ বা কৌশলগত মজুত নেই, যা কিনা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে রয়েছে। এ ধরনের রিজার্ভ থাকলে সংকটের সময় বাজারে নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব হয়। বর্তমানে প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কে কেনাকাটার কারণে চাহিদার চেয়ে বেশি তেল সংগ্রহের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটি বেড়ে গেলে তাৎক্ষণিক মেটানো যে কোনো দেশের জন্যই কঠিন। তাই বাজারকে আস্থায় আনা ও নিশ্চয়তা দেওয়া জরুরি।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সরকার বর্তমানে জ্বালানি পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পট বায়িং করছে। ভারতের সঙ্গে পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আমদানির চুক্তি পুনরায় চালু করছে। এছাড়া প্রয়োজনে মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য বিকল্প উৎস থেকেও জ্বালানি আনার ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে মূল লক্ষ্য হলো, জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। আবার বাড়তি দামে জ্বালানি কিনতে রিজার্ভের ওপর যেন চাপ না পড়ে, সেদিকেও সরকারকে নজর রাখতে হবে। সে ক্ষেত্রে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) থেকে ঋণ নেওয়া যেতে পারে।
জ্বালানি তেল কিনতে রিজার্ভের ওপর চাপ কমানো জরুরি জানিয়ে তিনি বলেন, রিজার্ভের ওপর খাদ্যনিরাপত্তা ও সার আমদানির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ভর করে। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি স্বল্প মেয়াদি সমন্বিত পরিকল্পনার পাশাপাশি মধ্য মেয়াদে জ্বালানি তেলের একটি স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা বাজারকে নিশ্চয়তা দেবে। এমনকি ভবিষ্যতে প্যানিক বায়িং থেকে নিষ্কৃতি দেবে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবদ্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে (অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড) সই করে বাংলাদেশ। চুক্তির আওতায় আমেরিকা থেকে সাড়ে ৪ হাজার পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা দিতে হবে। আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে আরও ২ হাজার ২১০ প্রকারের পণ্যে শুল্কমুক্তি সুবিধা দেবে। এ কারণে অর্থবছরে সরকার আমদানি শুল্কবাবদ প্রায় এক হাজার ৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে। ওই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে এক তরফাভাবে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এটি ডব্লিউটিওর নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এর ফলে ডব্লিউটিওর আওতায় সদস্য অন্যান্য দেশকেও একই সুবিধা দিতে বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, আর একটি বিষয় হচ্ছে ওই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র থেকে নির্দিষ্ট পণ্য ক্রয়ের শর্ত। এ কারণে সরকরের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থ্যাৎ এই চুক্তি রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের যে বিষয়টি রয়েছে, সরকারকে সেটা পুর্নমূল্যায়ন করার দরকার। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।
এসএম/কেএসআর