ঈদে বিনা টিকিটে যাত্রা ঠেকাতে কমলাপুরে থাকবে তিন স্তরের চেকিং

মো. নাহিদ হাসান
মো. নাহিদ হাসান মো. নাহিদ হাসান , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:০০ পিএম, ১১ মার্চ ২০২৬
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ঘিরে নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা/ ছবি- জাগো নিউজ

আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘরমুখো যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্যে বাড়ি ফেরা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। বিশেষ করে রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ঘিরে নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা।  

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদযাত্রায় স্টেশনে অতিরিক্ত ভিড় ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে এবার কমলাপুর স্টেশনে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে। স্টেশনের বাইরের প্রবেশমুখ, প্ল্যাটফর্ম কমপাউন্ড এবং প্ল্যাটফর্মে প্রবেশের গেট- এই তিন ধাপেই যাত্রীদের টিকিট প্রদর্শন করতে হবে। টিকিট ছাড়া কোনো ব্যক্তি যেন স্টেশন এলাকায় প্রবেশ করতে না পারেন- সেজন্য সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সতর্ক বার্তা দেওয়া হয়েছে।  

বুধবার (১১ মার্চ) দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, স্টেশনের প্রবেশ মুখেই বাঁশ দিয়ে বেড়া তৈরি করা হয়েছে। যাত্রীরা প্রবেশের সময় সিরিয়ালি এক লাইনে প্রবেশ করতে পারবেন। সিঙ্গেল লাইনে প্রবেশের জন্য একাধিক বেড়া দেওয়া হয়েছে। এর সামনেই রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি), রেলওয়ে পুলিশ এবং র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) কন্ট্রোল রুম স্থাপন করা হয়েছে। এসব কন্ট্রোল রুমে সার্বক্ষণিক প্রহরার ব্যবস্থা করা হবে।

এছাড়া কমলাপুর স্টেশন এলাকায় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম শেষ হয়েছে। ধুয়ে-মুছে পুরো প্ল্যাটফর্ম এলাকায় পরিচ্ছন্ন পরিবেশ আনা হয়েছে।  

রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঈদের সময় বিপুল সংখ্যক যাত্রী রাজধানী ছাড়েন। এ সময় অনেক ক্ষেত্রে টিকিটবিহীন লোকজন স্টেশনে প্রবেশ করায় ভিড় বাড়ে এবং প্রকৃত যাত্রীরা ভোগান্তিতে পড়েন। তাই যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে স্টেশনের প্রতিটি প্রবেশপথে নিরাপত্তাকর্মী ও রেলওয়ে কর্মীদের মোতায়েন করা হবে।

এছাড়া যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রেলওয়ে পুলিশ, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। 

এছাড়া স্টেশনের ভেতরে ও প্ল্যাটফর্ম এলাকায় নজরদারি বাড়াতে সিসিটিভি ক্যামেরায় পর্যবেক্ষণ জোরদার করা হবে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ট্রেনের সময়সূচি মেনে চলা, টিকিটধারী যাত্রীদের অগ্রাধিকার দেওয়া এবং প্ল্যাটফর্মে অপ্রয়োজনীয় ভিড় নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।  

আরও পড়ুন
ঈদে বিমানবন্দর থেকে জয়দেবপুর বিআরটি লেনে একমুখী চলবে গাড়ি 
ঈদযাত্রায় সড়কে চাঁদাবাজি আর বাসে বাড়তি ভাড়া চলবে না 

ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার মো. সাজেদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে যাত্রীর চাপ বাড়বে। যাত্রীদের যাত্রা নির্বিঘ্ন করার লক্ষ্যে রেলট্রাক, সিগনালিং ব্যবস্থা, মেইনটেনেন্স, লোকোমেটিভ মেইনটেনেন্স ইত্যাদি বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষ বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। প্রস্তুতি সেভাবে নেওয়া হয়েছে যেন ট্রেন ঢাকা স্টেশন থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে যথা সময়ে ছেড়ে যেতে পারে।  

তিনি বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে বড় বড় জংশন স্টেশনগুলোতে মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। ওখানে পরিদর্শক এবং কর্মকর্তার সমন্বয়ে কমিটি গঠন করে সেল গঠন করা হয়েছে। যারা প্রতিনিয়ত ট্রেন অপারেশনের কাজ মনিটরিং করবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। যাত্রীরা যেন ছাদে ভ্রমণ করতে না পারে- যেটা জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং আইনত দণ্ডনীয়, তারা এই বিষয়গুলো দেখবেন। বিনা টিকিটের যাত্রী যেন স্টেশনে প্রবেশ করতে না পারেন, যারা টিকিটধারী যাত্রী তাদের যাত্রা যেন নির্বিঘ্ন হয় সেজন্য বিশেষভাবে তিন স্তরের চেকিং কার্যক্রম পরিচালিত হবে।

সাজেদুল ইসলাম আরও বলেন, স্টেশনে প্রবেশের সব পয়েন্টে আরএনবি, রেলওয়ে কর্মচারী এবং আইনশৃঙ্খ বাহিনীর সদস্যরা নিয়োজিত থাকবেন যেন অবৈধ অনুপ্রবেশ না ঘটে। তাছাড়া স্টেশনের সৌন্দর্য বর্ধনের কিছু কিছু কাজ চলছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা চলছে।  

তিনি বলেন, আমরা আশা করছি আমাদের রেলওয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এবার ঈদে যাত্রীদের যাত্রা নির্বিঘ্ন এবং পছন্দময় হবে।  

রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) ঢাকা বিভাগের সহকারী কমান্ড্যান্ট রোকনুজ্জামান খান জাগো নিউজকে বলেন, ঈদের সময় যাত্রীরা যেন স্বাচ্ছন্দ্যে ঢাকা থেকে তাদের গন্তব্যে নিরাপদভাবে যাতায়াত করতে পারেন, সে জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। বিশেষ করে যাত্রীদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে যাতে কোনো ধরনের ব্যত্যয় না ঘটে এবং যাত্রীরা যেন সুষ্ঠুভাবে স্টেশনে প্রবেশ করতে পারেন, ট্রেনে উঠতে পারেন এবং নিরাপদে তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন- সে বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।  

তিনি বলেন, এবার বাংলাদেশ রেলওয়ে এক বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে। তা হলো- বিনা টিকিটের কোনো যাত্রী ট্রেনে উঠতে পারবেন না। অন্য সময় দেখা যেত, কিছু যাত্রী স্টেশনে ঢুকে পড়ার পর পজ মেশিনের মাধ্যমে তাদের টিকিট করে দেওয়া হতো। এর ফলে আগে থেকে টিকিট কাটা যাত্রীদের পাশাপাশি অতিরিক্ত যাত্রী ট্রেনে উঠতেন। যদিও প্রতি বছর প্রায় ২৫ শতাংশ স্ট্যান্ডিং টিকিট দেওয়া হয়, এবারও সেই ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এর বাইরে পজ মেশিনের মাধ্যমে অতিরিক্ত টিকিট দেওয়ার ফলে ট্রেনে অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হতো। এতে করে কোচের ভেতরে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতো এবং যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য নষ্ট হতো। অনেক ক্ষেত্রে ট্রেনের ছাদে ওঠার ঘটনাও ঘটতো, যা নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এ পরিস্থিতি এড়াতে এবারের প্রস্তুতিমূলক সভায় মন্ত্রীর সভাপতিত্বে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, স্টেশনের প্রবেশমুখেই টিকিট পরীক্ষা করা হবে। অর্থাৎ, টিকিট ছাড়া কেউ স্টেশনে প্রবেশ করতে পারবেন না।  

আরএনবির এই কর্মকর্তা বলেন, একই সঙ্গে হ্যান্ড মাইকের মাধ্যমে ঘোষণা দেওয়া হবে, যাদের টিকিট নেই তারা যেন স্টেশনে প্রবেশের চেষ্টা না করেন। কারণ তাদের ট্রেনে ভ্রমণের অনুমতি দেওয়া হবে না।  

তিনি বলেন, অতিরিক্ত যাত্রী উঠলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে। ট্রেনের ছাদে বা ইঞ্জিনে লোকজন উঠলে ট্রেন চলাচলেও সমস্যা তৈরি হয় এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। এ ক্ষেত্রে জিআরপি, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) এবং সরকারের অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। স্টেশনের ভেতরে ও বাইরে নিরাপত্তা জোরদার থাকবে। পাশাপাশি বিশেষ টিম, টাস্কফোর্স এবং রিজার্ভ টিমও প্রস্তুত রাখা হবে, যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে দ্রুত তা সামাল দেওয়া যায়।

jagonews24.com

রোকনুজ্জামান খান আরও বলেন, ঈদের সময় স্বাভাবিকভাবেই যাত্রীর চাপ অনেক বেশি থাকে এবং বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তাই নিয়মিত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলো অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করবে। 

দুর্ঘটনা প্রতিরোধে রেলওয়ের পদক্ষেপ
এবার ঈদে ট্রেনযাত্রায় দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ও ট্রেন শিডিউল অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে রেলপথ পেট্রোলিংয়ের ব্যবস্থা নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। রেল ব্রিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সিগন্যালিং ব্যবস্থা, কোচ এবং ইঞ্জিনের নিবিড় পরিচর্যা ও পরীক্ষা সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্ঘটনাস্থলে পাঠানোর লক্ষ্যে রিলিফ ট্রেনসমূহ সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হবে। 

বন্ধ থাকবে মালবাহী ট্রেন
আগামী ১৯ মার্চ রাত ১২টা ১ মিনিটের পর থেকে ঈদের দিন সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কন্টেইনার ও জ্বালানি তেলবাহী ট্রেন ছাড়া পণ্য বা মালামাল পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত অন্যান্য সব মালবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকবে।  

ঈদের আগে-পরে থাকছে না সেলুন কার 
ঈদের দশ দিন পূর্বে এবং ঈদের পরে দশ দিন পর্যন্ত ট্রেনে সেলুন কার সংযোজন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।

ঈদযাত্রায় সুন্দরবন, মধুমতি, বেনাপোল, জাহানাবাদ, রূপসীবাংলা এক্সপ্রেস ও নকশীকাঁথা কমিউটার ট্রেন ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনের শহরতলী প্লাটফরম থেকে পরিচালনা করা হবে। রেলওয়ের সিদ্ধান্ত অনুয়ায়ী আগামী ১৬ মার্চ থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত ঢাকাগামী একতা, দ্রুতযান, পঞ্চগড়, নীলসাগর, কুড়িগ্রাম, লালমনি, রংপুর, চিলাহাটি ও বুড়িমারী এক্সপ্রেস ট্রেনসমূহের ঢাকা বিমানবন্দর স্টেশনে যাত্রাবিরতি থাকবে না।  

১৬ মার্চ থেকে আন্তঃনগর ট্রেনের ডে-অফ বাতিল
ঈদযাত্রা উপলক্ষে আগামী ১৬ মার্চ থেকে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত সব আন্তঃনগর ট্রেনের সাপ্তাহিক বন্ধের দিন (ডে-অফ) প্রত্যাহার করা হয়েছে। ঈদের পরে যথারীতি সাপ্তাহিক অফ-ডে কার্যকর রাখা হবে।

নিরাপদ ও সুষ্ঠুভাবে ট্রেন পরিচালনা নিশ্চিত করে যাত্রীসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সময়ানুবর্তিতা রক্ষার জন্য ডিভিশনাল ও জোনাল কন্ট্রোলে পৃথক পৃথক মনিটরিং সেল গঠন করে কর্মকর্তাদের ইমার্জেন্সি ডিউটি দেওয়া হবে। সময়ানুবর্তিতা রক্ষায় বিভিন্ন  গুরুত্বপূর্ণ ও জংশন স্টেশন এবং সিগন্যাল কেবিনে কর্মকর্তা ও পরিদর্শকদের তদারকির মাধ্যমে ট্রেন পরিচালনা করা হবে।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি রেলভবনের সম্মেলন কক্ষে আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ট্রেনযাত্রার এক প্রস্তুতিমূলক সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।  

এনএস/কেএসআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।