দুই বছরের টানাপোড়েন শেষে বরফ গলাতে দিল্লি যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এক ধরনের স্থবিরতায় পড়ে। সেই অচলাবস্থার পুনরাবৃত্তি আর দেখতে চায় না ঢাকা। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার শীতল সম্পর্ক কাটিয়ে আবারও স্বাভাবিক ও কার্যকর কূটনৈতিক যোগাযোগে ফিরতে আগ্রহী বাংলাদেশ।
এমন প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) দুই দিনের সফরে ভারতের দিল্লি যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। সঙ্গে থাকছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। গত ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমান নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠনের পর এটিই বাংলাদেশের কোনো মন্ত্রীর প্রথম ভারত সফর, যা কূটনৈতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ১১ ও ১২ এপ্রিল মরিশাসের পোর্ট লুইসে অনুষ্ঠিতব্য ইন্ডিয়ান ওশান কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার আগে দিল্লিতে অবস্থান করবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি শুভেচ্ছা সফর হলেও এর অন্তর্নিহিত গুরুত্ব অনেক বেশি। নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কোন পথে এগোবে— তা নিয়ে একটি প্রাথমিক রূপরেখা তৈরির সুযোগ তৈরি হবে এই সফরে। একই সঙ্গে দিল্লির অবস্থান বোঝার পাশাপাশি নিজেদের কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরতে চায় ঢাকা।
আরও পড়ুন
দিল্লি থেকে একই উড়োজাহাজে মরিশাস যাবেন খলিল-জয়শঙ্কর
ভারত থেকে পাইপলাইনে ডিজেল আমদানিসহ নানা ইস্যুতে আলোচনা
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৭ এপ্রিল বিকেলে ঢাকা ত্যাগ করে সন্ধ্যায় দিল্লি পৌঁছে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠক করবেন খলিলুর রহমান। পরদিন ৮ এপ্রিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। এছাড়া পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী হারদীপ সিং পুরি এবং বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ হতে পারে।
এসব বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনায় আসবে। এর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য-বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা পুনরায় চালু, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক করা। পাশাপাশি ভারতে অবস্থানরত পলাতক ব্যক্তিদের প্রত্যার্পণ, বিশেষ করে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতাদের দেশে ফেরানোর বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে।
এছাড়া আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব নিয়েও দুই পক্ষ মতবিনিময় করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারের এক নীতিনির্ধারক বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কের গতি কমে গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। নির্বাচনের আগে (ভারত থেকে) বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা কমে আসে এবং নির্বাচনের পর তা প্রায় অনুপস্থিত। এমনকি খালেদা জিয়াকে শ্রদ্ধা জানাতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর এবং নতুন সরকার গঠনের অনুষ্ঠানে ভারতীয় প্রতিনিধির উপস্থিতিও ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছে ঢাকা।
তিনি আরও বলেন, সম্পর্কে উত্থান-পতন থাকতেই পারে, তবে সংলাপ বন্ধ হওয়া উচিত নয়। যোগাযোগ চালু থাকলে ভুল বোঝাবুঝি দূর করা সম্ভব। আমরা এমন সম্পর্ক চাই, যেখানে পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থ রক্ষা পায়।
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র-বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরও জানিয়েছেন, সফরে সীমান্ত হত্যা বন্ধসহ দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। একই সঙ্গে দুই দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সব বিষয়েই আলোচনা হবে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৮ মাস দায়িত্ব পালন করে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত ওই সরকারের আমলে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে নিম্নমুখী ছিল। নতুন সরকারের এই সফর সেই স্থবিরতা কাটিয়ে সম্পর্ককে নতুন গতিতে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জেপিআই/কেএসআর