বর্ষবরণের প্রস্তুতিতে মুখরিত পুরান ঢাকার অলিগলি

আশিকুজ্জামান
আশিকুজ্জামান আশিকুজ্জামান , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৫৯ পিএম, ১৩ এপ্রিল ২০২৬
নববর্ষের উৎসবে আনন্দের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয় নাগরদোলা। চলছে তা বসানোর কাজ/ছবি: জাগো নিউজ

পুরান ঢাকার অলিগলিতে এখন উৎসবের আমেজ। চৈত্র সংক্রান্তি আর নববর্ষ বরণ ঘিরে শাঁখারীবাজার থেকে ইসলামপুর, সর্বত্রই সাজ সাজ রব। একদিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শাস্ত্রীয় আচার, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের হালখাতা- দুদিকেই চলছে জোর প্রস্তুতি।

দুদিনের উৎসব
এবারের উৎসব উদ্‌যাপনে লক্ষ্য করা যাচ্ছে তারিখ ও তিথির বিশেষ ফারাক। বাংলা একাডেমির সংশোধিত বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সারাদেশে সরকারিভাবে পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন হবে। কিন্তু হিন্দুদের পঞ্জিকা বা তিথি অনুযায়ী, এবার চৈত্র সংক্রান্তি ও নববর্ষের লগ্ন কিছুটা পিছিয়ে থাকায় অনেক মন্দিরে ধর্মীয় আচার এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে হালখাতা অনুষ্ঠিত হবে পরদিন, অর্থাৎ বুধবার (১৫ এপ্রিল)।

ফলে পুরান ঢাকায় উৎসবের আমেজ এ বছর কেবল একদিনে সীমাবদ্ধ থাকছে না। মঙ্গলবার শোভাযাত্রা ও মেলার মতো বর্ণিল উৎসব শুরু হলেও, ধর্মীয় রীতি পালন ও হালখাতা চলবে বুধবার পর্যন্ত। এতে দুই দিনব্যাপী মিলনমেলায় পরিণত হতে যাচ্ছে এ জনপদ, যা সেখানকার বাসিন্দাদের আনন্দকে আরও দীর্ঘায়িত করবে।

প্রস্তুতির হালচাল
সোমবার (১৩ এপ্রিল) বিকেলের পর সরেজমিনে দেখা যায়, শাঁখারীবাজারে ধর্মীয় আয়োজনের প্যান্ডেল টাঙানো, ইসলামপুরে হালখাতার আয়োজন ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শোভাযাত্রার প্রস্তুতি চলছে।

বর্ষবরণের প্রস্তুতিতে মুখরিত পুরান ঢাকার অলিগলি

সেই সঙ্গে লক্ষ্মীবাজার ও তাঁতিবাজারে মিষ্টির দোকানগুলোতে জমজমাট বেচাবিক্রি। অলিগলিতে বাতাসা, কদমা আর খই-মুড়ির পসরা সাজিয়ে বসেছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। রায়সাহেববাজার থেকে সদরঘাট পর্যন্ত প্রতিটি মোড়ে উৎসবের ছোঁয়া। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বাড়তি সতর্কতা লক্ষ্য করা গেছে।

শাঁখারীবাজারে পূজার ব্যস্ততা

শাঁখারীবাজারে পা রাখতেই নাকে ভেসে আসে ধুনুচি আর চন্দনের ঘ্রাণ। সরু গলিগুলোতে এখন তিল ধারণের ঠাঁই নেই। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা জানান, মঙ্গলবার তাদের চৈত্র সংক্রান্তি এবং পরদিন পহেলা বৈশাখ ঘিরে বর্ণিল সাজে সেজেছে আশপাশ। প্রতিটি মোড়ে তৈরি হচ্ছে অস্থায়ী প্যান্ডেল। কেউ প্রতিমা সাজাচ্ছেন, কেউ ব্যস্ত আলোকসজ্জায়। ছোট দোকানগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। আবির, ধূপ, মোমবাতি আর পূজার সামগ্রী কিনছেন ভক্তরা।

শঙ্খশিল্পী বিমল সেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের কাছে চৈত্র সংক্রান্তি মানেই শুদ্ধির দিন। বছরের সব গ্লানি ধুয়ে-মুছে নতুনকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। এবার প্যান্ডেলগুলো একটু বড় করে করা হচ্ছে, কারণ লোকসমাগম গত কয়েক বছরের তুলনায় বেশি হবে বলে আশা করছি।’

কেনাকাটা করতে আসা গৃহিণী সুস্মিতা দাস বলেন, ‘চৈত্র সংক্রান্তির বিশেষ পাঁচন রান্নার জন্য তিতকুটে সবজি আর পূজার ডালি কিনলাম। শাঁখারীবাজারে না আসলে ঠিক পুজার আমেজ পাওয়া যায় না।’

বর্ষবরণের প্রস্তুতিতে মুখরিত পুরান ঢাকার অলিগলি

ইসলামপুরে হালখাতার আয়োজন

শাঁখারীবাজার পেরোলেই ইসলামপুর। কাপড় ও পাইকারি ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র। এখানে চলছে হালখাতার প্রস্তুতি। আধুনিক যুগেও ব্যবসায়ীরা লাল সালুর খাতায় হিসাব রাখার ঐতিহ্য অটুট রেখেছেন।

মেসার্স রহিম টেক্সটাইলের স্বত্বাধিকারী হাজি মোহাম্মদ রফিক জাগো নিউজকে বলেন, ‘হালখাতা আমাদের বাপ-দাদার আমলের ঐতিহ্য। এখন ফোনে অনেককে দাওয়াত দিচ্ছি, কার্ডও পাঠানো হয়েছে। কাল মিষ্টিমুখ আর পাওনা আদায়ের মধ্য দিয়ে নতুন হিসাব শুরু হবে।’

ব্যবসায়ী সুমন কুমার সাহা জানান, হালখাতার জন্য দোকান ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করা হয়েছে। ক্রেতাদের জন্য বিশেষ মিষ্টি আর ঠান্ডা শরবতের অর্ডার দেওয়া আছে। এটা শুধু ব্যবসার লেনদেন নয়, সম্পর্কের নবায়নও বটে।
 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যস্ততা

পুরান ঢাকার উৎসবের রঙে নতুন মাত্রা যোগ করেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা দিনরাত এক করে তৈরি করছেন শোভাযাত্রার জন্য বড় বড় ভাস্কর্য, মুখোশ ও সরাচিত্র।

বর্ষবরণের প্রস্তুতিতে মুখরিত পুরান ঢাকার অলিগলি

চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী অন্বেষা রায় জানান, তারা এবার লোকজ মোটিফ প্রাধান্য দিচ্ছেন। বাঘ, পেঁচা আর লোকজ পুতুলের মাধ্যমে বাংলার সংস্কৃতি তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। রাত জেগে কাজ করলেও ক্লান্তি নেই, কারণ এটা প্রাণের উৎসব।

আয়োজনের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি দেখতে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক রইছ উদ্দীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘পুরান ঢাকার সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে। শিক্ষার্থীরা যে থিমে কাজ করছে, তা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দেবে। বড় পায়রার প্রতীক দিয়ে আমরা বিশ্বে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে চাই। দুই দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক আয়োজনের মাধ্যমে বর্ষবরণ উদ্‌যাপন করা হবে। সবাইকে এই আয়োজনে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানাই।’

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রস্তুতি

বাংলা নতুন বছর ১৪৩৩ বরণ করে নিতে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি।

জেলা প্রশাসক রেজাউল করিম বলেন, উৎসবের সূচনা হবে সকাল ৯টায় কার্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে বের হওয়া বর্ণাঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে। এ আয়োজনে জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মচারী এবং নানা ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ উৎসবের সর্বজনীনতাকে আরও ফুটিয়ে তুলবে।

তিনি জানান, উৎসবমুখর এই দিনে অফিস প্রাঙ্গণে বসবে ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা, যেখানে গ্রামীণ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ পুতুল নাচ ও সাপ খেলাসহ বাঙালি ঐতিহ্যের হরেকরকম প্রদর্শনীর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। দিনভর চলবে দেশীয় সংস্কৃতির গান ও নাচের বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আয়োজনটি একখণ্ড অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে পরিণত হতে যাচ্ছে।

এমডিএএ/একিউএফ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।