প্রধানমন্ত্রী
গণভোট ও জুলাই সনদ নিয়ে বিভ্রান্তকারীদের প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না
রাজনৈতিক স্বার্থে গণভোট ও জুলাই সনদকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে—এমন ব্যক্তিদের প্রশ্রয় না দিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, কিছু ব্যক্তি ও রাজনৈতিক দল এখন গণভোটকে ভিন্ন পথে পরিচালিত এবং দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
সোমবার (২৭ এপ্রিল) দুপুরে যশোরের শার্শা উপজেলার ঐতিহাসিক উলসী খালের পাড়ে পুনর্খনন কাজের উদ্বোধন শেষে আয়োজিত এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা গণভোটের রায়কে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে এবং নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে জুলাই সনদকে ভুলভাবে উপস্থাপন করছে, তাদের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, যারা নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়, যদি তারা এটা করতে না পারে, তবে জনগণের জন্য নেওয়া সব কর্মসূচি যেমন—নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড, খাল খনন কর্মসূচি, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য বন্ধ মিল-কারখানা চালুর যে কর্মসূচি, স্বাস্থ্যসেবা গ্রামে গ্রামে পৌঁছে দেওয়ার কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণের যে কর্মসূচিগুলো রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে তারা ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে।
দেশের অগ্রগতি যেন কেউ বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে জনগণকেই দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরিত জুলাই সনদ ধাপে ধাপে এবং সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, জনগণ এরই মধ্যে প্রমাণ করেছে—তারা তাদের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করার চেষ্টা মেনে নেয় না। যেভাবে জনগণ ৫ আগস্ট উপযুক্ত জবাব দিয়েছে, ভবিষ্যতেও কেউ তাদের ভাগ্য নিয়ে খেলতে চাইলে তারা একইভাবে জবাব দেবে।
সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে দেশের মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
আরও পড়ুন
এবার নারীদের ‘এলপিজি কার্ড’ দেওয়ার ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর
তিনি বলেন, আজ আমাদের শপথ নিতে হবে। ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত আজ বসে থাকলে চলবে না। ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে দেশ গঠনের কাজে লাগাতে হবে, ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাত আজকে দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কাজে লাগাতে হবে, তাহলেই এদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে।
তিনি বলেন, আমাদের চোখের সামনে দিয়ে গত ৫০ বছর পৃথিবীর অনেক দেশ তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করেছে, পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে। যে সিঙ্গাপুরকে নিয়ে আমরা মাঝে মাঝে গল্প করি, সেই সিঙ্গাপুরের অবস্থা ১৯৭১ সালে আমাদের চেয়েও খারাপ ছিল। আজ ৫০ বছরে তারা কোথায় চলে গিয়েছে! তারা যদি পারে আমরা কেন পারবো না? ইনশাল্লাহ্ আমরাও পারবো। এই দেশের মানুষ পারবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা দেখেছি আন্দোলনের নামে কীভাবে ১৭৩ দিন হরতাল করা হয়েছিল। মনে আছে আপনাদের ১৭৩ দিন কীভাবে দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। এখনো আবার সেই ভূত আরেকজনের কাঁধে গিয়ে আছর করেছে, আপনাদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যদি সতর্ক থাকি এবং আমাদের কর্মসূচি বাস্তবায়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকি তাহলে বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলতে পারবে না।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে কেউ যদি ছিনিমিনি খেলতে চায়, ইনশআল্লাহ চব্বিশের আগস্টের ৫ তারিখে যেভাবে বাংলাদেশের মানুষ জবাব দিয়েছে, ভবিষ্যতেও এদেশের মানুষ সেভাবেই জবাব দেবে।
তিনি বলেন, আমরা যারা শহীদ জিয়ার দল করি, আমরা যারা দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সৈনিক, আমরা বিশ্বাস করি, এই দেশই হচ্ছে আমাদের প্রথম, এই দেশই হচ্ছে আমাদের শেষ ঠিকানা। সেজন্যই আমরা বলি, প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ।
উলসী খাল দেখিয়ে দিয়ে তারেক রহমান বলেন, এই খালে পানি নেই। কারণ, এই খালগুলো আজকে রুদ্ধ হয়ে গেছে, ভরাট হয়ে গেছে। বিভিন্ন জায়গায় খাল দখলও হয়ে গেছে। এই যে খাল ভরাট হয়ে গেছে, খাল বন্ধ হয়ে গেছে, খাল দখল হয়ে গেছে, তাতে কি সাধারণ মানুষ বা কৃষকদের কোনো উপকার হয়েছে? কোনো উপকার হয়নি।
তিনি বলেন, এখন আজকে আমরা এসেছি এই খালটি আবার পুনর্খনন করতে। গত প্রায় ৫০ বছর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই খালটিকে খনন করেছিলেন। প্রায় চার কিলোমিটারের এই খাল আমরা যদি পুনর্খনন করতে পারি, তাহলে এই এলাকার মানুষ পানি পাবে। পানি পেলে কী হবে? আমরা দেখেছি প্রায় ২০ হাজারের মতো কৃষক সরাসরি উপকৃত হবে, প্রায় ১৪শ’ টন বাড়তি খাদ্যশস্য উৎপাদন হবে। প্রায় ৭২ হাজার মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে।
তিনি বলেন, এই খালে পানি থাকলে উপকারটা কাদের হবে ভাই? এই এলাকার মানুষের হবে। শুধু তাই নয়, এই খাল পুনর্খনন যখন শেষ হয়ে যাবে আমরা এর দুপাশ দিয়ে প্রায় তিন হাজার বৃক্ষরোপণ করবো।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই এলাকার মা-বোনেরা যারা ঘরে হাঁস পালতেন আগে, খালে পানি না থাকার কারণে অনেকের পক্ষে সেটা আর সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু খালে পানি এলে মা-বোনদের জন্য বাড়তি রোজগারের সুবিধা হবে, হাঁস পালনের মাধ্যমে। আমরা যদি সকলে মিলে পরিশ্রম করি তাহলে অবশ্যই ভাগ্যের পরিবর্তন করা সম্ভব। অবশ্যই দেশের অবস্থার পরিবর্তন করা সম্ভব। আর তাহলেই দেশের মানুষ ভালো থাকতে পারবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের প্রায় ২০ কোটি জনসংখ্যার অর্ধেক হচ্ছে নারী। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া এই নারীদের জন্য শিক্ষাব্যবস্থাকে ফ্রি করে দিয়েছেন ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত। প্রথমবার করেছেন স্কুল পর্যায় পর্যন্ত, দ্বিতীয়বার করেছেন ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত। খালেদা জিয়ার সেই কর্মসূচিকে আমরা আরও সামনে নিয়ে যেতে চাই।
তিনি বলেন, এজন্য আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি—মেয়েদের পড়ালেখার ব্যবস্থা ডিগ্রি পর্যন্ত বিনামূল্যে করবো। শুধু মেয়েদের শিক্ষাব্যবস্থা আমরা ডিগ্রি পর্যন্ত ফ্রি করবো না। একই সঙ্গে আমাদের যে মেয়েরা ভালো রেজাল্ট করবে, তাদের জন্য আমরা উপবৃত্তিরও ব্যবস্থা করবো।
প্রধানমন্ত্রী এর আগে বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে শার্শায় বাবার স্মৃতি বিজড়িত উলসী খাল পুনর্খনন কাজের উদ্বোধন করেন। এসময় তিনি নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কাটেন। পরে খালের পাড়ে বৃক্ষরোপণও করেন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সভাপতিত্বে সমাবেশে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
প্রধানমন্ত্রী এর আগে বেলা ১১ টা ৪২ মিনিটে খাল খনন স্থলে আসেন। এসেই খালের উপরের অংশে নির্মিত ফলক উন্মোচন করেন। এসময় প্রধানমন্ত্রী আল্লাহর দরবারে দোয়া ও মোনাজাত করেন।
১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর যশোরের শার্শার উলসী থেকে যদুনাথপুর পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ খালটি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বেচ্ছাশ্রমে খনন করেছিলেন, যা ‘জিয়ার খাল’ নামে পরিচিত। খালটি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে পুনর্খনন করা হচ্ছে। সূত্র: বাসস
এমকেআর