‘মে দিবস আমাদের কষ্টের কথা মনে করিয়ে দেয়, সমাধান দেয় না’

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:০৩ পিএম, ০১ মে ২০২৬
রাজধানীর রাস্তায় একজন রিকশাচালক/ছবি: জাগো নিউজ

মে দিবস এলে শ্রমিকের অধিকার, ন্যায্য মজুরি ও সম্মানজনক জীবনের কথা নতুন করে সামনে আসে। কিন্তু শহরের ব্যস্ত রাস্তায় প্রতিদিন ঘাম ঝরানো অসংখ্য রিকশাচালকের কাছে এই দিনটি যেন অন্য দিনের মতোই সংগ্রামের আরেকটি দিন। তাদের ভাষ্য- এই দিনটা আমাদের কষ্টের কথা মনে করিয়ে দেয়, কিন্তু সমাধান দেয় না। ‘প্যাডেল না ঘুরলে পেটে ভাত জুটবে না’ এই এক বাক্যই যেন তাদের জীবনের সারাংশ।

ঢাকার রামপুরা, খিলগাঁও, মালিবাগ, সেগুনবাগিচা এলাকা ঘুরে রিকশাচালকের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে তাদের বেঁচে থাকার লড়াই, দুঃখ-সুখ, এবং স্বপ্নভঙ্গের গল্প।

বৃষ্টি-রোদ কোনো কিছুই আমাদের থামাতে পারে না

রামপুরা বেটার লাইফ হসপিটালের পাশের গলিতে দাঁড়িয়ে যাত্রী খুঁজছিলেন ৪৫ বছর বয়সী আবদুল মালেক। গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর। প্রায় ১৫ বছর ধরে রিকশা চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা, এভাবেই দিন কাটে। বৃষ্টি হোক বা রোদ, রাস্তায় নামতেই হয়। একদিন রিকশা না চালালে সেদিনের বাজার বন্ধ।

তিনি বলেন, আজ সকালে বৃষ্টির পানিতে ভিজেই রাস্তায় বের হয়েছি। প্রতিদিন গড়ে ৭০০-৯০০ টাকা আয় হয়। এর মধ্যে ১৫০-২০০ টাকা যায় রিকশা ভাড়ায়। বাকি টাকা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।

মে দিবসের কথা শুনি, কিন্তু আমাদের জীবনে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখি না- কিছুটা আফসোস নিয়ে এমন মন্তব্য করেন এই রিকশাচালক। তিনি বলেন, একদিন রিকশার প্যাডেল না ঘুরলে পেটে ভাত জুটবে না, এই হলো আমাদের অবস্থা।

মেয়ের পড়ালেখা চালাতে হিমশিম খাচ্ছি

মালিবাগ এলাকার বাসিন্দা রিকশাচালক মো. জসিম উদ্দিন (৩৮) দুই সন্তানের জনক। বড় মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। তিনি বলেন, মেয়েটাকে পড়াতে চাই, কিন্তু খরচ সামলাতে পারি না। বই-খাতা, স্কুলের ফি সব মিলিয়ে অনেক টাকা লাগে। সংসারের খাবার টাকা জোগাড় করতেই হিমশিম খাই।

তিনি আরও বলেন, আমাদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট মজুরি নেই। যেদিন যাত্রী বেশি পাই, সেদিন একটু ভালো থাকে। না হলে ধার করতে হয়।

মে দিবস প্রসঙ্গে জসিমের মন্তব্য, আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষের জন্য যদি কিছু সুবিধা বাড়তো, তাহলে এই দিনটার মানে থাকতো।

শরীর ভেঙে যাচ্ছে, কিন্তু থামার উপায় নেই

মধুবাগ এলাকার বাসিন্দা ৫০ বছর বয়সী রহিম মিয়া দীর্ঘদিন ধরে রিকশা চালাচ্ছেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে শারীরিক কষ্টও। রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনের সামনে কথা হয় এই রিকশাচালকের সঙ্গে। তিনি বলেন, হাঁটুতে ব্যথা, কোমরে ব্যথা- সবকিছু নিয়েই রিকশা চালাতে হয়। কিন্তু বসে থাকলে তো চলবে না।

jagonews24.com

তার ভাষায়- আমাদের কোনো সঞ্চয় নেই, কোনো নিরাপত্তা নেই। অসুস্থ হলে আয় বন্ধ। তখন পরিবার নিয়ে বিপদে পড়তে হয়।

মে দিবস সম্পর্কে তিনি বলেন, এই দিনটা আমাদের কষ্টের কথা মনে করিয়ে দেয়, কিন্তু সমাধান দেয় না।

দুর্ঘটনার ভয় সবসময় থাকে

কাকরাইল এলাকার রিকশাচালক শহীদুল ইসলাম (৩০) বলেন, রাস্তায় নামলেই ভয় লাগে। গাড়ির চাপ অনেক, দুর্ঘটনা হলে আমাদেরই বেশি ক্ষতি হয়। গত বছর এক দুর্ঘটনায় আমার এক বন্ধু গুরুতর আহত হয়েছিলেন। এরপর থেকে সবসময় ভয়ে থাকি। কিন্তু উপায় নেই। রিকশা না চালালে পেটে দানা-পানি পড়বে না।

তিনি আরও বলেন, পাঁচ বছর ধরে ঢাকায় রিকশা চালাই। প্রতি বছর মে দিবসে কিছু মানুষ রিকশা চালাতে বাঁধা দেয়। আমরা মে দিবস পালন করে কী করবো? দিবস তো আর আমাদের দুঃখ ঘুচিয়ে দেবে না। আমাদের জীবনের নিরাপত্তা নেই। আমাদের নিরাপত্তার বিষয়টা কেউ ভাবলে ভালো হতো।

স্বপ্ন ছিল অন্য কিছু করার, কিন্তু পারিনি

সেগুনবাগিচা এলাকার কথা হয় রিকশাচালক সাইফুল ইসলামের (৩৫) সঙ্গে । তিনি এক সময় ছোট ব্যবসা করতেন। লোকসানের কারণে সেই ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বাধ্য হয়ে রিকশা চালানো শুরু করেন। তিনি বলেন, স্বপ্ন ছিল দোকান বড় করবো, কিন্তু সব শেষ হয়ে গেছে। এখন এই রিকশাই ভরসা।

তিনি আরও বলেন, রিকশা চালানো কঠিন কাজ, কিন্তু আর কোনো উপায় নেই। প্রতিদিন যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোরকমে সংসার চলে। মে দিবস আমাদের স্বপ্ন আর বাস্তবতার ফারাকটা বেশি করে মনে করিয়ে দেয়। আমার মতে এই দিনটি আমাদের মতো মানুষের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দেয়। আমাদের অসহায়ত্ব বেশি করে মনে করিয়ে দেয়।

সংগ্রামের চাকা ঘুরছে প্রতিদিন

এই রিকশাচালকদের গল্প আলাদা হলেও তাদের বাস্তবতা প্রায় একই। অনিয়মিত আয়, কোনো সামাজিক নিরাপত্তা নেই, স্বাস্থ্যসেবার অভাব, এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এসবই তাদের জীবনের অংশ।

মে দিবসের মূল দাবি ছিল শ্রমঘণ্টা নির্ধারণ, ন্যায্য মজুরি ও শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করা রিকশাচালকদের জন্য এসব দাবি এখনো অনেকটাই দূরের বিষয়। তারা কোনো সংগঠনের আওতায় নেই, নেই কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা।

jagonews24.com

তবুও জীবন থেমে থাকে না। প্রতিদিন ভোরে তারা রাস্তায় নামেন, প্যাডেল ঘোরে। কারণ একটাই প্যাডেল না ঘুরলে পেটে ভাত জুটবে না।

মে দিবস তাই তাদের কাছে শুধুই প্রতীকী একটি দিন, যেখানে অধিকার ও বাস্তবতার ফারাক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাদের প্রত্যাশা খুব বেশি নয়, ন্যায্য আয়, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পরিবার নিয়ে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ। এই প্রত্যাশা পূরণই হতে পারে মে দিবসের প্রকৃত অর্জন।

এমএএস/এএমএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।