বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় ভাষা শহীদদের স্মরণ
বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে প্রচলন, অন্যান্য জাতিসত্তার ভাষা ও বর্ণমালা সংরক্ষণের তৎপরতার পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় দ্রুত কার্যকরের দাবির মধ্য দিয়ে বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় ভাষা শহীদদের স্মরণ করেছে সমগ্র জাতি। শুক্রবার রাত থেকে ভাষা শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। ফুলে ফুলে ভরে উঠে বাঙালির শোক আর অহংকারের এই মিনার।
২১-এর প্রথম প্রহরে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, যুক্তরাজ্য হাউজ অব লর্ডসের স্পিকার ব্যারোনেস ডি সুজা এবং বাংলাদেশের সফররত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে নিয়ে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবুল মাল আব্দুল মুহিত, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সভাপতিমন্ডলীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী ও মোহাম্মদ নাসিম, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ, নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, ডা. দীপু মনি ও এডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
পরে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিমের নেতৃত্বে ১৪ দল, রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল, তিন বাহিনীর প্রধানেরা, ইন্টার পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের সাবের হোসেন চৌধুরী, বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, অ্যাটর্নি জেনারেল, ঢাবি উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শহীদ বেদীতে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে ওয়ার্কার্স পার্টি, হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের নেতৃত্বে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, খালেকুজ্জামান ভূইয়ার নেতৃত্বে বাসদ, দিলীপ বড়–য়ার নেতৃত্বে সাম্যবাদী দল প্রথম প্রহরে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান।
এছাড়াও চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে বিএনপি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি ও সিনেট সদস্য, সেক্টরস কমান্ডার্স ফোরাম, আওয়ামী যুব লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব মহিলা লীগ, বাংলা একাডেমী, শিল্পকলা একাডেমী, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, জাতীয় প্রেসক্লাব, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফ্রন্ট, ছাত্র ফেডারেশন, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিক সমিতি এবং শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের প্রতিনিধিরা একুশের প্রথম প্রহরে ভাষা শহীদদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
এর আগে শুক্রবার মধ্য রাতে ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছোঁয়ার আগেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় উপস্থিত হন।
এসময় হাজার হাজার মানুষ নগ্নপায়ে বুকে শোকের প্রতীক কালো ব্যাজ লাগিয়ে হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি-আমি কি ভুলিতে পারি’ গানে কণ্ঠ মিলিয়ে এবং যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির দাবিতে শ্লোগান দিতে দিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। একই সাথে তারা দাবি তোলেন একদিকে বাংলাকে সর্বস্তরে প্রচলনের দাবি, অন্যদিকে অন্যান্য জাতিসত্তার ভাষা ও বর্ণমালা সংরক্ষণের তৎপরতা।
শনিবার সকালে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে প্রভাতফেরী সহকারে আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করা হয়।
এবারে দুই বিদেশি অতিথির উপস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শ্রদ্ধা নিবেদন পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন যুক্তরাজ্য হাউজ অব লর্ডসের স্পিকার ব্যারোনেস ডি সুজা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়।
এছাড়াও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে অনেক বিদেশী নাগরিককেও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে দেখা গেছে।
৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাংলা ভাষার দাবীতে রাস্তায় নেমে আসে মানুষ, জারি হয় ১৪৪ ধারা, ভেঙে ফেলা হয় শোষকের শৃঙ্খল। রক্তে ভেসে যায় রাজপথ। গুলিতে বিদীর্ণ হয় বুক। শহীদ হন রফিক, শফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ নাম না জানা আরো অনেকে। ভাষার জন্য প্রাণ দিয়ে ইতিহাস গড়েন তারা। বাংলা পায় রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা। একাত্তরে জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
মাতৃভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গের এই দিনটিকে জাতিসংঘ স্বীকৃতি দেয় ১৯৯৯ সালে। অমর একুশে এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। একুশের চেতনার প্রতীক ‘শহীদ মিনার’ এখন এশিয়া, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ সব কটি মহাদেশের বহুভাষিক চেতনার স্মারক।
আরএস/এমএস