ফাঁসি কার্যকরের অপেক্ষায় শেরপুরবাসী
এখন কেবলই ফাঁসি কার্যকরের অপেক্ষা। সোহাগপুর বিধবাপল্লীর শহীদ পরিবার এবং একাত্তরে নির্যাতনের শিকার ক্ষতিগ্রস্তরা অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছেন কখন কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হবে।
মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের লোকজন ছাড়াও সবার এখন উৎসুক দৃর্ষ্টি টেলিভিশন সেটের পর্দায়। কখন ভেসে আসবে কামারুজ্জামানের রায় কার্যকরের ঘোষণা।
এদিকে কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় বহাল রেখে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দেওয়া রায়ের খসড়ায় সই করেছেন আপিল বিভাগের চার বিচারপতি।
বুধবার দুপুর আড়াইটায় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফিরোজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দীন চৌধুরী খসড়া রায়ে সই করেন।
সইয়ের পর এটি সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। বিধি মোতাবেক রেজিস্ট্রারের কার্যালয় থেকে এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠানো হচ্ছে। বিচারকদের স্বাক্ষরের পর রায়ের কপি লাল কাপড়ে বাঁধা অবস্থায় কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।
একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের ফাঁসির রিভিউ আপিল খারিজ হওয়ায় মঙ্গল ও বুধবার দুদিন সারাদেশে হরতালের ডাক দেয় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু, কেন্দ্রীয় জামায়াতের পক্ষ থেকে হরতাল আহ্বান করা হলেও কামারুজ্জামানের নিজ জেলা শেরপুরে মঙ্গলবার ও বুধবার হরতালের কোনো প্রভাব পড়েনি।
জামায়াতও এখানে নীরব। হরতালের সমর্থনে জেলার কোথাও কোনো কর্মসূচি পালিত হয়নি। এমনকি জামায়াতের কোনো নেতাকর্মীকেও এদিন মাঠে দেখা যায়নি। অভ্যন্তরীন এবং আন্ত:জেলা সড়কে যানবাহন চলাচল ছিল স্বাভাবিক। দোকানপাট, ব্যাংক-বীমা, অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা ছিল এবং অন্যান্য দিনের মতো স্বাভাবিক কাজকর্ম ও লেনদেন হয়েছে।
কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকরের পর তার মরদেহ কোথায় দাফন করা হবে এনিয়ে ধূম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। শেরপুরের বাজিতখিলা এলাকার নিজ বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে নাকি তার প্রতিষ্ঠিত এতিমখানায়? এ ব্যাপারে নিশ্চিত করে কেউ কোনো তথ্য দিতে পারেনি।
কামারুজ্জামানের ছেলে আসিফ ওয়ামি সোমবার ঢাকায় গণমাধ্যমকর্মীদের জানিয়েছেন, তার বাবার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী বাজিতখিলা এলাকার এতিমখানায় লাশ দাফন করা হবে।
পরিবারের অন্য সদস্যরা বলছেন, একবার কামারুজ্জামান মুদিপাড়া গ্রামের বাবা-মার কবরের পাশে পারিবারিক কবরস্থানে দাফনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। তবে কামারুজ্জামানের বড় ভাই কফিল উদ্দিন জানিয়েছেন, মরদেহ কোথায় দাফন হবে এ ব্যাপারে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কামারুজ্জামানের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ীই দাফন করা হবে।
তবে বুধবার বিকেল পর্যন্ত বাজিতখিলা এলাকার কামারুজ্জামানের মুদিপাড়া গ্রামের বাড়িতে গিয়ে লাশ দাফনের ব্যাপারে কোনো প্রস্তুতি দেখা যায়নি। গ্রামের বাড়িতে কেবল শয্যাশায়ী এক বড় ভাই এবং আনোয়ারা বেগম নামে আরেক ছোট বোনকে বাড়ির উঠোনে বসে আহাজারি করতে দেখা যায়। এদিকে, ফাঁসি কার্যকরের পর কামারুজ্জামানের মরদেহ শেরপুরের মাটিতে দাফন প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন শেরপুরের মুক্তিযোদ্ধারা।
এ ব্যাপারে মঙ্গলবার মুক্তিযোদ্ধারা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে স্মারকলিপিও দিয়েছেন। তারা জেলায় প্রবেশের সকল রাস্তায় জলে-স্থলে অবস্থান কর্মসূচি নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবু সালেহ মো. নূরুল ইসলাম হিরু।
কামারুজ্জামানের রিভিউ আপিল খারিজে শেরপুরে আওয়ামী লীগসহ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের নেতাকর্মী ও সংগঠক এবং একাত্তরে শহীদদের স্বজন, মুক্তিযোদ্ধা ও সাক্ষীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে আনন্দ-উচ্ছ্বাসের বহি:প্রকাশ ঘটলেও ফাঁসি কার্যকর না হওয়ায় তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা অবিলম্বে ফাঁসি কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন।
সোহাগপুর বিধবাপল্লীর শহীদ জায়া হাসনে বানু বলেন, চোয়াল্লিশ বছর ধইরা আল্লার কাছে একটাই দোয়া করছি, আর কানছি। যারা আমগোর সোয়ামী-সন্তানগরে মারছে, নারীদের উপরে অত্যাচার করছে, তাদের বিচার যেন অয়। ফাঁসি ঠিক থাহনে পরমান অইলো, ৩০ দিন চোরের আর একদিন গেরস্তের।
আলবদর কামরুজ্জামান বারে বারে বাঁচনের লাইগা চেষ্টা করলেও আল্লাতো একজন আছুইন, তিনি আমগোরে খুনির বিচার দেহাইয়া কবরে নিবার লাইগা এহনো বাঁচাইয়া রাকছেন। অহন তাড়াতাড়ি কামরুজ্জামানের ফাঁসি দেইক্কা মরবার চাই।
শহীদ পরিবার কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক জালাল উদ্দিন বলেন, কামারুজ্জামনের ফাঁসি বহাল থাহুনে শহীদ পরিবারগুলোতে স্বস্তি ফিরা আইছে। আমরা বিরাট খুশি। অহন অপেক্ষায় আছি কহন ফাঁসিকাষ্টে তারে ঝুলাইবো।
সেক্টর কামান্ডারস ফোরাম শেরপুর জেলা শাখার সভাপতি মো. আমজাদ হোসেন বলেন, অহনও কেনো কামারুজ্জামানরে দিনের আলো-বাতাস খাওনের জন্য রাখা অইছে, কিছুই বুঝিনা। ফাঁসিতে ঝুলাতে এতো দেরী কেনো। আমরা মুক্তিকামী মানুষ তার ফাঁসির অপেক্ষায় আছি। তার ফাঁসি কার্যকরের মধ্যদিয়েই শেরপুর কলঙ্কমুক্ত হবে। বাজিতখিলা এলাকার লোকদের সঙ্গে কামারুজ্জামানের ফাঁসির বিষয়ে কথা বললে তারা বিষয়টি পাশ কাটিয়ে যেতে চান। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জানান, কৃতকর্মের ফল ভোগের ঘোষণা হয়েছে, তাতে কষ্ট বা দুঃখের কি আছে ?
শেরপুরবাসী বারবার তাকে প্রত্যাখান করেছে : পঁচাত্তর পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে অনুকূল পরিবেশে ধাপে ধাপে কেন্দ্রীয় শিবিরসহ জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বে চলে যায় কামারুজ্জামান। ওই অবস্থায় আন্তর্জাতিক লবিতে বিচরণ করে ইসলামী ব্যাংকের অংশীদারিত্বসহ প্রচুর বিত্ত-বৈভবের মালিক বনে যান তিনি। সেই সুবাদে ১৯৮৬ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ৩ বার জামায়াতের ব্যানারে এবং পরবর্তীতে আরও দুইবার বিএনপির নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোটের ব্যানারে সর্বমোট ৫ বার শেরপুর-১ (সদর) আসন থেকে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হন। কিন্তু, প্রতিবারই শেরপুরবাসী তাকে প্রত্যাখান করেছে। ২০০৮ সালে দ্বিতীয় দফায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠিত হলে দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ওই অবস্থায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে ২০১০ সালের ১৩ জুলাই কামারুজ্জামান হাইকোর্ট এলাকা থেকে গ্রেফতার হন। একই বছরের ২ আগস্ট তাকে গ্রেফতার দেখানো হয় একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায়। এরপর থেকে টানা দীর্ঘ সময় কারাগারে আটক এবং ২০১৩ সালের ৯ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল এবং সোমবার রিভিউ আপিল খারিজ হলে এখন কেবলই তার ফাঁসির জন্য অপেক্ষা।
কে এই কামারুজ্জামান : ১৯৫২ সালের ৪ জুলাই শেরপুর সদর উপজেলার বাজিতখিলা ইউনিয়নের নিভৃত পল্লী মুদিপাড়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বাবা ইনসান আলী সরকারের ঘরে জন্ম নেয় মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। এলাকায় দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে তিনি ‘জামান সাব’ বা ‘জামান ভাই’ বলেই সমধিক পরিচিত। তার স্কুলজীবন কাটে জেলা শহরের ঐতিহ্যবাহী জি.কে পাইলট হাই স্কুলে। এরপর উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন পার্শ্ববর্তী জামালপুর আশেক-মাহমুদ কলেজে। ১৯৭১ সালে উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র থাকাবস্থায় কামারুজ্জামান জামায়াতে ইসলামীর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের ময়মনসিংহ জেলার প্রধান বনে যান।
মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর ২২ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করতে জামালপুরের আশেক-মাহমুদ কলেজের ইসলামী ছাত্রসংঘের বাছাই করা নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন আলবদর বাহিনী। ওই বাহিনী সে সময় ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও টাঙ্গাইলে ব্যাপক মাত্রায় যুদ্ধাপরাধ ঘটায়।
জামালপুরে আলবদর বাহিনীর ৭টি ক্যাম্পের মধ্যে শেরপুরে সুরেন্দ্র মোহন সাহার বাড়ি দখল করে বানানো ক্যাম্পের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন কামারুজ্জামান। ওই সময় বহু মানুষকে হত্যা করা হয় ওই ক্যাম্পে। এছাড়া তার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ নেতৃত্বে সীমান্তবর্তী নালিতাবাড়ী উপজেলার সোহাগপুর গ্রামে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় ১৮৭ জন গ্রামবাসীকে। সেই সঙ্গে পাশবিক নির্যাতন চালানো হয় গৃহবধূদের।
স্বাধীনতার পরের বছর ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন কামারুজ্জামান। ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে থেকে মাস্টার্স পাস করার পর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের আমলে ১৯৭৮-৭৯ সালে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালের অক্টোবরে কামারুজ্জামান মূল দল জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন এবং ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর রুকনের দায়িত্ব পান। ১৯৮২-১৯৮৩ সালে তিনি জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামের নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্বেও ছিলেন। ১৯৯২ সাল থেকে তিনি জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্বে রয়েছেন।
এসএইচএ/এমএএস/আরআই