রানা প্লাজা ধস : বদলে যাচ্ছে পোশাক খাত
দুই বছর আগে ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের ঘটনা ঘটে। সাভারের সেই ভবন ধসের দুর্ঘটনায় চাপা পরে প্রাণ হারান হাজারো শ্রমিক। দিনটির ভয়াবহতার কথা স্মরণ হলে আঁতকে ওঠেন সারা বিশ্ব। আর ওই দুর্ঘটনায় সারাবিশ্বের নজর এসে পড়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের উপর। এই ঘটনার পর অনেক বদলে গেছে পোশাকখাতের কর্মপরিবেশ। ক্রেতাদের আন্তর্জাতিক দুটি সংগঠন এ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স ব্যাপক কাজ করে বাংলাদেশে। ঘটনার পর দেশের পোশাক শিল্প কর্মপরিবেশ উন্নতির ও শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দিক থেকে এগিয়েছে অনেক দূর।
পোশাকখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ওই ঘটনার পরে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প নিরাপদ কর্ম পরিবেশের দিক থেকে অনেক উন্নতি হয়েছে।
রানা প্লাজা ধসের পর দেশের পোশাক খাতের কি পরিবর্তন এসেছে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, জাতীয় কর্মপরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। শ্রম আইন সংশোধন করা হয়েছে। দেশের সব কারখানা পরিদর্শন করেছে ইউরোপের ক্রেতাদের জোট ‘এ্যাকর্ড অন ফায়ার অ্যান্ড বিল্ডিং সেফটি ইন বাংলাদেশ’ এবং উত্তর আমেরিকার ক্রেতা জোট ‘অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার সেফটি’ নামে দুুটি পৃথক জোট ও বুয়েটের একটি টিম।
তিনি বলেন, এসব টিম অবাধে তন্ন তন্ন করে কারখানা ভবনের কাঠামো, অগ্নি ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা মান যাচাই করেছে। তারা মাত্র ১ দশমিক ২৫ শতাংশ কারখানা ত্রুটিপূর্ণ পেয়েছে। বাকি ৯৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ কারখানায় কোনো ত্রুটি পায়নি। ত্রুটিপূর্ণ ভবনের কারখানা নিয়ে পর্যালোচনা কমিটির সিদ্ধান্তের পর তাৎক্ষণিকভাবে আমরা কারখানা বন্ধ করে দিয়েছি। যে ভবনে ঝুঁকি আছে, শ্রমিকের নিরাপত্তার স্বার্থে সে ভবনের কারখানা আমরা একদিনও চালাব না। এটা আমাদের অঙ্গীকার। পোশাক খাতে আর কোনো দুর্ঘটনার জের বহনের সাধ্য নেই। সুতরাং আর কোনো রানা প্লাজা নয়, তাজরীন নয়। এ কারণে ভবনের কাঠামো, অগ্নি ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তায় ব্যাপক হারে নতুন করে বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
আতিকুল ইসলাম বলেন, ক্রেতারা বলেছেন- এ উদ্যোগ নিয়ে সারাবিশ্বে বাংলাদেশকে নিয়ে ইতিবাচক বার্তা গেছে। গত দুই বছর ক্রেতারা আমাদের পাশে ছিলো। যা এ খাতের জন্য বড় একটি ইতিবাচক দিক। আমরা আশা করছি এভাবে চললে পোশাক খাত আবার ঘুরে দাঁড়াবে।
এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি সালাম মুর্শেদী বলেন, দূর্ঘটনার পর বিজিএমইএ শ্রমিকদের বেতন, আহতদের চিকিৎসা ও প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে অনুদানসহ এ পর্যন্ত ১৫ কোটি টাকা খরচ করেছে।
তিনি আরও বলেন, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর পোশাকশিল্পের অনেক উন্নতি হয়েছে। এ ঘটনার পর অ্যাকর্ড অ্যালাইন্স-এর আগমন ঘটেছে।
উত্তর আমেরিকান পোশাক কোম্পানি, খুচরা বিক্রেতা এবং ব্র্যান্ডের সংগঠন অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার সেফটি সর্বশেষ তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের পোশাক কারখানার কর্মপরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে।
বদলাতে শুরু করেছে পোশাক শিল্পের কর্ম পরিবেশ :
দুই বছর আগের ওই ঘটনার পর বাংলাদেশের পোশাক শিল্প কর্মপরিবেশ উন্নতির ও শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দিক থেকে এগিয়েছে অনেক দূর। শিল্প মালিকরা বলছেন, ওই ঘটনার পর দেশি-বিদেশি সহায়তা আর উদ্যোক্তাদের প্রচেষ্টায় এ শিল্পের কর্মপরিবেশের আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিতে তারা এখন আরও বেশি সচেতন।
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাত আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য সামাজিক ও পরিবেশগত মান বজায় রেখে সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যাচ্ছে। বিগত দুই বছরে বাংলাদেশের শ্রম আইন সংশোধন, প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে এ খাতে আমূল পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে। বিশেষ করে গত ২০১৩ সালের অপ্রত্যাশিত শিল্প দুর্ঘটনা বাংলাদেশের শিল্প মালিক ও শ্রমিকদের জন্য ছিল একটি টার্নিং পয়েন্ট। বর্তমানে বাংলাদেশে তৈরি পোশাকশিল্পে প্রায় ৪০ লাখ নারী এবং পুরুষ শ্রমিক কাজ করছে। তাদের উপযুক্ত মজুরি, ফায়ার সেফটি, বিল্ডিং সেফটি, কর্মবান্ধব ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ সরকার।
পোশাক শিল্প মালিকরা বলছেন- রানা প্লাজা দুর্ঘটনা এদেশের শিল্প উদ্যোক্তাদের চোখ খুলে দিয়েছে। তারা এখন আরও বেশি সচেতন। দুই বছর আগের ওই ঘটনার পর দেশে-বিদেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় আউটলেটের সামনে বিক্ষোভ করে সেদেশের নাগরিকরা। ক্রেতা হিসেবে এই দুর্ঘটনার দায় কোনোভাবে তারা এড়াতে পারে না এমন অভিযোগের পর এ দেশের কারখানার কর্মপরিবেশ উন্নত করার ঘোষণা দেন তারা। এর ধারাবাহিকতায় ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতাদের নিয়ে দুটি জোট গঠিত হয়। এর মধ্যে উত্তর আমেরিকান পোশাক কোম্পানি, খুচরা বিক্রেতা এবং ব্র্যান্ড কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয় অ্যালায়েন্স ফর বাংলাদেশ ওয়ার্কার সেফটি।
অন্যদিকে, ১৭০টি ইউরোপীয় পোশাক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে ‘এ্যাকর্ড অন ফায়ার এন্ড বিল্ডিং সেফটি ইন বাংলাদেশ’ নামে আরেকটি জোট গঠন করে। এই জোট দুটি কারখানার কর্মপরিবেশ ও শ্রকিদের নিরাপত্তার বিষয়ে কাজ করছে।
এসআই/আরএস