৪৫ দিন সাগরে ভেসে কূলে ফিরলো ১১৬ মালয়েশিয়াগামী


প্রকাশিত: ১১:১১ এএম, ১৩ মে ২০১৫

সাগরের অথৈ জলে দীর্ঘ দেড় মাস ভাসমান থাকার দুর্বিষহ স্মৃতি নিয়ে ১১৬ মালয়েশিয়াগামী অবশেষে টেকনাফ উপকূলে ফিরে এসেছে। থাইল্যান্ডে ধরপাকড় বাড়ার কারণে দালালও মাঝিসহ আরেকটি ট্রলার নিয়ে পালিয়ে যাওয়ায় তারা এ ভোগান্তিতে পড়ে। দালাল ও মাঝি থাইল্যান্ড এবং মিয়ানমারের নাগরিক বলে দাবি করেছে প্রতারিত এসব মানুষগুলো।

মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে সেন্টমার্টিন কোস্টগার্ড তাদের আটক করলেও বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে টেকনাফ কোস্টগার্ড কার্যালয়ে তাদের নিয়ে আসা হয়। ফিরে আসা সকলে বাংলাদেশি নাগরিক। উদ্ধার হওয়াদের মাঝে কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া, সুনামগঞ্জ, পাবনা, যশোর ও ময়মনসিংহ জেলার বাসিন্দা রয়েছে।

ফিরে আসা যাত্রীদের ‘আইওএম’ নামের এনজিও সংস্থার চিকিৎসক টিম স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করছে।

ফিরে আসা সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার একডালা এলাকার মো. রিপন জানান, মো. জাকির নামে এক বন্ধু টেকনাফ ভ্রমণের কথা বলে তাকে নিয়ে আসে। টেকনাফে পৌঁছলে ওই বন্ধু তাকে ১৫ হাজার টাকার বিনিময়ে দালালদের কাছে বিক্রি করে দেয়। দালালরা তাকে জোরপূর্বক একটি সিএনজিতে তুলে রাতেই সাগরে অপেক্ষমান ট্রলারে নিয়ে যায়।

রিপন আরো জানায়, যেখানে ট্রলারটি অবস্থান করছিল সেখানে ১৪টি ট্রলার ছিল। মাঝি-মাল্লারা সকলে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের নাগরিক। ট্রলারে মোট ১৬৪ জন যাত্রী ছিল। এরমধ্যে ৩০ জনকে একটি ছোট বোটে করে আলাদাভাবে উঠিয়ে দেয় দালালেরা।
 
তিনি জানায়, থাইল্যান্ডে ধরপাকড় বেড়ে যাওয়ায় মিয়ানমারের ১৮ নারী যাত্রী, দালাল, বোটমাঝি অন্য ট্রলারে উঠে পালিয়ে যায়। এরপর থেকে তাদের বহন করা ট্রলারটি ভাসছিল। পরে যাত্রীরা নিজেদের মধ্যে সহযোগিতা করে ট্রলারটিকে সেন্টমার্টিনের দিকে নিয়ে আসার কালে কোস্টগার্ড আটক করে।

নরসিংদীর হোসেন মিয়ার ছেলে জাহাঙ্গীর (৩২) জানান, তিনিসহ আরও ২১ জন ৪৫ দিন ধরে ট্রলারে ছিলেন। চট্টগ্রামের ইউসুফ নামের এক দালালের হাত ধরে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে টেকনাফের সাবরাং থেকে ট্রলারে উঠেছিল তারা।

তিনি আরো জানায়, সকালের খাদ্য হিসেবে চিড়া ও গুড় এবং রাতের বেলা ওষুধ মেশানো ভাত খেতে দেয়া হতো তাদের। যা খেলে বমি আসতো। তৃষ্ণা নিবারণে পান করতে হতো লবন পানি।  

কক্সবাজারের উখিয়া নতুন বাজারের আবদুল হাফিজের ছেলে নুরুল হাকিম (৫৩) জানায়, পানি চাওয়া হলে এবং বেশী নড়াচড়া করলে শারীরিক নির্যাতন করতো ট্রলারে থাকা দালালরা। টেকনাফের খতিজা ও শওকত নামক দালালের হাত ধরে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে ট্রলারে উঠেছিলেন তিনি।  

মাদারীপুরের গাউজ বেপারীর ছেলে মো. মাসুম জানায়, ৪৫ দিন সাগরে ভাসতে থাকি। টেকনাফের নবী হোছেন ও বাবুল নামক দুইজন দালাল সার্বক্ষণিক ট্রলারে অবস্থান করে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন চালাতো। বিশেষ করে টেকনাফে ৩ মানবপাচারকারী বন্দুকযুদ্ধে নিহতের খবরে নির্যাতন বেশী করা হয়েছে।

যাত্রীরা জানায়, কেউ কেউ স্ব-ইচ্ছায় মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে আসলেও অনেককে জোর পূর্বক ট্রলারে উঠিয়ে দেয়া হয়েছে।

ফিরে আসা যাত্রীদের মধ্যে কক্সবাজার সৈকতের ৪ ফটোগ্রাফারও রয়েছে। তারা টেকনাফে ভ্রমণ করতে গেলে সাবরাং জীপ স্টেশন থেকে সন্ধ্যায় ৪-৫ জন লোক একটি সিএনজিতে তুলে নিয়ে ট্রলারে উঠিয়ে দেয় তাদের। এসময় তাদের কাছ থেকে দুটি ক্যামেরা ও ৪টি মোবাইল ছিনিয়ে নেয়া হয়।

এরা হলো, কক্সবাজারের কলাতলী এলাকার আবুল কালামের ছেলে মো. রফিক (১৯), আবদুল মজিদের ছেলে আবুল কাশেম (২০), নুর মোহাম্মদের ছেলে জাহাঙ্গীর আলম (২২) ও মোহাম্মদ হোছেনের ছেলে মো. হাসেম (২১)।

তারা জনি নামের একটি স্টুডিও’র তত্ত্বাবধানে ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করতো।

আইওএম’র ডা. সৌমেন জানান, যাত্রীদের মধ্যে আশঙ্কাজনক কেউ নেই। তবে খাদ্য জনিত অভাবে সবাই দুর্বল রয়েছে।

টেকনাফ কোস্টগার্ড স্টেশন কমান্ডার কাজী ফরিদুজ্জমান জানান, আটক মালয়েশিয়াগামীদের থানায় হস্তান্তর করে প্রকৃত দালালদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়েছে।

টেকনাফ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার আতাউর রহমান জানান, উদ্ধার হওয়া মালয়েশিয়াগামী যাত্রীদের থানায় হস্তান্তর করেছে কোস্টগার্ড। তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। চিহ্নিত দালালদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এমএএস/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।