ব্লগার অনন্ত হত্যা : ঘাতকরা এসেছিল মোটরসাইকেলে
মুক্তমনা ব্লগের অন্যতম সংগঠক, লেখক-ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ব্লগার অভিজিৎ রায় ও রাজিব হত্যাকাণ্ডের মিল খুঁজে পেয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ তিন ব্লগারের ওপর হামলার ধরনও একই। ব্লগার অনন্তকে পেছন দিক থেকে প্রথমে মাথায় আঘাত করে ঘাতকরা। দুই হাত দিয়ে তিনি ফেরানোর চেস্টা করেছিলেন। ঘাতকদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তার মাথা কেটে মগজ বের হয়ে যায়। অনন্তের শরীরে কমপক্ষে ১৪ থেকে ১৫টি জখমের চিহ্ন রয়েছে। একইভাবে রাজিব ও অভিজিৎকে কুপিয়ে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে র্যাব।
প্রত্যক্ষদর্শী ও র্যাব সুত্র জানায়, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চার ঘাতক এসেছিলেন দুটি মোটরসাইকেলে। সবাই ছিলেন মুখোশপরা। অনন্তকে তার বাসা থেকে ২০০ গজ দূর ধাওয়া করে পেছন থেকে আক্রমণ করে ঘাতকরা। আত্মরক্ষার জন্যে তিনি দৌড় দেন। দৌড়ে সিলেট নগরের সুবিদবাজারস্থ দস্তীদারদিঘীর পাড়ে (নূরানী দিঘি) মোড়ে এলে তাকে কোপানো শুরু করে। এতে মুহূর্তেই তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। মৃত্যু নিশ্চিত করে ঘাতকরা পশ্চিমপীর মহল্লা (বনকলা পাড়া) রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যান। আর ঘাতকরা ঢুকেছিলেন সুবিদবাজার মুল সড়ক দিয়ে।
র্যাব-৯ এর প্রেসব্রিফিংয়ে এসব তথ্য দেওয়া হয়েছে। সিআইডির ক্রাইম সিন এবং র্যাবের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। র্যাব-৯ এর মিডিয়া অফিসার এএসপি পঙ্কজ কুমার দে বলেন, অনন্ত বিজয় দাশকে পেছন থেকে আক্রমণ করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। একইভাবে ব্লগার অভিজিৎ ও রাজিব হায়দারকেও হত্যা করা হয়। হত্যার প্রাথমিক তদন্তে ব্লগার অভিজিৎ ও রাজিব হত্যার সঙ্গে মিল পাওয়া যাচ্ছে।
জাগো নিউজের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খুনিরা একদিকে ঢুকেছে আবার খুন করে অন্যদিকে পালিয়ে গেছে। এ থেকে মনে হয় তারা পরিকল্পিতভাবেই তাকে হত্যা করেছে। হত্যাকারীরা প্রশিক্ষিত। ঘটনার পূর্বাপর বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২/৩ দিন ধরে তারা এলাকাটি ঘুরে দেখেছে। কোথায় কী আছে সব বিষয়ে তাদের সম্মুখ ধারণা নেন। ঘাতকদের চিহিৃত করে তাদের গ্রেফতারে র্যাব কাজ শুরু করেছে বলেও জানান তিনি।
সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার কামরুল আহসান হাসপাতাল মর্গে লাশ দেখে আসার পরপরই বলেছিলেন, পুলিশ সবধরনের তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘাতকদের সনাক্ত করার চেস্টা করছে। ইতোমধ্যে পুলিশের একটি বিশেষ দল কাজ শুরু করেছে। এছাড়া সিআইডির ক্রাইম সিন দল ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অন্য ব্লগার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এ হত্যাকাণ্ডের মিল আছে মনে হচ্ছে। তারপরও আমরা তদন্ত করে বিষয়টি দেখছি। আমরা অপারগ হলে অন্য কোনো সংস্থাকে দিয়ে এ ঘটনার তদন্ত করানো হবে।
গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক ও জেলা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি, ব্লগার সহিদুজ্জামান পাপলু (পাপলু বাঙালি) জাগা নিউজকে বলেন, সম্প্রতি ডিএমপির পুলিশের হাতে আটক শফিউর রহমান ফারাবি ২০১৪ সালে একবার ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশকে হত্যার হুমকি দিয়েছিলেন। মুক্তমনার প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়কে হত্যার পর আবার ফারাবি অনন্তকে হত্যার হুমকি দেয়। এ থেকে বোঝা যায় ব্লগার হত্যাকাণ্ডগুলো একই সূত্রে গাথা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনন্ত বিজয় সুবিদবাজার নূরানী ১৩/১২ নম্বর বাসার রবীন্দ্র কুমার দাশের ছেলে। দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশ মুক্তমনা ব্লগে লেখালেখি করতেন। তিনি পূবালী ব্যাংক সুনামগঞ্জ জেলার ছাতকের জাউয়াবাজার শাখায় অ্যাসিস্ট্যান্ট ডেভেলপম্যান্ট অফিসার হিসেবে কাজ করতেন।
এছাড়া, বিজ্ঞান বিষয়ক ছোটকাগজ ‘যুক্তি’র সম্পাদক ছিলেন অনন্ত। তার প্রকাশিত চারটি গ্রন্থ রয়েছে। সেগুলো হল : পার্থিব, (সহলেখক সৈকত চৌধুরী), শুদ্ধস্বর, ঢাকা, ২০১১। ডারউইন : একুশ শতকে প্রাসঙ্গিকতা এবং ভাবনা, (সম্পাদিত), অবসর, ঢাকা, ২০১১। সোভিয়েত ইউনিয়নে বিজ্ঞান ও বিপ্লব : লিসেঙ্কো অধ্যায়, শুদ্ধস্বর, ঢাকা, ২০১২। জীববিবর্তন সাধারণ পাঠ (মূল: ফ্রান্সিসকো জে. আয়াল, অনুবাদ: অনন্ত বিজয় দাশ ও সিদ্ধার্থ ধর), চৈতন্য প্রকাশন, সিলেট, ২০১৪।
প্রসঙ্গত, গত ১২ মে (মঙ্গলবার) সকাল পৌনে ৯টায় সিলেট গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশকে সুবিদবাজারস্থ দস্তীদারদিঘীরপাড় চাররাস্তার মোড়ে দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। আশঙ্কাজনক অবস্থায় এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ছামির মাহমুদ/বিএ/আরআইপি