মায়ের দুধের বিকল্প নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:৫০ পিএম, ৩০ মে ২০১৫

শিশুর দৈহিক ও মানসিক বিকাশের জন্য মায়ের দুধে রয়েছে অত্যাবশ্যকীয় সব উপাদান। সন্তান জন্মের পর মায়ের বুকে যে দুধ আসে তাকে শাল দুধ বলে। চিকিৎসকদের মতে এ শাল দুধ হচ্ছে শিশুর প্রথম ভ্যাকসিন। এ জন্য শিশুর জন্মের পর প্রথম পাঁচ মাস তাকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে এবং পরবর্তীতে শিশুর বয়স দু’বছর হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত অন্যান্য খাবারের সাথে তাকে বুকের দুধও দিতে হব। তাহলে শিশুর দৈহিক ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিত ও ত্বরান্বিত হবে।

মায়ের দুধে রয়েছে শিশুর জন্য অত্যাবশ্যকীয় ও পরিমাণমত পানি ও চিনি। তাই অতিরিক্ত পানি ও চিনির প্রয়োজন নেই। মায়ের দুধ নিরাপদ। পবিত্র কোরআনেও শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর জন্য মাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

মা কোন রোগে আক্রান্ত হলে তার বুকের দুধ থাকে জীবাণুমুক্ত। শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা দেয়া আছে মায়ের বুকের দুধে। তাই শিশু কোন অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হলে তাকে বেশি করে বুকের দুধ খাওয়ানো দরকার। অনেক মা শিশুর পাতলা পায়খানা হলে বুকের দুধের বদলে গুঁড়া দুধ খাওয়ানো শুরু করেন। এটি ভুল। ডায়রিয়া হলে কোন অবস্থাতেই বাইরের দুধ দেয়া উচিত নয়। কারণ বাইরের গুঁড়া দুধের ডায়রিয়ার ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে এবং তাতে শিশুর পাতলা পায়খানা আরো বেশি হতে পারে।

মায়ের বুকের দুধ শিশুর সুরক্ষায় অনেক ভূমিকা রাখে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-

প্রদাহ প্রতিরোধ : মায়ের বুকের দুধে থাকে প্রচুর ইমুনোগ্লোবুলিনস যা নবজাত শিশুকে যে কোন প্রকার প্রদাহ বা ইনফেকশন হতে রক্ষা করে। এছাড়া বুকের দুধে রয়েছে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যক্ষমতাসম্পন্ন উপাদান লিমফোসাইটিস, ম্যাক্রোফেজেস এবং প্রোট্রিন যা প্রদাহজনিত জটিলতা ঠেকায়।

ডায়রিয়া প্রতিরোধ : মাতৃদুগ্ধ শিশুর ডায়রিয়াজনিত পানিশূন্যতা, বিকলাঙ্গতা এবং মৃত্যু প্রতিরোধ করে। যেসব শিশু পুরোপুরি মাতৃদুগ্ধ নির্ভর, সেসব শিশু অন্যদের চেয়ে ডায়রিয়ার কম ঝুঁকি বহন করে। শিশু জরিপে দেখা গেছে, যেসব শিশু ০-২ মাস বয়সে মাতৃদুগ্ধ পান করে না সেসব শিশুর ডায়রিয়ায় আক্রান্তের ঝুঁকি একই বয়সের অন্য শিশুদের চাইতে ২৫ গুণ বেশি।

শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ প্রতিরোধ : উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মাতৃদুগ্ধ শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ, শ্বাসকষ্ট এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের রোগ প্রতিরোধ করে। ব্রাজিলে এক জরিপে দেখা গেছে, মাতৃদুগ্ধ সেবনকারী শিশুদের চাইতে কৃত্রিম দুধে লালিত শিশুদের শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহের কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি ৩ দশমিক ৬ গুণ বেশি।

অ্যান্টি বডি উৎপাদন : মাতৃদুগ্ধ শিশুর দেহে মারাত্মক ছয়টি রোগ প্রতিরোধক অ্যান্টি বডি তৈরি করে। দেখা গেছে যে, জন্মের পরে প্রতিটি শিশুর দেহে সমপরিমাণ অ্যান্টি বডি থাকে। কিন্তু শিশুর বয়স ১২ মাস বা ১ বছর হলে, যেসব শিশু মাতৃদুগ্ধ পান করে তাদের দেহে কৃত্রিম দুগ্ধ পানকারী শিশুদের চেয়ে বেশি অ্যান্টি বডি থাকে।

বুদ্ধিমত্তার বিকাশ সাধন : মাতৃদুগ্ধ পানকারী শিশুরা অন্যদের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান হয়, দ্রুত কথা বলতে শিখে এবং অন্যকে অনুকরণ করতে পারে। মাতৃদুগ্ধ শিশুর নিউরোলজিক্যাল উন্নয়নও বিকাশ ঘটায়।

শিশুমৃত্যুর হার কমায় : উন্নয়নশীল দেশ যেখানে অপুষ্টি ও প্রদাহের মিশ্রক্রিয়ার ফলে শিশু মৃত্যুর উচ্চহার রয়েছে, সেখানে মাতৃদুগ্ধ পান শিশু মৃত্যুর হার কমায়। যেসব শিশু ৩-৪ মাস বয়সে কৃত্রিম দুধ পান করে তাদের মৃত্যুর হার ওই বয়সী অন্য শিশুর চেয়ে ১০-১৫ গুণ বেশি।

পরিবার-পরিকল্পনার সহায়ক : অনেক দেশে জন্ম নিয়ন্ত্রণের অন্যান্য পদ্ধতির তুলনায় মাতৃদুগ্ধদান বেশি কার্যকরী। এ পদ্ধতির জন্ম নিয়ন্ত্রণকে বলা হয় ল্যাকটেশনাল অ্যামেনরিয়া মেথোড এবং এতে সন্তান জন্মদানের ৬ মাসের মধ্যে গর্ভধারণের শতকরা ২ ভাগের কম ঝুঁকি থাকে। বাংলাদেশে প্রতিটি মহিলার ক্ষেত্রে শতকরা ৬ দশমিক ৫ ভাগ জন্ম নিরোধ করে।

অর্থনৈতিক সাশ্রয় : মাতৃদুগ্ধ পরিবারকে অর্থনৈতিকভাবে সাহায্য করে। হিসেব করে দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে কৃত্রিম দুগ্ধপান প্রতিবছর এক বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি করে, যা মোট জাতীয় উৎপাদনের শতকরা প্রায় ২ শতাংশ। কৃত্রিম দুগ্ধপানে প্রতিটি শিশুর জন্য প্রতিমাসে ১৬শ’ টাকা হতে ২১শ’ টাকা ব্যয় হয়, যা অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়। আবার এতে ম্যালামাইনসহ ক্ষতিকর অনেক উপাদান আছে যা শিশু স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

মাতৃস্বাস্থ্য রক্ষাকারী : মাতৃদুগ্ধ দান মায়ের সুস্বাস্থ্যেরও সহায়ক। এতে মাসিক-পরবর্তী অতিরিক্ত রক্তপাত বন্ধ হয়। মাতৃদুগ্ধ দানকারী মায়ের জরায়ু ও স্তনের ক্যান্সার ও মেরুমজ্জার প্রদাহ প্রতিরোধ করে।

তাই সহজেই বলা যায়, মাতৃদুগ্ধ নানা দিক থেকে উপকারী। মায়ের বুকের দুধ শিশুর অধিকার। মায়ের বুকের দুধ শিশুর জন্য আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ামত। কোন অবস্থায় শিশুকে এ অধিকার ও নিয়ামত থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়।

আজকাল মায়েদের বিশেষ করে শিক্ষিত মায়েদের মধ্যে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে একটা অনীহা বা অনাগ্রহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। কৃত্রিম দুধপান করানোটাই যেন অনেকটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। এ ধরনের প্রবণতা ও ফ্যাশন পরিহার করতে হবে। মা ও শিশু’জনের মঙ্গলের কথা ভেবে বুকের দুধ খাওয়াতে মা’দেরকে আগ্রহী হতে হবে। বুকের দুধ হোক মায়ের পক্ষ থেকে সন্তানের জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার। অনেক মা অবশ্য কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত থাকার কারণে শিশুকে বুকের দুধ পান করানোর সময়-সুযোগ পান না। কিন্তু যাদের প্রচুর সুযোগ রয়েছে, তাদের এ সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত নয়। এ ব্যাপারে প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা ও ব্যাপক প্রচারণা। কৃত্রিম দুধের পক্ষে যতো প্রচারণা রয়েছে, মাতৃদুগ্ধের পক্ষে ততোটা জমজমাট প্রচারণা নেই। কারণ, মাতৃদুগ্ধের পক্ষে কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থ নেই। রয়েছে সামাজিক স্বার্থ। সামাজিক স্বার্থেই মায়ের দুধের পক্ষে সচেতনতা সৃষ্টির কার্যক্রম হাতে নিতে হবে।

গণমাধ্যমগুলোকে সোচ্চার হতে হবে মায়ের দুগ্ধ পানের পক্ষে। মাতৃদুগ্ধের পক্ষে সচেতনতা বাড়াতে হবে। মায়ের দুধ হোক শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও ভালবাসার মাধ্যম।

এসএইচএস/আরআই

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।