২০ বছর ধরে এতিমদের ইফতারে প্রচারবিমুখ এক মানুষ
গত ২০ বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও তারই প্রতিনিধি আসেন। ইফতার সামগ্রী দিয়ে দোয়া চেয়ে চলেও গেছেন। কোনো এতিম মুখ তার দর্শন পাননি। নাম-পরিচয়ও জানে না কেউ। প্রায় ২০ বছর ধরে পুরো রমজান মাসে এতিমখানায় ইফতারি দেন তিনি। এবারও দিচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুক্রবার বিকেল পৌনে ৪টায় ইফতার সামগ্রী নিয়ে হাজির তার প্রতিনিধি। বুঝিয়ে দিয়ে চলেও গেলেন লোকটি। তবে এতিম ছেলেমেয়েদের জন্য পবিত্র রমজান মাসে বিত্তবান এ সুহৃদের এই দরদি রেওয়াজে তাই কারো কৌতূহল চোখে পড়লো না।
এ ঘটনা রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানার। বাবা-মা হারানো সমাজের নিঃস্ব, বিপন্ন, অসহায় ছেলেমেয়েরা সেখানে থাকে। পড়াশোনা করে।
এতিমখানাটির ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ নাজমুস সাদাত জাগো নিউজকে বলেন, ১৪৬ জন ছেলে ও ১২১ এতিম মেয়ে এখানে থেকে পড়াশুনা করে।
এবারের রজমানের সময়টা বেশি গরম। তবে খাবারের মানে কম রাখা হচ্ছে না। সন্ধ্যার খাবারে প্রতিদিন থাকছে মাংস ও সেহরিতে মাছ।
তিনি আরো বলেন- প্রতিদিন ইফতারে লেবুর শরবত, খেজুর, ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি ও শসা দেওয়া হবে। মাঝে মধ্যে কলা, মাল্টা ও জিলাপি দেওয়া হয়। প্রকাশ্যে না আসা সেই সুহৃদ লোকটি প্রতিদিন খেজুর, ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, আলুর চপ ও সিঙাড়া পাঠান। এবার তিনি আরো কিছু ভালো খাবারের আইটেম পাঠাবেন বলে জানিয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, এবার ইফতারে ১৫ থেকে ২০ মিনিট আগেই এতিমখানার তদারক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ‘বয়েজ হোম’, ‘গার্লস হোম’, ‘শিশুসদন’ এবং ‘মাদ্রাসা নিবাসে’ ইফতার পাঠিয়ে দেন আলাদা করে। সেখানে সবাই একসঙ্গে বসে ইফতার করে।
স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানার হিসাব সহকারী মো. সালেহ ইসলাম জানান, ‘২০ বছর ধরে এখানে অচেনা সেই মানুষটি ইফতারি দিয়ে যাচ্ছেন। এবারো আমাদের সাথে তিনি লোক মারফত যোগাযোগ করেছেন। এবারো এতিমদের সঙ্গে থাকতে চান তিনি। অথচ আমরা তার নাম পরিচয় কিছুই জানি না। তিনি নিজেকে প্রকাশ করতে চান না বলে শুনেছি।
তিনি আরো জানান, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এতিমদের ইফতারি ও খাবার সরবরাহ করে থাকেন। যেদিন কোনো প্রতিষ্ঠান এতিখানায় ইফতারি দিতে চান সেদিন অচেনা ওই ব্যক্তি নিজের প্রতিনিধিকে ইফতারি সরবরাহ বন্ধ রাখতে বলেন।
এতিমখানাটির সূত্র জানায়, নিজস্ব উৎস এবং সমাজহিতৈষী ব্যক্তিদের সহযোগিতায় পরিচালিত হয়ে আসছে শতাব্দীর প্রাচীন এ এতিমখানাটি। বর্তমানে সাড়ে প্রায় পৌনে তিন শ’ এতিম ছেলেমেয়ে পড়াশোনা করছে এতিমখানার ফরিদউদ্দিন সিদ্দিকী উচ্চবিদ্যালয়, স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা জুনিয়র গার্লস হাইস্কুল ও গোর-ই-শহীদ মাদ্রাসায়।
তবে এতিমখানার খাদ্য বিভাগের ইনচার্জ শাহজাহান আলী বলছেন, এটি সমাজসেবা অধিদফতরের নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান হলেও রমজানে এখানে কোনো সরকারি অনুদান আসেনা।
স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা একটি ঐতিহ্যবাহী বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান। ১৯০৯ সালে ঢাকার তদানীন্তন নবাব স্যার সলিমুল্লাহ বাহাদুর তার বাসভবনে ইসলামী এতিমখানা নামের একটি মুসলিম অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯১৪ সালে নবাব বাহাদুরের মৃত্যুর পর এতিমখানাটি স্থানান্তর করা হয় লালবাগের একটি ভাড়াবাড়িতে। ১৯১৭ সালে এতিমখানাটি বর্তমান ঠিকানা ৪৮, আজিমপুরে স্থানান্তর করা হয়। ১৯২৩ সালে নবাব হাবিবুল্লাহ এর সভাপতি হন। তখন এর নামকরণ করা হয় স্যার সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা।
সমাজের অসহায়, বিপন্ন, এতিম ছেলেমেয়েদের যাবতীয় ভরণপোষণ করে পড়াশুনা শিখিয়ে আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে সলিমুল্লাহ মুসলিম এতিমখানা। সমাজহিতৈষী ব্যক্তিদের সহানুভূতি নির্ভর এ প্রতিষ্ঠান।
রমজান মাসসহ বিভিন্ন সময়ে জাকাত, ফিতরা, সদকা, কাফফারা ও দান-অনুদানের টাকা দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে এ এতিমখানাটি।
জেইউ/এসএইচএস/পিআর