পতাকা উত্তোলন না করায় কুষ্টিয়ার ৫ প্রতিষ্ঠানকে শোকজ
লাল সবুজের পতাকা, পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন। যার ভেতরে লুকিয়ে আছে বাঙালির চেতনা, সংস্কৃতি আর স্বপ্নের বুনন। কুষ্টিয়ার খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতেই সেই লাল সবুজের পতাকার ব্যবহার হয় না। সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি কার্যদিবসে জাতীয় পতাকা তোলার নিয়ম থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। এ যেন বাতির নীচে অন্ধকার।
কুষ্টিয়া জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের কথা দিয়েই শুরু করা যাক। এই প্রতিষ্ঠানে পতাকা উত্তোলনের কোনো স্ট্যান্ড নেই। পতাকা তোলা হয় কিনা জানতে চাওয়া হয় জেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন আহমেদের কাছে। পতাকা তোলার নিয়ম রয়েছে কিনা তাও তিনি জানেন না। একই অবস্থা অফিসের সামনে দুর্নীতি দমন কমিশনের জেলা কার্যালয়, জেলা পরিসংখ্যান অফিসেরও। দৃশ্যটি গত বৃহস্পতিবারের।
এসব দফতরের পাশাপাশি একই পরিণতি কুষ্টিয়া সুগার মিল, এলজিইডি ভবন, সড়ক ও জনপদ অফিস, ২৫০ শয্যার হাসপাতাল, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিস, সিভিল সার্জন কার্যালয়, সমাজ সেবা অধিদফতর, জিকে অফিস, পুলিশ সুপারের কার্যালয়, বিএডিসি অফিস, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরসহ প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই।
এদিকে কুষ্টিয়ায় সরকারি অফিসগুলোতে জাতীয় পতাকা না টাঙানোয় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫টি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করা হয়েছে।
বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক কর্মী অ্যাড. লালিম হক বলেন, একটি জাতির প্রতীক হচ্ছে পতাকা। আমরা যে লাল সবুজের পতাকা বহন করি, হৃদয়ে ধারণ করি তা হচ্ছে আমাদের ৩০ লক্ষ মা, বোনের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার প্রতীক। কিন্তু বিস্ময়ের সঙ্গে জানাতে হচ্ছে আজকাল কোনো সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয় না। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও এমন চিত্র পরিলক্ষিত হয়। আবার পতাকা উত্তোলন করা হলেও তা নামানো হয় না। এটি আমাদের জন্য লজ্জার ও দুঃখের।
তিনি আরো বলেন, সমস্ত প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় পতাকা অবমাননাকারীদের প্রতি অনুরোধ আপনারা জাতীয় পতাকাকে সম্মান করুন, শ্রদ্ধা করুন। দেশ ও জাতিকে গৌরবের শেখরে নিয়ে যান। তাহলেই আপনার সন্তান, আপনার উত্তর প্রজন্ম এদেশ ও জাতির ইতিহাস শিখবে। পতাকার মর্যাদা বুঝবে।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কুষ্টিয়া জেলা শাখার সভাপতি এমএম রাশিব রহমান জাগো নিউজকে বলেন, অনেক আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত পতাকা আমাদের চেতনার প্রতীক হিসেবে বহন করে। আমরা আমাদের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সকল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকার কথা থাকলেও আমরা তা মানি না। এটি আমরা মনে করি চরম ধৃষ্টতার শামিল।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া জজ কোর্টের পিপি অনুপ কুমার নন্দী জাগো নিউজকে বলেন, জাতীয় পতাকা উত্তোলনে সুনির্দিষ্ট আইনই রয়েছে। যে আইনে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। প্রত্যেক কর্মদিবসে ওইসব প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন বাধ্যতামূলক।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডার নাসিম উদ্দিন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, যে পতাকার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ আত্মহুতি দিয়েছেন, ২ লক্ষ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছেন, হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধার অঙ্গহানী হয়েছে। এতসব ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি লাল সবুজের এই পতাকা। সেই পতাকা যে তোলা বাধ্যতামূলক এটাও যদি মানুষকে মনে করিয়ে দিতে হয় তাহলে কোথায় আমরা অবস্থান করছি। এটি আমাদের গোটা জাতির জন্য লজ্জাজনক ব্যাপার। আমি মনে করি, এখন থেকে সকল সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা তোলার পাশাপাশি পতাকার সঠিক মর্যাদা প্রদান করবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান। তা না হলে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
জাতীয় পতাকা শুধু একখণ্ড কাপড় নয়, একটি স্বাধীন দেশের স্বার্বভৌমত্বের নিদর্শন। প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকার বিধি ভাঙার অপরাধে সর্বোচ্চ ১ বছরের জেল অথবা ৫ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা জেল জরিমানার বিধান রয়েছে।
এদিকে যেসব প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা তোলা হয় না এমন ৫টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রদান করেছেন।
বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত, পতাকা এবং প্রতীক আদেশ ১৯৭২ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা কেন সংশ্লিষ্ট অফিসে নিয়মিত জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় না এ সংক্রান্ত ব্যাখ্যা প্রদানের জন্য ওই ৫ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানো নোটিশ প্রদান করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে নির্বাহী প্রকৌশল, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর, উপপরিচালক দুর্নীতি দমন অফিস কুষ্টিয়া, উপপরিচালক পরিসংখ্যান অফিস, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, কুষ্টিয়া সুগার মিল ।
একই সঙ্গে সরকারি আদেশ মোতাবেক এখন থেকে প্রত্যেক অফিসে প্রত্যেক কর্মদিবস এবং জাতীয় দিবসে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য জানানো হয়েছে। অন্যথায় বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও উল্লেখ করা হয় ওই নোটিশে।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, এখন থেকে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা তোলা হবে। যদি কেউ এর ব্যত্যয় ঘটায় তাহলে ওই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এমজেড/আরআইপি