বছরে নষ্ট হয় সাড়ে ৩০ হাজার কোটি টাকার খাদ্যশস্য

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৪৮ পিএম, ১৬ মে ২০১৮
বছরে নষ্ট হয় সাড়ে ৩০ হাজার কোটি টাকার খাদ্যশস্য

চাল, গম, ভুট্টা, পেঁয়াজ, আলু, সব ধরনের ফল ও সবজির উৎপাদন গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছিল প্রায় ৬ কোটি টন। এসব খাদ্যশস্য উৎপাদক থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাতেই নষ্ট হয়েছে প্রায় ৭৭ লখ ৫০ হাজার টন, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

বুধবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘খাদ্যের অপচয় রোধে রাষ্ট্রের ভূমিকা ও খাদ্য অধিকার’ শীর্ষক এক জাতীয় সেমিনারে মূল প্রবন্ধে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

ক্রিশ্চিয়ান এইডের সহায়তায় খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ এই সেমিনারের আয়োজন করে। খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের ভাইস চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদের সভাপতিত্বে সেমিনারে মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরামের (বিজেএএফ) সাধারণ সম্পাদক ও বণিক বার্তার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সাহানোয়ার সাইদ শাহীন।

মূলপ্রবন্ধে তিনি বলেন, এক গবেষণায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে উৎপাদিত শস্যের পোস্ট হারভেস্ট লস ও আর্থিকমূল্য বের করা হয়েছে। খাদ্যশস্য, সবজি ও ফলমূলের ১০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে উৎপাদক থেকে শুরু করে মধ্যস্বত্বভোগী, সংগ্রহকারী, মজুদদার, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীর হাতবদলে।

গড়ে উৎপাদিত শস্যের প্রায় ১৩ শতাংশই নষ্ট হচ্ছে। ক্ষতি হওয়া এসব শস্যের আর্থিকমূল্য মোট বাজেটের প্রায় ১০ শতাংশ। আর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) প্রায় ৩০ শতাংশ।

নষ্ট হওয়া খাদ্যশস্যের মধ্যে চাল ও গমের পরিমাণ প্রায় ৪৫ লাখ টন, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। আলুর পরিমাণ প্রায় ১৫ লাখ টন, যার বাজারমূল্য প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা।

ফল নষ্ট হচ্ছে প্রায় ৮ লাখ টন, যার বাজারমূল্য প্রায় ৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা। প্রায় ১০ লাখ টন সবজি নষ্ট হচ্ছে, যার বাজারমূল্য ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া পেয়াঁজ ও ভুট্টা নষ্ট হচ্ছে প্রায় দেড় লাখ টন, যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৪০০ কোটি টাকা। সবমিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার শস্য নষ্ট হচ্ছে।

দেশের এ অপচয় রোধ করা গেলে খাদ্যশস্য আমদানি শূন্যে কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব বলে জানান সাহানোয়ার সাইদ শাহীন।

খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, খাদ্যশস্যের অপচয় দেশের প্রবৃদ্ধিকে খেয়ে ফেলছে। অপচয়ের মাধ্যমে আমরা মানুষের অধিকার ও খাদ্য নিরাপত্তাকে বাধাগ্রস্ত করছি। এ ধরনের অপচয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি, খাদ্য অধিকারকেও বঞ্চিত করছে। সার্বিকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে পুষ্টি নিরাপত্তাকে। আর দেশের অর্থ ও সম্পদের অপচয়ও হচ্ছে। দরিদ্রতা থেকে মানুষকে উন্নতির যে পরিকল্পনা সেটিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে খাদ্যের অপচয় রোধে রাষ্ট্রের উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন প্রয়োজন। শস্য সংরক্ষণ ও পরিবহনের ক্ষেত্রে ছোট ছোট প্রযুক্তি দ্রুত কৃষকের কাছে পৌঁছাতে হবে। আর কৃষকের ভর্তুকি বাড়াতে হবে।

স্বাগত বক্তব্যে খাদ্য অধিকার বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক এবং ওয়েভ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মহসিন আলী বলেন, দেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ব্যবস্থাপনা, খাদ্যশস্যের সহজলভ্যতা এবং নীতি ও কর্মসূচির যথাযথ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রয়েছে অনেক সীমাবদ্ধতা। খাদ্যের অপচয়ের কারণে খাদ্য ও স্বাস্থ্য নিরাপত্তায় হুমকি হচ্ছে। পণ্যের দাম বাড়ছে। তাই খাদ্য অধিকার আইন প্রণয়ন ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি। পাশাপাশি সরকারের ভর্বুকি কার্যক্রমে প্রযুক্তির দিকে আরও জোর দিতে হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) সাবেক মহাপরিচালক ও হরটেক্স ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কৃষিবিদ মো. মনজুরুল হান্নান বলেন, প্রযুক্তির অভাব, শস্য শুকানোর পদ্ধতিগত ত্টিরু, বিপণন পর্যায়ে দুর্বলতা, সীমিত গুদামজাতকরণ, দুর্বল পরিবহনজাতকরণ এবং প্যাকেজিংয়ের অভাবেই শস্যের অপচয় হচ্ছে। উৎপাদন ক্ষেত্রে অপচয়ের পাশাপাশি খাদ্যগ্রহণের ক্ষেত্রে এ অপচয় রোধ করতে পারলে আমরা ৫ শতাংশ খাদ্য অপচয় কমাতে পারব। সেটি করতে প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও সচেতনতা বাড়াতে হবে।

দেশের নাজুক পুষ্টি পরিস্থিতিতে খাদ্য অপচয় রোধের কোনো বিকল্প নেই জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম বলেন, খাদ্যের অপচয় রোধ করতে পারলে আমরা অধিক সংখ্যক লোকের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারব। পাশাপাশি পুষ্টির যোগান দিতে সক্ষম হব।

এমএ/জেডএ/এমএস