বাংলাদেশে মি-টু নিয়ে সবাইকে মুখ খোলার আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:১৭ পিএম, ১৮ নভেম্বর ২০১৮

যৌন নিপীড়নের শিকার এবং যৌন নিপীড়কদের চিহ্নিত করতে বাংলাদেশের সবাইকে মুখ খোলার আহ্বান জানিয়েছেন নারী নেত্রী ও সাংবাদিক নেতারা। রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক মানববন্ধন থেকে তারা এই আহ্বান জানান। বেলা ১১টা ২০ মিনিট থেকে শুরু হয়ে ঘণ্টাব্যাপী চলে মানববন্ধন।

মানববন্ধনে ‘নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী ও নারী নেত্রী খুশী কবির বলেন, ‘যেসব নারী হ্যাশট্যাগ মি-টু আন্দোলনের অংশ হিসেবে যৌন নিপীড়কদের চরিত্র উন্মোচিত করেছেন তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আমাদের এই সমাজে আমরা একজন রিকশাওয়ালাকে উপযুক্ত সম্মান দেই না, তাকে তুমি বলে সম্বোধন করি। গৃহকর্মীকেও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি। একইভাবে পুরুষরাও নারীকে মানুষ মনে করে না। বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে নারীদের তাচ্ছিল্য করা হয়। সময় এসেছে এখন এগুলোর বিরুদ্ধে কথা বলার। পুরুষদের বলতে চাই, আপনারা আমাদের মানুষ হিসেবে গণ্য করেন, আপনাদের আমরা সমাজ গঠনের সহযোদ্ধা হিসেবে দেখতে চাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘অনেকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠার পর তারা বলেছেন, তাদের স্ত্রীরা ঘরে কান্নাকাটি করে, অশান্তি হয়। আমি বলতে চাই, যখন আপনারা আরেক নারীর গায়ে হাত দিয়েছেন তখন স্ত্রীর কথা চিন্তা করেননি কেন? বাংলাদেশের নারীদের উদ্দেশে আমি বলতে চাই, আপনারা সবাই মুখ খোলেন, আমরা আপনাদের পাশে আছি। নিপীড়ক আর্থিক কিংবা সামাজিক দিক থেকে যতই প্রভাবশালী হোক না কেন তাদের কোনো ছাড় দেয়া হবে না।’

me-too

বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সভাপতি নাসিমুন আরা হক মিনু বলেন, ‘আমরা তাদের স্যালুট জানাই মি টু আন্দোলনের অংশ হিসেবে যারা মুখ খুলেছেন। কারণ তারা সাহস করেছে সেই সাহস আমি পাচ্ছি না। তিন বছর থেকে আমরা এ পর্যন্ত নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছি। নির্যাতনের শিকার হয়নি- এমন মেয়ে নেই।’

নারীর ওপর নির্যাতন, হয়রানি ও লাঞ্ছনা বন্ধের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যারা মুখ খুলেছে তারা সাহসী, আগামীতে তাদের পথ ধরে আরও অনেকে এগিয়ে আসবে। যাদের বিরুদ্ধে নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে তারা যেসব অফিসে কর্মরত আছেন তাদের কর্তৃপক্ষকে বলছি যেন ব্যবস্থা নেয়া হয়।’

মানববন্ধনে একাত্মতা প্রকাশ করে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ শুকুর আলী শুভ বলেন, ‘আমরা যৌন নিপীড়কদের রুখে দিতে চাই, সমাজ থেকে বিতাড়িত করতে চাই। সকলে এসব নিপীড়কের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান, যাতে কেউ নারীকে কুদৃষ্টিতে দেখতে না পারে।’

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাহী সদস্য শেখ মামুনুর রশিদ বলেন, ‘আমরা পুরুষদের পক্ষ থেকে এই মানববন্ধনে সংহতি জানাতে এসেছি। আমি আমার সহকর্মীদের জন্য পরিষ্কার করে দিতে চাই, এ আন্দোলন কোনো পুরুষের বিরুদ্ধে নয়, এটি নিপীড়কদের বিরুদ্ধে। যে কোনো সম্পর্ক যৌথ সম্মতিতে হলে কোনো সমস্যা নেই, তবে যদি কেউ বলপ্রয়োগ বা প্রলোভন দেখিয়ে জোরপূর্বক সম্পর্ক করতে চায় তাহলে সেটির বিরুদ্ধে আমরা রুখে দাঁড়াব। আমাদের উচিত যারা মি-টু (যৌন নিপীড়ন) নিয়ে নিজেদের কথা বলেছে তাদের কালো তালিকাভুক্ত না করে নিপীড়কদের কালো তালিকা তৈরি করা।’

নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের আয়োজনে মানববন্ধনে অংশ নেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও নারী নেত্রীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

me-too

মানববন্ধনের মূল ব্যানারে লেখা ছিল, ‘আমরা #মি’টু আন্দোলনের পক্ষে, আমরা যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে’, ‘নিপীড়িতের পাশে দাঁড়ান, নিপীড়ককে ঘৃণা করুন’।

মানববন্ধনে অংশ নেন যৌন নিপীড়নের শিকারের ৩১ বছর পর মি-টু আন্দোলনে অংশ নেয়া মুশফিকা লাইজু। তিনি বলেন, আমি আমার ঘটনাটি ৩১ বছর পর সবার সামনে এনেছি। আমি গত ১৪ তারিখ পোস্টটি লিখি, কিন্তু এরপর থেকেই আমার ওপর নানাভাবে আঘাত-প্রত্যাঘাত হচ্ছে। আমাকে মিথ্যা প্রমাণের জন্য আমার কয়েকজন নারী বন্ধু আমাকে ফেসবুকে ‘ধর্ষণ’ করে ফেলেছেন অথচ তারাও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আমি একটা কথা বলতে চাই, আপনারা আমার জন্য নয় আপনার কন্যাদের জন্য একটি ভালো পৃথিবী তৈরি করুন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন বলেন, এই ব্যানারের পেছনে নারীরা দাঁড়িয়েছেন। তবে পুরুষরাও যৌন নিপীড়নের শিকার হন। পরিসংখ্যান বলছে, পুরুষরাও পুরুষ দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তাদেরও উচিত মি-টু আন্দোলনের মাধ্যমে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও নিপীড়কদের তুলে ধরা।

নারীদের হিমবাহর সঙ্গে তুলনা করে তিনি আরও বলেন, ‘হিমবাহর একটি ছোট অংশ পানির ওপর থাকে। ছোট্ট একটি অংশ হাজার হাজার জাহাজকে ডুবিয়ে দিতে পারে। নারীদের এ আন্দোলনের কারণে আমরা অনেকের রূপ দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও দেশে যৌনবিরোধী কোনো আইন করা হয়নি, শুধু হাইকোর্টের একটি আদেশ রয়েছে। নারীদের এই যৌন নিপীড়ন বন্ধে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে।’

নারী সাংবাদিক উদিসা ইসলাম বলেন, মি-টু নিয়ে এ পর্যন্ত নয়জন মুখ খুলেছে, এর মানে এই নয় যে আর কেউ এর শিকার হয়নি। দীর্ঘদিন পরে তাদের মুখ খোলার কারণ আগে মুখ খোলার কোনো প্ল্যাটফর্ম ছিল না। এখন তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্ল্যাটফর্ম পেয়েছে। আমি আমার পুরুষ সহকর্মীদের বলব, আপনারা আমাদের এই আন্দোলনের পাশে এসে দাঁড়ান।

me-too

জাতীয় প্রেস ক্লাবের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য মাইনুল আলম বলেন, এ ধরনের আন্দোলন পুরুষ সমাজকে জাগ্রত করবে। আমরা এ আন্দোলনকে স্বাগত জানাই।

নারী সাংবাদিক ফারহানা মিলি বলেন, এখনও সময় আছে যারা যৌন নিপীড়ন করেছেন তারা নিজেরাই নিজেদের ভুল শিকার করুন। সবার সামনে বলুন যে, আপনারা যা করেছেন আপনার ছেলে যেন এরকম না করে সেই শিক্ষা দিচ্ছেন।

এআর/এমবিআর/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :