অরিত্রির মৃত্যু, শুধুই আত্মহত্যা?

জসীম উদ্দীন
জসীম উদ্দীন জসীম উদ্দীন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:২২ পিএম, ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮

ভিকারুননিসা নূন স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রি অধিকারীর মৃত্যু নিছকই আত্মহত্যা, নাকি নেপথ্যে অন্য কারো দায় আছে? এমন প্রশ্ন তুলে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়েছেন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা।

তাদের দাবি, এর আগে আরও অনেক গভর্নিং বডির সদস্য ছিল, প্রিন্সিপাল-ভাইস প্রিন্সিপাল ছিল। কিন্তু তাদের আমলে এভাবে কোনো শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেনি। অরিত্রী অধিকারী কেন আত্মহত্যা করেছে?

আত্মহত্যায় প্ররোচনা, শিক্ষার্থীর অভিভাবককে অপমান ও পরীক্ষার খাতায় কম নাম্বার দেয়ার হুমকির ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ভেঙে দেয়াসহ প্রিন্সিপাল-ভাইস প্রিন্সিপালের অপসারণ দাবি করেছেন তারা। এজন্য বিভিন্ন দাবি দাওয়া সম্বলিত প্লাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভ করছেন তারা। সর্বশেষ মঙ্গলবার বিকেল সোয়া ৩টার দিকেও তাদের বিক্ষোভ করতে দেখা যায়।

দশম শ্রেণির ছাত্রী সুহানা বলছিলেন, মোবাইলের মাধ্যমে নকল করার অভিযোগে অরিত্রিকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়। পরের দিন অরিত্রির বাবা-মাকে প্রতিষ্ঠানে ডেকে পাঠানো হয়। মা-বাবাকে অপমান করা হয় অরিত্রির সামনেই। এরপর অরিত্রি সহ্য করতে না পেরে বেরিয়ে যায়। বাইরে জানালা দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে ছিল অরিত্রি। ভেতরে অরিত্রি দেখতে পায় তার বাবা শিক্ষকের পা জড়িয়ে ধরেছেন। এরপর কান্না করতে করতে বাড়ি চলে যায় সে। দরজা বন্ধ করে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করে অরিত্রী।

Oritri-s

সুহানার মতো একাধিক শিক্ষার্থীরা দাবি, এর আগে কখনও কোনো অরিত্রিকে আত্মহত্যা করতে শুনিনি, দেখিওনি। আজ কেন এসব হচ্ছে? এর একটা বিহিত জরুরি।

বাবা-মাকে অপমান করে শিক্ষার্থী অরিত্রি অধিকারীকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয়ায় ঘটনায় ইতোমধ্যে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঘটনা তদন্তে এবার আরেক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। তদন্ত কমিটি অরিত্রির আত্মহত্যার বিষয়টি তদন্তের পাশাপাশি ভিকারুননিসা নূন স্কুলে শৃঙ্খলা বজায় রয়েছে কি-না সেটি খতিয়ে দেখবে।

মঙ্গলবার সকালে ঢাকা বোর্ডের স্কুল পরিদর্শক প্রীতিশ কুমার সরকারকে নিয়ে ১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান মু. জিয়াউল হক জাগো নিউজকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

অন্যদিকে অরিত্রি অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির প্রভাতী শাখার প্রধান জিনাত আরাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেয়া হয়েছে বলে জানান স্কুলের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান গোলাম আশরাফ তালুকদার।

Oritri

শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাউশির তদন্ত কমিটি গঠন ও প্রভাতী শাখার প্রধান জিনাত আরাকে বরখাস্তের সিদ্ধান্তেও আস্থাহীন অভিভাবকবৃন্দ। সকাল থেকে অরিত্রির আত্মহত্যার ঘটনায় দায়ীদের শাস্তির দাবিতে উত্তাল ভিকারুন্নেসা নূন স্কুল। মঙ্গলবার বিকেলে ফের বিক্ষোভ শুরু করেন তারা। ‘বিচার চাইলেই টিসি কেন’, ‘আর কোনো অরিত্রি চাই না’, ‘এ কেমন শিক্ষা যার জন্য শিক্ষার্থীকে জীবন দিতে হয়’, ‘প্রচলিত আইনে বিচার চাই’, ‘এ কী শুধু আত্মহত্যা?’ ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভ করছেন তারা।

আফরুজা খাতুন নামে এক অভিভাবক বলেন, নবম শ্রেণির ছাত্রী কি কারণে আত্মহত্যা করতে পারে। আত্মহত্যা করলেই প্রেম-ভালবাসাজনিত কারণ ঠিক নয়। আর এবার অরিত্রির ঘটনাটি তো স্পষ্ট। এরপরও কি আমরা শুধুই আত্মহত্যা বলব এই ঘটনাকে? দীর্ঘদিনের বিচারহীনতাই আজ আমাদের এই অবস্থায় নিয়ে এসেছে।

এর আগে সোমবার দুপুরে রাজধানীর শান্তিনগরের নিজ বাসায় ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দেয় অরিত্রি। মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল (ঢামেক) কলেজ হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। অরিত্রির পরিবারের দাবি, রোববার সমাজবিজ্ঞান পরীক্ষা চলার সময় তার কাছে একটি মোবাইল ফোন পাওয়া যায়। এজন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ তার বাবা-মাকে ডেকে পাঠায়। তারা সোমবার স্কুলে গেলে স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের জানায়, অরিত্রি মোবাইল ফোনে নকল করছিল, তাই তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের (টিসি) সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ মেয়ের সামনে মা-বাবাকে অনেক অপমান করে। এই অপমান এবং পরীক্ষা আর দিতে না পারার মানসিক আঘাত সইতে না পেরে সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। বাসায় ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দেয় অরিত্রি।

জেইউ/এমএমজেড/এমএস