ওয়াসার ১১ দুর্নীতির উৎস পেয়েছে দুদক

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:৩৯ পিএম, ১৮ জুলাই ২০১৯

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গঠিত প্রতিষ্ঠানিক টিম ওয়াসার ১১টি দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করেছে। একই সঙ্গে এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে ১২ দফা সুপারিশও করেছে দুদক।

বৃহস্পতিবার (১৮ জুলাই) সচিবালয়ে এসে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলামের হাতে তুলে দেন দুদক কমিশনার মো. মোজাম্মেল হক খান।

দুদক কমিশনার সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা ওয়াসা নিয়ে সমীক্ষা করে দেখেছি, এখানে প্রায় ১১টি জায়গায় দুর্নীতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বা হয়েছে। এর বিপরীতে আমরা ১২টি সুপারিশ লিপিবদ্ধ করেছি। তবে এগুলো এমন অকাট্য কোনো বিষয় নয়, এ সংখ্যা আমরা কমাতে বা বাড়াতেও পারতাম।’

মোজাম্মেল হক খান বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করে তাদের যে সব জায়গায় দুর্নীতির সুযোগ রয়েছে বা যেসব জায়গায় দুর্নীতি ঘটে বলে বিভিন্ন ধরনের তথ্য রয়েছে এর ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন আমরা তৈরি করেছি।’

তিনি বলেন, ‘এটা বিশাল কোনো গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। এটা আমাদের কর্মকর্তারা করেছেন। তবে যেগুলো বলেছি তা খণ্ডন করারও কিছু নেই। এগুলো বাস্তব কথাবার্তা।’

কমিশনার স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘আমরা সেই (দুর্নীতির উৎস) কথাগুলোই আপনার জ্ঞাতার্থে বলতে চাই। যাতে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের একটু সংবেদশীল করতে পারেন, এ জায়গাগুলোতে যদি তারা নজর দেন, তাহলে এগুলো তো সংশোধন হবে এবং ভবিষ্যতে সমরূপ প্রকৃতির প্রজেক্ট বা কার্যক্রমগুলো নেয়া হবে সেখানে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে না।’

ACC-wasa

দুর্নীতি প্রতিরোধমূলক কাজের অংশ হিসেবে ২৫টি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি হতে পারে এমন জায়গায় দুদক নজরদারি করছে জানিয়ে কমিশনার বলেন, ‘এজন্য গঠিত দুদকের প্রতিষ্ঠানিক টিম অতীতের রেকর্ডপত্র, বার্ষিক প্রতিবেদন, স্টেক হোল্ডারদের মতামত, বিদ্যমান আইনকানুন, ওইসব বিভাগে যারা কর্মরত আছেন তাদের সরঙ্গ মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে এ প্রতিবেদন তৈরি করেছে।’

ইতোমধ্যে ১৩টি দফতরের প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। মোজাম্মেল হক খান বলেন, ‘পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ওয়াশ রুমের পানি পানযোগ্য, কিন্তু আমাদের দেশে ওয়াসার পানি ওই পর্যায়ে নিতে পারিনি।’

এ সময় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন, ‘দুদক থেকে আমাদের যে স্টাডি রিপোর্টটা দিয়েছে এবং ওনারা যেসব ফাইন্ডিং দিয়েছেন সেগুলো আমরা তদন্ত করব, খতিয়ে দেখব। এখানে দুর্নীতি বা কারও শৈথিল্য বা দায়িত্বহীনতার পরিচয় যেখানে পাওয়া যাবে অবশ্যই আমার সেখানে কার্যকরী ভূমিকা পালন করব।’

তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমি প্রজেক্টের টাইমলাইন ও বাস্তবায়ন নিয়ে মিটিং করি। কয়েক দিন আগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের সব পিডিকে নিয়ে মিটিং করেছিলাম। সেখানে ২৩টি প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি অসন্তোষজনক, আমি প্রত্যেকটি পিডিকে দাঁড় করিয়ে তাদের বক্তব্য শুনেছি, কারণগুলো ব্যাখ্যা করার জন্য বলেছি।’

তিনি বলেন, ‘একজন পিডি সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে না পারার কারণে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রকল্প থেকে প্রত্যাহার করে আরেকজনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।’

দুর্নীতির উৎস

দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের শেষ না করে বিভিন্ন অজুহাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সীমা ও প্রকল্প ব্যয় বাড়ানো হয়। এক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকসহ প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী এবং ওয়াসার ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন হয় না বলে জনশ্রুতি আছে বলে প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।

মিরপুর এলাকায় পানির চাহিদাপূরণে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা হ্রাসকরণ প্রকল্প, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে নেয়া অন্তর্বর্তীকালীন পানি সরবরাহ প্রকল্প, সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার (ফেইজ-৩) প্রকল্প, পদ্মা (যশলদিয়া) পানি শোধনাগার (ফেইজ-১) প্রকল্প, ঢাকা এনভায়রনমেন্ট সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্প, দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্প, ঢাকা মহানগরীর আগারগাঁও এলাকায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রকল্প, ঢাকা পানি সরবরাহ নেটওয়ার্ক উন্নয়ন প্রকল্পের দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র তুলে ধরেন দুদক কমিশনার।

এ ছাড়া ওয়াসার বিভিন্ন প্রকল্পের পরামর্শক ও ঠিকাদার নির্বাচন; ব্যক্তিমালিকানাধীন গভীর নলকূপ স্থাপন, মিটার রিডিং ও রাজস্ব আদায় এবং ওয়াসা কর্মচারীদের ওভারটাইম বিলে দুর্নীতি হচ্ছে বলেও জানান মোজাম্মেল হক খান।

সুপারিশ

ঢাকা ওয়াসার চলমান প্রকল্পগুলোর বিভিন্ন অনিয়ম দুর্নীতি বা অর্থ অপচয় রোধে বিভিন্ন প্রকৌশল সংস্থার অভিজ্ঞ প্রকৌশলীর সমন্বয়ে যৌথ পরিমাপ টিম ও মনিটরিং টিম গঠন করা যেতে পারে। প্রকল্পের প্রাক্কলন তৈরির সময় কাজের যথার্থতা ও উপযোগিতা আছে কিনা-তা ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত হতে হবে এবং বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় যাতে অহেতুক না বাড়ানা হয় সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি আরোপ করা প্রয়োজন।

দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মূল্যায়ন কমিটিতে দাতা সংস্থার প্রতিনিধিসহ টেন্ডার ও ক্রয়কার্য যথাযথ হচ্ছে কিনা-তা মনিটরিং করার জন্য মন্ত্রণালয় ভিত্তিক শক্তিশালী টিম গঠন করা যেতে পারে।

প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের সময় ওয়াসার ঊধ্র্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার প্রকল্প পরিদর্শনসহ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা গ্রহণ করা যেতে পারে। ঠিকাদারকে বিল পরিশোধের আগে সুনিশ্চিত হতে হবে যে, দরপত্রের শর্তানুযায়ী ঠিকাদার প্রকল্প কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করেছেন। এ ছাড়া ঠিকাদার যতটুকু কাজ করছেন তার গুণগত মান যাচাই করে বিল পরিশোধ করা যেতে পারে।

ব্যক্তি মালিকানাধীন গভীর নলকূপ স্থাপন, মিটার রিডিং ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ওয়াসার ম্যানুয়াল পদ্ধতির ব্যবহার পরিহার করে সহজ ডিজিটাল পদ্ধতিতে মিটার রিডিংয়ের ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।

অবৈধ ওভারটাইম বিল রোধে ঢাকা ওয়াসার কর্মচারীদের জনবল কাঠামো সুনির্দিষ্ট করা প্রয়োজন এবং বেতনের সাথে ওভারটাইম বিলের সমন্বয়সাধনসহ সুর্নিদিষ্ট বিধিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

প্রকল্পকাজ বাস্তবায়নের জন্য ঢাকা ওয়াসার কাজে সম্পর্কিত অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, যেমন : ঢাকা সিটি কর্পোরেশন, সওজ, বিদ্যুৎ বিভাগ ইত্যাদির সঙ্গে সুষ্ঠু সমন্বয় সাধন করা প্রয়োজন।

ঢাকা ওয়াসার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনতে গণমাধ্যম, দুদক, অডিট ডিপার্টমেন্টসহ নজরদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে সেবা গ্রহিতাদের নিয়ে ঢাকা ওয়াসায় মাঝে মাঝে গণশুনানির আয়োজন করা যেতে পারে। ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নাধীন অবস্থায় বিভিন্ন প্রকৌশলী সংস্থার বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত সার্ভিলেন্স টিমের আকস্মিক অভিযান পরিচালনা করা যেতে পারে।

বিভিন্ন প্রকার ক্রয়ে প্রতিযোগিতামূলক প্রকাশ্য বা ই-টেন্ডারিং, দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে কার্যাদেশ প্রদান ও প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় অভিজ্ঞ সিনিয়র কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব প্রদান করা যেতে পারে। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় বুয়েটসহ অন্যান্য পেশাদার সংস্থাকে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে বলেও সুপারিশ দিয়েছে দুদক।

আরএমএম/এমএসএইচ/এনডিএস/জেআইএম