মিয়ানমারে ফিরতে রোহিঙ্গাদের ‘চার’ দাবি

সায়ীদ আলমগীর
সায়ীদ আলমগীর সায়ীদ আলমগীর কক্সবাজার
প্রকাশিত: ১০:০৯ পিএম, ২০ আগস্ট ২০১৯

নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, বসতভিটাসহ সম্পদ ফেরত ও নিপীড়নের বিচার নিশ্চিত না হলে মিয়ানমারে ফিরতে নারাজ রোহিঙ্গারা। প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার সরকার কর্তৃক স্বীকৃত রোহিঙ্গারা জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা- ইউএনএইচসিআর এবং শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার- আরআরআরসি কার্যালয়ের প্রতিনিধিদের কাছে সাক্ষাৎকারে এমনটি জানিয়েছেন।

সাক্ষাৎকার শেষে হলরুম থেকে বের হওয়া ২৬ নম্বর ক্যাম্পের এ-ব্লকের বাসিন্দা মুহাম্মদ রিয়াজ (৩২), রশিদ আমিন (৪৫) ও আই-ব্লকের হোসেন আহমদ (৫২) এমন তথ্য জানান। রোহিঙ্গাদের এসব দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন শালবাগানের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ (সিআইসি) মোহাম্মদ খালেদ হোসেন।

এর আগেও রোহিঙ্গারা সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের দাবি করেন। বিশেষ করে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সরব হয় মিয়ানমার সরকার। এরই বহিঃপ্রকাশ আগামী ২২ আগস্ট তিন হাজার ৪৫০ জন রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে রাজি হওয়া। এটি বাস্তবায়নে দুই দেশের মাঝে চলছে তোড়জোড়ও। এসব কারণে সম্মানজনক প্রত্যাবসনে আশাবাদী হন তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গারা। সম্প্রতি ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে তারা জানান, সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা আছে রোহিঙ্গাদের। তারা মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখলে রোহিঙ্গারা নাগরিকত্ব নিয়ে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারবেন।

rohinga

মঙ্গলবার (২০ আগস্ট) দুপুর ১টা থেকে টেকনাফের শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরে নির্মিত ক্যাম্প ইনচার্জের হলরুমে সাক্ষাৎকার দিতে আসেন তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গারা।

সিআইসি মোহাম্মদ খালেদ হোসেন জানান, মঙ্গলবার সকাল থেকে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার বিষয়ে মতামত জানানোর কথা ছিল তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গাদের। কিন্তু দুপুর পর্যন্ত শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরে নির্ধারিত স্থানে সাক্ষাৎকার দিতে আসেননি তাদের কেউ। পরে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা- ইউএনএইচসিআর এবং শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার- আরআরআরসি কার্যালয়ের প্রতিনিধিরা তাদের সাক্ষাৎকার দিতে আসার জন্য উৎসাহিত করার চেষ্টা করেন। এরপর একেকটি পরিবার আলাদাভাবে সাক্ষাৎকার দিতে আসেন। প্রায় প্রতিটি পরিবারের সদস্যরা অভিন্ন দাবি উত্তাপন করেন। এসব দাবি মানা হলে তারা যেকোনো সময়ই ফিরে যেতে প্রস্তুত বলে জানান।

সাক্ষাৎকারে ২১ পরিবারের নেতৃত্ব দেয়া ২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ মো. বজরুস আলম বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রধান দাবি, রোহিঙ্গা হিসেবেই তাদের নাগরিকত্ব দেয়া। পাশাপাশি মিয়ানমারের মাব্রাই দীর্ঘদিন ধরে বন্দি এক লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকেও মুক্তির ব্যবস্থার দাবি জানানো হয়েছে। এছাড়া এপার থেকে যারা যাবেন, তারা ওপারের কোনো ক্যাম্পে নয়, সরাসরি নিজেদের পুরনো বসতভিটায় যেতে পারার মতো ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় মিয়ানমারে ফিরে গিয়ে কোনো লাভ নেই বলে তালিকায় নাম থাকা রোহিঙ্গারা অভিমত প্রকাশ করেছেন।

সাক্ষাৎকার দিয়ে বের হয়ে আসা মুহাম্মদ রিয়াজ (৩২), রশিদ আমিন (৪৫) ও হোসেন আহমদ (৫২) জানান, দোদুল্যমান অবস্থায় মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাই না। মিয়ানমারে আমাদের ওপর চালানো নিপীড়নের বিচার করতে হবে, সম্পত্তি ফেরতের পাশাপাশি নাগরিকত্ব দিতে হবে। এরপরই আমরা ফেরত যাব।

rohinga

ঘদিও সবধরনের প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও পূর্বের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করেনি মিয়ানমার। এবারও হঠাৎ করে তিন হাজার ৪৫০ জনকে ফেরত নিতে রাজি হয়েছে দেশটি। বারবার কথা না রাখার রেকর্ড আছে মিয়ানমারের। এবারও ‘শঙ্কা’ নিয়েই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ। মাঠপর্যায়ে সবধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

২০১৭ সালে ২৫ আগস্টের পর রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন শুরু করে দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। পুরনো ও নতুন মিলিয়ে এখন উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি শিবিরে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গার অবস্থান।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, উখিয়া-টেকনাফে আশ্রিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫৭। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। জাতিগত নিধন ও গণহত্যার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। কিন্তু একাধিকবার সময় নির্ধারণ করেও রোহিঙ্গাদের দাবি পূরণ না হওয়ায় প্রত্যাবাসন শুরু করা যায়নি।

এদিকে, রাখাইনে সেনাবাহিনী, বিজিপি, উগ্রপন্থী রাখাইন যুবকদের নির্যাতনে বাস্তুচ্যুত হয়ে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের সাক্ষাৎকার নিতে উখিয়ার শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শন করেন মিয়ানমার সরকার কর্তৃক গঠিত ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট কমিশন অব ইনকোয়ারি (আইসিআই)’র একটি টিম।

rohinga

আইসিআই দলটি মঙ্গলবার বালুখালী ৯নং ক্যাম্পের ৬টি ব্লক, জি-১৮, জি- ১৯, জি-২০, জি-১, সি-১, সি-২ ব্লকের বিভিন্ন বাসস্থান ঘুরে দেখেন। একই সাথে জামতলী ক্যাম্পও পরিদর্শন করেন তারা। রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে প্রতিনিধি দল বালুখালী ক্যাম্পের ইনচার্জ শেখ হাফিজুল ইসলামের কার্যালয়ে আধাঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন। কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।

রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে আসা দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ফিলিপাইনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী রোজারিও মানালো। সদস্যরা হলেন- মিয়ানমারের সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান মিয়া থেইন, জাতিসংঘে জাপানের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি কেনজো ওশিমা, ইউনিসেফের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ড. অন তুন থেট, প্রফেসর ইউশিহিরো নাকানিশি ও লিনা ঘোষ।

গতকাল সোমবার বেলা ১১টার দিকে দলটি কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছান। সেখান থেকে রয়েল টিউলিপ হোটেলে বিশ্রাম নিয়ে দুপুর ২টার দিকে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালামের সঙ্গে বৈঠকে বসেছেন। সেখান থেকে তারা ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করে মঙ্গলবার ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। এরা ফিরে গেলে ‘এভিডেন্স কালেকশন এবং ভেরিফিকেশন’ নামের আরও একটি প্রতিনিধিদল ক্যাম্পে আসবেন বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম।

সায়ীদ আলমগীর/এমএআর/জেআইএম