৭ মার্চের সকাল: সংবাদপত্রের পাতায় ঝড়ের পূর্বাভাস
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ, দিনটি ছিল রোববার। বাঙালির ইতিহাসের এক চূড়ান্ত মাহেন্দ্রক্ষণ। তবে ইতিহাসে অমর হয়ে থাকা বিকেলের ভাষণের আগে সেদিনের সকাল ছিল অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক কৌশলের এক জটিল সময়। ঢাকার রাস্তাঘাটে যেমন উত্তেজনা ও থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছিল, তেমনই মানুষের হাতে থাকা সকালের সংবাদপত্রগুলোতেও ফুটে উঠেছিল সেই অস্থির সময়ের প্রতিচ্ছবি।
আগের দিন ৬ মার্চ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান রেডিও ভাষণে আকস্মিকভাবে ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের ঘোষণা দেন। তার এই ঘোষণার পর পুরো দেশজুড়ে নতুন রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ শুরু হয়। ফলে ৭ মার্চের সকালের পত্রিকাগুলো হয়ে ওঠে একদিকে রাজনৈতিক কৌশলের প্রতিফলন, অন্যদিকে বিকেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কী ঘোষণা দেবেন- সেই প্রতীক্ষার দলিল।
‘২৫শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান’ শিরোনামে রাজনৈতিক চাল
সেদিন ঢাকা থেকে প্রকাশিত জনপ্রিয় পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ছিল- ‘২৫শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান: আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটির জরুরি বৈঠক’। ইয়াহিয়া খানের ঘোষণার খবরটিকেই পত্রিকাটি প্রধান গুরুত্ব দিয়েছিল। কারণ, এটি ছিল সামরিক সরকারের নতুন রাজনৈতিক পদক্ষেপ, যা পরিস্থিতিকে সাময়িকভাবে আলোচনার পথে ফেরানোর একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
সংবাদে জানানো হয়, এই ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। একই সঙ্গে উল্লেখ করা হয় যে বিকেলে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে অনুষ্ঠিতব্য জনসভায় বঙ্গবন্ধু তার পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান ও সিদ্ধান্ত জাতির সামনে তুলে ধরবেন। ফলে সকালের পত্রিকা পড়েই মানুষ বুঝতে পারছিল, বিকেলের জনসভাটি হতে যাচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংবাদপত্রের পাতায়ও থমথমে পরিবেশ
৭ মার্চের পত্রিকাগুলো পড়লে স্পষ্ট বোঝা যায় যে সংবাদমাধ্যম তখন এক ধরনের চাপা উত্তেজনার মধ্যে কাজ করছিল। সামরিক শাসনের কঠোর সেন্সরশিপ থাকায় অনেক বিষয় সরাসরি বলা সম্ভব ছিল না, কিন্তু সংবাদ ও বিশ্লেষণের ভেতর দিয়ে পরিস্থিতির গুরুত্ব পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছিল।
সরকারি ঘরানার দৈনিক মর্নিং নিউজ বা অন্যান্য পত্রিকাগুলো পরিস্থিতিকে তুলনামূলক সংযত ভাষায় তুলে ধরলেও জনসভার প্রস্তুতি এবং রাজনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনার খবর প্রকাশ করেছিল।

অন্যদিকে ইংরেজি দৈনিক পাকিস্তান অবজারভার সম্পাদকীয় ও বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছিল যে সেদিন পুরো বিশ্বের দৃষ্টি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের দিকে নিবদ্ধ। বিদেশি সাংবাদিকদের ঢাকায় অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের আগ্রহের বিষয়টিও সেদিনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল।
বিজ্ঞাপনেও প্রতিবাদের ভাষা
৭ মার্চের পত্রিকাগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল সাধারণ মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ। সংবাদপত্রের পাতায় বিভিন্ন সংগঠন, পেশাজীবী গোষ্ঠী এবং প্রতিষ্ঠান ছোট ছোট বিজ্ঞপ্তি ও বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে জনগণকে বিকেলের জনসভায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল।
বিভিন্ন ব্যবসায়ী সমিতি তাদের বিজ্ঞপ্তিতে ঘোষণা দিয়েছিল যে তারা অসহযোগ আন্দোলনের সমর্থনে দোকানপাট বন্ধ রাখবে। ছাত্র সংগঠনগুলো জনগণকে দলে দলে রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। একইভাবে শিল্পী, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীরাও আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে বার্তা প্রকাশ করেছিলেন।
এসব বিজ্ঞাপন ও আহ্বান থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে- সংবাদপত্র তখন শুধু তথ্য প্রচারের মাধ্যম ছিল না; আন্দোলনের সামাজিক সংগঠক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিল।
সম্পাদকীয়তে সাংকেতিক বার্তা
সেদিনের সম্পাদকীয়গুলো পড়লে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে, সরাসরি রাজনৈতিক ঘোষণা না থাকলেও জনগণের উদ্দেশ্যে এক ধরনের সাংকেতিক বার্তা দেওয়া হচ্ছিল। সংবাদপত্রগুলো জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানালেও একই সঙ্গে পরিস্থিতির গুরুত্ব এবং ঐতিহাসিক দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল।
আরও পড়ুন
রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ, স্বাধীনতার ডাক
ইয়াহিয়ার ভাষণ, উত্তাল বাংলা ৭ মার্চের অপেক্ষায়
এই ভাষা ছিল অত্যন্ত সাবধানী। কারণ তখন সামরিক শাসনের অধীনে সংবাদপত্রগুলোকে কঠোর সেন্সরশিপের মধ্য দিয়ে প্রকাশ হতে হতো। ফলে সম্পাদকীয় ভাষায় ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য এবং প্রতীকী শব্দচয়ন ব্যবহার করে পাঠকদের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছিল।
একটি ঐতিহাসিক বৈপরীত্য
৭ মার্চের সকালের পত্রিকার সঙ্গে সেদিন বিকেলের ঘটনার এক আশ্চর্য বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায়। সকালের পত্রিকাগুলোতে আলোচনার সম্ভাবনা, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন এবং রাজনৈতিক সমঝোতার ইঙ্গিত ছিল।
কিন্তু বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ভাষণে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।
এই ভাষণের মাধ্যমে কার্যত পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতরে সমাধানের পথ ভেঙে দিয়ে বাঙালি জাতির স্বাধীনতার সংগ্রামের পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়। এই ভাষণই পরবর্তীতে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম প্রধান দিকনির্দেশনা হয়ে ওঠে।
৭ মার্চ বনাম ৮ মার্চের পত্রিকা
৭ মার্চের সকালের পত্রিকা এবং ৮ মার্চের পত্রিকার মধ্যে ছিল এক আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
৭ মার্চের সকালে পত্রিকাগুলো প্রধানত সরকারি ঘোষণা, বৈঠক এবং রাজনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনার খবর প্রকাশ করেছিল। কিন্তু ৮ মার্চের সকালে চিত্র সম্পূর্ণ বদলে যায়। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের বক্তব্যই হয়ে ওঠে প্রধান শিরোনাম।

বিশেষ করে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত সেই কালজয়ী শিরোনাম- ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ হয়ে ওঠে সংগ্রামী বাঙালির কণ্ঠস্বর।
রেডিও সম্প্রচারের বাধা এবং পত্রিকার ভূমিকা
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাকিস্তান সরকার নিয়ন্ত্রিত বেতার কেন্দ্র পাকিস্তান বেতার সেদিন বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সরাসরি প্রচার করতে দেয়নি। ফলে সেই ঐতিহাসিক ভাষণ তৎক্ষণাৎ সারা দেশে শোনা সম্ভব হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে ৮ মার্চ প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলোই সাধারণ মানুষের জন্য সেই ভাষণের প্রধান লিখিত দলিল হয়ে ওঠে। অনেক মানুষ পরদিন পত্রিকা পড়ে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ ভাষণের বক্তব্য জানতে পারেন।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চের সকালের সংবাদপত্রগুলো ছিল যেন ঝড়ের আগের স্তব্ধতা। একদিকে পাকিস্তান সরকারের রাজনৈতিক চাল, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান; অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় অবস্থান এবং বাঙালি জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা।
এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাঙালি জাতি সেদিন সকালের পত্রিকা পড়ে বিকেলের সেই বজ্রকণ্ঠ শোনার জন্য প্রস্তুত হয়েছিল। ৭ মার্চের পত্রিকা ছিল অপেক্ষার দলিল, আর ৮ মার্চের পত্রিকা হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার সংগ্রামের ঘোষণা।
এমডিএএ/কেএসআর