ক্ষতিপূরণ চেয়ে হুমকি পাচ্ছেন আলজেরিয়াফেরত কর্মীরা

জেসমিন পাপড়ি
জেসমিন পাপড়ি জেসমিন পাপড়ি , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:১৭ পিএম, ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯

প্রায় ৫০ হাজার টাকা বেতনের প্রতিশ্রুতি পেয়ে আর ইউরোপে যাওয়ার সুযোগের প্রলোভনে আলজেরিয়ায় গিয়ে মাত্র সাত মাসের মাথায় দেশে ফিরতে বাধ্য হন নয় জন। দেশে ফিরে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে ক্ষতিপূরণ দাবি করেন তারা।

তাদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২৭ নভেম্বর অভিযুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সি বন্যা বিজয় ওভারসিজ ও মুন্সিগঞ্জের সিঙ্গাপুর স্কিল ট্রেনিং সেন্টারের লাইসেন্স স্থগিত করে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক মন্ত্রণালয়। আর এজন্য এখন নানা ধরনের হুমকি পেতে হচ্ছে আলজেরিয়াফেরত মানিকগঞ্জের মো. জসিমসহ অভিযোগকারীদের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আলজেরিয়াফেরত একজন জাগো নিউজকে বলেন, ‘টাকা ঋণ করে বিদেশে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানে অমানসিক নির্যাতন সইতে না পেরে পরিবারের পাঠানো টাকায় দেশে ফিরে আসি। কিন্তু দেশে ফিরে এখন ঋণের চাপে আছি। টাকা ফেরত চেয়ে দালালদের ফোন দিলে তারা উল্টো হুমকি দেয়।’

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে ফোনে হুমকি দেয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এই বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজিন্সগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছি। আমাকে বলা হচ্ছে এটা নিয়ে আর এগুবি না।’

আলজেরিয়াফেরত আরেক কর্মী বলছিলেন, ‘আমরা নিরীহ মানুষ। ওদের সাথে কি পেরে উঠবো? ওরা শুরুতে বলেছিল আমাদের ক্ষতিপূরণ দেবে। জানি না সেটা আদৌ পাবো কিনা।’

উল্লেখ্য, রিক্রুটিং এজেন্সির প্রলোভনে পড়ে সংসারে সুদিন ফেরানোর আশায় আলজেরিয়ায় গেলেও সেখানে নির্যাতনের মুখে পড়েন এই বাংলাদেশিরা। পরে পরিবারের পাঠানো টাকায় প্লেনের টিকিট কেটে গত ২৭ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়া থেকে দেশে ফিরে আসেন নয় জন। তবে রিক্রুটিং এজেন্সির স্পেনে পাঠানোর প্রলোভনে পা দিয়ে মরক্কোয় অবস্থান করছেন চার বাংলাদেশি। এমন প্রলোভনে পড়ে আলজেরিয়ায় মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন আরও ২২ জন। যদিও এক ভিডিওবার্তায় দেশে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানান তারা।

নভেম্বরের মাঝামাঝিতে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে জাগো নিউজ। এর পরিপ্রেক্ষিতে আলজেরিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ওই ২২ জনকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে তাদের কেউ এখনো দেশে ফিরতে পারেননি।

আলজেরিয়া থেকে শেখ সুমন জাগো নিউজকে বলেন, ‘কোম্পানি কিছু লোককে বের করে দিয়েছে। কিছু লোককে রাখলেও কাজ দেয় না। তাদের বেতন নেই। খাবার দেওয়া হয় না দিনের পর দিন। ভিডিওবার্তা পাঠানোয় এবং প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করার কারণেই এই নির্যাতন করা হচ্ছে।’

‘এদিকে অর্থের অভাবে দেশেও ফিরতে পারছি না। এমন অবস্থায় প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও রাস্তায় রাত কাটাতে হচ্ছে বাংলাদেশি কর্মীদের।’- বলেন সুমন। তিনি দ্রুত তাদের দেশে ফেরানোর আকুতিও জানান।

সুমনের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘১০ মাসে মাত্র ৮০ হাজার টাকা সুমন পাঠাতে পেরেছে। এখন তো সেখানে সে জন্ডিসে আক্রান্ত হয়েছে। কাজও নেই। এদিকে অর্থের অভাবে তাকে দেশে ফেরত আনতেও পারছি না।’

তবে আলজেরিয়াফেরত কর্মীদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ অভিযোগ অস্বীকার করে বন্যা বিজয় ওভারসিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) বরুণ দেবনাথ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আলজেরিয়া থেকে ফেরত আসা কর্মীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য সেখানকার কোম্পানির সাথে আলোচনা চালাচ্ছি। বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য আলজেরিয়া থেকে কোম্পানির একজন প্রতিনিধিও এখন বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। তাকে নিয়ে আমরা মন্ত্রণালয়ের সাথে বৈঠক করবো।’

আলজেরিয়ায় যে কর্মীরা এখন আছেন, তারা সেখানে কাজ করছেন দাবি করে বরুণ দেবনাথ বলেন, ‘যারা দেশে ফিরতে চান, তাদের ফিরিয়ে আনা হবে। আমাদের লাইসেন্স স্থগিত করায় অন্য দেশেও কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া বন্ধ রাখতে হচ্ছে।’

এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিব সেলিম রেজা জাগো নিউজকে বলেন, ‘আলজেরিয়ার একটি চাইনিজ কোম্পানিতে বাংলাদশের এ শ্রমিকরা কাজে গেছেন। ওই কোম্পানির মালিক আজ (সোমবার, ৯ ডিসেম্বর) আমাদের মন্ত্রণালয়ে এসেছিলেন। তার সাথে আমরা বৈঠক করেছি। তার অভিযোগ বাংলাদেশের কর্মীরা আলজেরিয়া থেকে পালিয়ে স্পেনে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। আমরা বলেছি তোমাদের অভিযোগ এবং আমাদের শ্রমিকদের অভিযোগ- উভয়ই তদন্ত করা হবে। আমরা ইতোমধ্যে আলজেরিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসকে এ বিষয়ে তদন্ত করার নির্দেশনা দিয়েছি। এখানেও আমরা তদন্ত করবো। এসব তদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর যদি প্রয়োজন হয় তাহলে কর্মীদের ফেরত আনা হবে।’

জেপি/এইচএ/জেআইএম