এক ‘বাঘ-বিধবা’র দুঃখগাথা

জাগো নিউজ ডেস্ক
জাগো নিউজ ডেস্ক জাগো নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ০২:২৯ পিএম, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০
বাঘের থাবায় স্বামীর প্রাণ যাওয়ায় মোসাম্মৎ রাশিদাকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে ‘অলক্ষ্মী’ অপবাদ

ছেড়ে গেছে সন্তানেরা, বর্জন করেছে প্রতিবেশীরা। তার তকমা জুটেছে ‘অলক্ষ্মী’ হিসেবে। কিন্তু মোসাম্মৎ রাশিদার অপরাধ? অপরাধ তার স্বামীকে বাঘে খেয়েছে! সুন্দরবনের বাঘের হাতে স্বামীর প্রাণ হারানোর ‘দায়’ এই প্রৌঢ়াকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে বছরের পর বছর।

রাশিদার মতোই দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় এমন হাজারো নারী বয়ে বেড়াচ্ছেন স্বামীর ‘দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি’র কারণ হিসেবে ‘অলক্ষ্মী’ বা ‘হতভাগী’ অপবাদ। এই অপবাদ মাথায় তাদের যাপন করতে হচ্ছে চরম মানবেতর জীবন।

রাশিদার বাড়ি সুন্দরবনের সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা গ্রামে। মধু আহরণকারীদের এই গ্রামে নিজের জীর্ণ কুঁড়েঘরে কাতর স্বরে রাশিদা বলছিলেন তার দুঃখগাথা, ‘সবাইতো মুখ ফিরিয়ে নিলোই, আমার ছেলেরাও আমায় বলল, আমি নাকি অলক্ষ্মী! তারাও আমায় ছেড়ে গেল!’

গাবুরা গ্রামের আরও কয়েকজনের সঙ্গে মধু আহরণে গিয়েছিলেন রাশিদার স্বামী। আকস্মিক রয়েল বেঙ্গল টাইগার আক্রমণ করে তাকে। মানুষখেকো ওই বাঘের থাবায় প্রাণ হারান তিনি।

স্বামীকে হারানোর পর রাশিদার ২৪ ও ২৭ বছর বয়সী দুই সন্তানও তাকে ছেড়ে চলে যায়। চোখের জল মুছতে মুছতেই ৪৫ বছর বয়সী রাশিদা বলেন, ‘সবশেষে তারাও আসলে সমাজেরই অংশ।’

তিনি যে ছোট্ট খুপরি ঘরে থাকেন, সেটার চালাও নেই। একবার এক ঘূর্ণিঝড়ে সেই চালা উড়ে গিয়েছিল। তখন গ্রামবাসীর সাহায্য চাইলেও কেউ এগিয়ে আসেনি।

পাশের ঘরের ভাঙা চালা ঠিক করছিলেন মোহাম্মদ হোসেন। জিজ্ঞেস করা হলে তিনি রাশিদাকে সাহায্য না করার কথা স্বীকার করেন। ৩১ বছর বয়সী মধু আহরণকারী হোসেন বলেন, আমার স্ত্রীই আমাকে রাশিদার সঙ্গে কথা বলতে মানা করেছে। কারণ তার সঙ্গে কথা বললে অলক্ষুণে কিছু হয়ে যেতে পারে।

Royal-Bengal-Tiger

সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে ১০০ এর মতো বাঘ রয়েছে বলে মনে করা হয়

ঘূর্ণিঝড়ের পর গ্রামের অনেকে সরকারি সাহায্য পেলেও বঞ্চিত হন রাশিদা। তবে এই স্বামীহারা নারীর সাহায্যবঞ্চিত হওয়ার কথা অস্বীকার করেন সরকারি কর্মকর্তারা।

বেসরকারি সংস্থা লেডারস বাংলাদেশের প্রধান মোহন কুমার মন্ডল বলছিলেন, ‘বাঘ-বিধবা’দের এমন অবজ্ঞার চোখে দেখার সংস্কার সুন্দরবনের গোঁড়া রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোতে দেখা যায়। অনেক সম্প্রদায় এই কুসংস্কার লালন করছে শতবছর ধরে।

মোহন কুমার বলেন, ‘বিধবাদের মর্যাদা পুনর্প্রতিষ্ঠায় কাজ করে চলেছে দাতব্য সংস্থাগুলো। কিন্তু এখানে বড় অন্তরায় হলো মানুষের বিশ্বাসের পরিবর্তন করা। এই বিশ্বাস বদলের গতি খুবই ধীর। তবে আমি বলবো, পরিবর্তন আসছে।’

রাশিদার মতো আরেক ‘বাঘ-বিধবা’ রেজিয়া খাতুন। ১৫ বছর আগে তার মধু আহরণকারী স্বামীকে বাঘে খেলে রেজিয়াকেও ‘হতভাগী’ অপবাদ দেয়া হয়। তবে তিনি ধীরে ধীরে সামলে ওঠেন। রেজিয়াকে জীবনে স্বাভাবিক করতে সমাজের মানুষের আড়ালে গোপনে সহায়তা করে আসছেন তার ভাগনে ও অন্য আত্মীয়রা।

রেজিয়া বলছিলেন, ‘তিনি (স্বামী) মারা যাওয়ার সময় আমার ছেলেরা খুব ছোট্ট ছিল। কেউ আমাকে তখন সাহায্য করতে এগিয়ে আসছিল না। তারা স্বামীর মৃত্যুর জন্য আমাকে দায়ী করছিল বিধায় প্রথম দিকে আমার খারাপ লাগতো, কারণ আমি জানতাম না যে আমার অপরাধ কী। এখন আমি এই দুর্দশার মধ্যেই বেঁচে থাকার লড়াই শিখে গেছি।’

রেজিয়ার ভাগনে ইয়াদ আলী তার মামাসহ অনেক মধু আহরণকারীর ওপর বাঘের আক্রমণ নিজ চোখে দেখেছেন। তার মামা মারা যাওয়ার পর সমাজের লোকজনের আচরণও দেখেছেন মামীর ওপর। তাই অনেক ঝুঁকি সত্ত্বেও তিনি মামীর জন্য এগিয়ে আসেন।

Royal-Bengal-Tiger

সুন্দরবনের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে মানুষখেকো বাঘ রয়েছে বেশি

ইয়াদ আলী বলছিলেন, ‘আমরা তার জন্য কিছু (রেজিয়াকে সাহায্য) করতে গেলেও গোপনে করতে হতো। নইলে সমাজ আমাদেরও এক ঘরে করে ফেলতো।’

২১ বছর বয়সী হারুন অর রশীদের বাবাকেও বাঘের থাবায় প্রাণ দিতে হয়েছিল। মধু আহরণ তাদের বংশ পরম্পরার পেশা হলেও হারুন তা বদলে নেমেছেন মাছ ধরায়।

হারুন বলছিলেন, ‘আমার মা চাননি যে বাবার মতোই আমার কিছু হয়ে যাক। আমিও চেয়েছি, বেঁচে থেকে তার খেয়াল রাখতে। কারণ বাবার মৃত্যুর পর মায়ের ওপর সমাজের নির্যাতনের চিত্র আমি দেখেছি। সুতরাং এই দুর্দশা আবার ডেকে আনতে পারি না।’

বাংলাদেশ ও ভারতের উপকূলজুড়ে অবস্থিত সুন্দরবনের আয়তন ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার। এই ম্যানগ্রোভ ফরেস্টের বাংলাদেশ অংশে ১০০ বাঘ রয়েছে বলে ধারণা জীববৈচিত্র্য সংস্থাগুলোর।

বাঘ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মনিরুল খান বলেন, ‘মধু আহরণকারীদের বেশিরভাগই সুন্দরবনের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে আহরণে যায়, আর সেখানেই মানুষখেকো বাঘ রয়েছে সবচেয়ে বেশি।’

লেডারস বাংলাদেশের এক পরিসংখ্যান মতে, ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত কেবল সাতক্ষীরা জেলার ৫০ গ্রামেই বাঘের থাবায় প্রাণ গেছে ৫১৯ জনের। তাদের মৃত্যু স্ত্রীদের যেমন করেছে স্বামীহারা, তেমনি ফেলে গেছে রাশিদা-রেজিয়াদের মতোই মানবেতর জীবনে।

সূত্র: ফ্রান্স২৪.কম

এইচএ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]