ফসলের ক্যানভাসে ‘বিশ্বনেতা’

নাজমুল হুসাইন
নাজমুল হুসাইন নাজমুল হুসাইন , নিজস্ব প্রতিবেদক বগুড়া থেকে
প্রকাশিত: ০৭:৫৭ পিএম, ১৪ মার্চ ২০২১

ফসলের ক্যানভাসে বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রতিকৃতি এখন বাংলাদেশের। সেই ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুখচ্ছবি। বগুড়ার শেরপুরের ভবানীপুর ইউনিয়নের বালেন্দা গ্রামের এ শিল্পকর্মটি এখন গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড করতে যাচ্ছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসের আগেই বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় এ প্রতিকৃতি ফুটিয়ে তোলার আনুষ্ঠানিক সনদ মিলবে।

রোববার (১৪ মার্চ) সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রায় ১০০ বিঘা ধানক্ষেতে পুরোটাজুড়ে বিশাল ‘ক্যানভাস’। সেখানে ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে বঙ্গবন্ধুর মুখচ্ছবি। দেশের সবুজ আর চীন থেকে আনা বেগুনি ধানের চারা রোপণ করে ক্যানভাসটি তৈরি করা হয়েছে। বসন্তের মৃদু বাতাসে দোল খাচ্ছে সবুজ-বেগুনি ধানক্ষেত। সেখানে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পরিচর্যার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন কৃষকরা। চারাগুলো এখন চলমান মৌসুমের ইরি-বোরোর সমান হয়েছে।

আয়োজকরা জানান, পাখির চোখে (ড্রোন ব্যবহার করে) ম্যাপ করে স্কেচ তৈরির পর টানা দেড় মাস ধরে চলছে বিশাল এই কর্মযজ্ঞ। আশপাশের অর্ধশতাধিক কৃষক, ১০০ রোভার স্কাউটের সদস্য এ কাজে যুক্ত। যাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আটজন কৃষি প্রকৌশলী। রয়েছেন কৃষি কর্মকর্তা ও কীটতত্ত্ব-রোগতত্ত্ববিদেরাও। নিরাপত্তা রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আয়োজক শত শত মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ‘শস্যচিত্রে বঙ্গবন্ধু জাতীয় পরিষদ’। এটি বাস্তবায়ন করছে ‘ন্যাশনাল এগ্রিকেয়ার’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে এস এম মোস্তাফিজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই কৃষির এ অগ্রযাত্রা। তারই হাত ধরে আমরা খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা পেয়েছি। আবারও বঙ্গবন্ধুকে নতুনরূপে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে এ আয়োজন।

তিনি বলেন, ‘গিনেস বুকের স্বীকৃতি পেতে যথাযথ নিয়ম মেনে ইতোমধ্যে কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে। গত ৯ মার্চ তারা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেও গেছেন। সনদ মিলবে বলে আমরা শতভাগ আশাবাদী।’

শস্যচিত্রে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি এখন খালি চোখেই বোঝা যাচ্ছে। সবচেয়ে ভালো লাগে পাখির চোখে (ড্রোন ব্যবহার করে) দেখতে। বগুড়ার বিভিন্ন উপজেলা এবং পার্শ্ববর্তী জেলাসহ দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা এখন সেখানে ভিড় করছেন। সশরীরে বঙ্গবন্ধুর বিশালাকৃতির এ প্রতিকৃতি দেখতে এসে স্মরণীয় মুহূর্ত ধারণ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন কেউ কেউ। আবার কেউ ক্যামেরা কিংবা ড্রোন নিয়ে এসেছেন ভিডিও ও ছবি সংগ্রহের জন্য। তবে সবার চোখেমুখে ভিন্ন এক উচ্ছ্বাস।

বগুড়ার শেরপুরের ভারপ্রাপ্ত কৃষি কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা বলেন, “৪০০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩০০ মিটার প্রস্থের ক্যানভাসে দুই রঙের ধানের চারা লাগানো হয়েছে। এর মধ্যে সবুজ রঙের চারার ধানের নাম ‘জনকরাজ’। সবুজের ভেতরে ভিন্ন রঙ ফুটিয়ে তুলতে চীন থেকে আনা হয়েছে হাইব্রিড জাতের এফ-১ ধান।”

jagonews24

জানা গেছে, ক্রপ আর্ট বা শস্যচিত্রে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি তৈরির মাধ্যমে গিনেস রেকর্ড গড়ার প্রস্তাব দেন কৃষিবিদদের। ক্রপ ফিল্ড মোজাইক বা শস্যচিত্রে বঙ্গবন্ধুর এতো বড় প্রতিকৃতি বিশ্বে এটাই প্রথম। এর আগে চীনে ১৯১৯ সালে ৭৯ হাজার ৫০৫ দশমিক ১৯ বর্গমিটার আয়তনের জমিতে চার রঙের ধানের চারায় কাউ ফিশের ছবি ফুটিয়ে তুলে সাংহাইয়ের লেজিদাও ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিডেট। বর্তমানে সেটিই গিনেস বুকে রেকর্ড। সেটাকে টপকে যেতে বাংলাদেশের এ প্রচেষ্টা।

কৃষিমন্ত্রীর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রস্তাবনা তুলে ধরার পর এ প্রকল্পের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়। পরে এটি বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের নেতৃত্বে ‘শস্যচিত্রে বঙ্গবন্ধু জাতীয় পরিষদ’ নামে একটি কমিটি করা হয়। এ পরিষদের উপদেষ্টা কৃষিমন্ত্রী মো. আব্দুর রাজ্জাক।

বালেন্দা গ্রামের ক্যানভাসে ব্যবহৃত জমির ইজারা নিয়েছেন আয়োজকরা। ১০০ বিঘা জমি কৃষকদের কাছ থেকে উপযুক্ত মূল্য দিয়ে সাত মাসের জন্য লিজ নেয়া হয়েছে। এ ফসল উঠে গেলে কৃষকরা আবার তাদের জমি ফেরত পাবেন। আশপাশের গ্রামের কৃষকদের কাছ থেকে নভেম্বর থেকে মে মাসের জন্য প্রতি বিঘা জমি নেয়া হয়েছে আট হাজার ৯০০ টাকা দরে।

জমি রয়েছে কৃষক কামাল হোসেনের। তিনি বলেন, ‘খুব ভালো লাগে যে আমার জমিতে এমন একটি বড় এবং মহান কাজ হচ্ছে। আগে এ বালেন্দা গ্রাম কেউ চিনতেন না। এখন সারা পৃথিবী বালেন্দার নাম জানছে। এটা খুব ভালো লাগে।’

শস্যচিত্রে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির পাশেই কড়িতোলা মোড়। সেখানে আগে কোনো দোকানপাট ছিল না। এখন কয়েকটি দোকান হয়েছে। দূর-দূরান্তের দর্শনার্থীরা ভিড় করছে এসব দোকানে। পাশের জেলা জয়পুরহাট থেকে এসেছেন দর্শনার্থী লিমন। তিনি বলেন, ‘ফেসবুকে ছবি ও ভিডিও দেখে এখানে আসার ইচ্ছে হয়েছে। হুট করে চলে এসেছি। নিজের চোখে শস্যচিত্রে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি দেখে বিস্মিত ও মুগ্ধ।’

বালেন্দা গ্রামের একজন জনপ্রতিনিধি বলেন, এমন কাজ আমাদের এলাকায় হবে আমরা কেউ আগে চিন্তা করতে পারিনি। এটি দেখার জন্য অনেক মানুষ এখানে আসছে। ধান দিয়ে এমন একজন মহামানবের ছবি তৈরি করায় আমরা গর্বিত। আমরা এখানে একটা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চাই।

এনএইচ/এএএইচ/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]om