ঋণের টাকা পরিশোধে শিশু অপহরণ করেন দুবাইফেরত রানা

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:১০ পিএম, ২৪ অক্টোবর ২০২১

রানা আহমেদ বাকি (৩৪)। ২০০৯ সালে জমিজমা বিক্রি ও ঋণ করে দুবাই যান। কিন্তু সঠিক কাগজপত্র না থাকায় ২৩ দিন জেল খেটে যাকাত ভিসায় দেশে ফেরেন। দেশে ফিরে রিকশা চালিয়ে ঋণের টাকা পরিশোধের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে এক পর্যায়ে অপহরণের পরিকল্পনা মাথায় নেন। ঋণের তিন-চার লাখ টাকা পরিশোধের জন্য ঢাকার অদূরে আশুলিয়া এলাকা থেকে তিন বছরের এক শিশুকে অপহরণ করেন এবং মুক্তিপণ দাবি করেন। এমনকি মুক্তিপণ না দিলে অপহৃত শিশুটিকে মেরে ফেলার হুমকিও দেন। অপহরণের দুদিন পর সিরাজগঞ্জ থেকে অপহৃত শিশুকে উদ্ধার করেছে র‍্যাব-৪। এসময় অপহরণকারী রানা আহমেদকেও গ্রেফতার করে পুলিশের এ এলিট ফোর্স।

রোববার (২৪ অক্টোবর) বিকেলে কারওয়ান বাজার র‍্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন র‍্যাব-৪ এর অধিনায়ক (সিও) অতিরিক্ত ডিআইজি মো. মোজাম্মেল হক।

তিনি বলেন, ২১ অক্টোবর একটি অভিযোগের ভিত্তিতে র‍্যাব জানতে পারে, দুপুর একটার দিকে আশুলিয়া থানার পল্লীবিদ্যুৎ কবরস্থান রোড এলাকা থেকে সাড়ে তিন বছরের শিশু আফিয়া অপহৃত হয়েছে। ঘটনার দিনই অপহরকারী মোবাইল ফোনে শিশুটির বাবা-মায়ের কাছে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। টাকা না দিলে শিশুটিকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।

এ অভিযোগের ভিত্তিতে র‍্যাব-৪ এর একটি গোয়েন্দা দল অপহরণকারীর অবস্থানের ছায়া তদন্ত শুরু করে। আভিযানিক দল প্রথমে অপহরকারীর নিজ এলাকা পাবনা ও পরে শ্বশুরবাড়ি নাটোরের বড়াইগ্রাম থানা এলাকায় অভিযান চালায়। অভিযানের তথ্য সংগ্রহ করে অপহরণকারী সিরাজগঞ্জের শাহাজাদপুর থানায় দুর্গম চরাঞ্চলে অবস্থান করছে বলে জানা যায়। এরপর গত শুক্রবার সকাল নয়টা থেকে রোববার ভোর ছয়টা পর্যন্ত সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থানা এলাকার বিভিন্ন স্থানে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়। অভিযানে শাহজাদপুর থানার ১০ নম্বর কৈজুরি ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ডের বাঁধের সামনে সুইসগেট এলাকার একটি বাসা থেকে শিশু আফিয়াকে উদ্ধার ও অপহরণকারীকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতার বাকির বরাত দিয়ে র‍্যাব জানায়, তিনি গত দু’বছর ধরে আশুলিয়ার পল্লীবিদ্যুৎ কবরস্থান রোড এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করছে। পেশায় সে রিকশাচালক। বেশিরভাগ সময় রাতে রিকশা চালাতো আর দিনে বাসায় থাকতো। মাঝে মাঝে স্থানীয় একটি কয়েল ফ্যাক্টরিতেও কাজ করতো। বাসা ভাড়া নেওয়ার সময় সে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে তার বাড়ি মানিকগঞ্জ জেলায় বলে জানায়। এমনকি নিজেকে অবিবাহিত বলে পরিচয় দিলেও সে বিবাহিত ও দুই সন্তানের জনক। তার আসল বাড়ি পাবনা জেলার সদর থানার ভাউডাঙ্গা গ্রামে ও শ্বশুরবাড়ি নাটোরের বড়াইগ্রাম থানায়।

jagonews24

র‍্যাব-৪ এর অধিনায়ক আরও বলেন, অপহৃত শিশুটির বাবা আবুল কালাম আজাদ ও মা সোনিয়া বেগম দুজনই গার্মেন্টসে চাকরি করার কারণে মেয়েকে দীর্ঘদিনের পরিচিত আনোয়ারা নামে সম্পর্কে এক বৃদ্ধ নানির বাসায় রেখে অফিসে যেতো। নানির পাশের রুমে অপহরণকারী রানা এক হাজার টাকা ভাড়ায় বসবাস করতো। সেই সুবাদে প্রায়ই শিশুটি তার কাছে যাওয়া-আসা করতো। পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক অপহরণকারী রানা শিশুটিকে মাঝে মাঝে চকলেট, চিপস্ ও খেলনা কিনে দিয়ে সখ্যতা গড়ে তোলে। শিশু আফিয়া তাকে মামা বলে ডাকতো। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়ের লক্ষ্যে শিশুটিকে অপহরণের পরিকল্পনা করে রানা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিশুটির বাবা-মা দুজনেই বাসায় না থাকায় গত ২১ অক্টোবর দুপুর একটার দিকে শিশুটিকে অপহরণ করার উদ্দেশ্যে প্রথমে তাকে একটি চিপস্ কিনে দিয়ে পল্লীবিদ্যুৎ থেকে রিকশাযোগে বলিভদ্র বাজারে যায়। সেখান থেকে শিশুটিকে গেঞ্জি ও সেন্ডেল কিনে দেয়। পরবর্তীতে বলিভদ্র থেকে বাসযোগে চন্দ্রা যায়। চন্দ্রা বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে করে বিকেল তিনটার দিকে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। ওইদিন রাত সাড়ে নয়টার দিকে শাহজাদপুর থানার ১০ নম্বর কৈজুরি ইউপি ৭নং ওয়ার্ডের বাঁধের সুইসগেট এলাকায় তার এক বন্ধু রবিউলের বাড়িতে যায়। বন্ধুর সঙ্গে শিশুটিকে নিজের মেয়ে বলে পরিচয় দেয় রানা। বন্ধুকে জানায়, তার স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় সে এখানে কিছুদিন থাকবে।

গ্রেফতার রানা আগেও আরও কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিলেন কি না, সে বিষয়ে স্থানীয় থানায় ও এলাকায় খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান র‍্যাবের এ কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, অপহরণকারী রানা আহমেদ ২০০৯ সালে জমিজমা বিক্রি ও ঋণ করে দুবাই যায়। কিন্তু সঠিক কাগজপত্র না থাকায় ২৩ দিন জেল খেটে যাকাত ভিসায় দেশে ফেরত আসে। দেশে ফিরে ঋণের টাকা পরিশোধে রিকশা চালানো শুরু করেন। তাতে ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় অপহরণের পরিকল্পনা করে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করে।

টিটি/এমকেআর/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]