অযত্ন অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে বীর সেনানী ধ্রুবের শেষ স্মৃতিটুকুও

মতিউর রহমান মুন্না
মতিউর রহমান মুন্না মতিউর রহমান মুন্না , গ্রিস প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৭:০৩ পিএম, ১৪ মে ২০২২

স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও বীর সেনানী শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ধ্রুবের কবর আজও শনাক্ত হয়নি। ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ শহর শত্রুমুক্ত করতে পাক হানাদারদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন এই বীর সেনানী। এতগুলো বছর অতিবাহিত হলেও শহীদের স্মৃতি রক্ষার্থে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

এমন কী বছরের পর বছর ধরে তার শাহাদাতবার্ষিকী পালন করতে কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় না। অযত্ন অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে এই বীর সেনানীর শেষ স্মৃতি সমাধিটুকুও।

ধ্রুবের সহযোদ্ধা ও একাত্তরের যুদ্ধে অংশ নেওয়া রশীদ বাহিনীর প্রধান মুক্তিযোদ্ধা মুর্শেদ জামান রশিদ সম্প্রতি জাগো নিউজের প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে অশ্রুসিক্ত নয়নে একাত্তরের যুদ্ধে ধ্রুবের অবদানের কথা তুলে ধরে বলেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে মৌলভীবাজার, নবীগঞ্জ বাহুবলে শহীদ ধ্রুব মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন।

১৫ নভেম্বর নবীগঞ্জে আসেন মুক্তিযোদ্ধা ধ্রুব। তারপর গজনাইপুরে যুদ্ধে অংশ নেন। সেই যুদ্ধে ধ্রবের বন্দুকের গুলিতে চারজন পাক-সদস্য নিহত হয়। তারপর ধ্রুব নবীগঞ্জের চৌধুরী বাজারে রশীদ বাহিনীর সদস্য হিসেবে যুদ্ধে অংশ নেন। পরে বাহুবল উপজেলায়ও মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে ধ্রব যুদ্ধে অংশ নেন।

পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর রাতে মুক্তিযোদ্ধা মুর্শেদ জামান রশিদের নেতৃত্বে রশীদ বাহিনীর ৩৫ সদস্য সহকারে নবীগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। ৪ ডিসেম্বর ভোরে গিয়ে নবীগঞ্জে পৌঁছায় রশীদ বাহিনী। সেখানে অবস্থানকালে নবীগঞ্জে পাক-হানাদার বাহিনীর মূল ঘাটি হিসেবে চিহ্নিত নবীগঞ্জ থানাতে আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়।

এসময় মুক্তিবাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে পাক-হানাদার বাহিনীর সদস্যরাও যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। মুক্তিবাহিনীর রশীদ, ধ্রুবসহ অন্যান্য সদস্যরা নবীগঞ্জ থানার গেটের কাছে যুদ্ধের জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিলে পাক-হানাদার বাহিনীর সদস্যরা মুক্তিবাহিনীকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। এ সময় পাক-হানাদার বাহিনীর একটি গুলি তরুণ মুক্তিযোদ্ধা ধ্রুবের মাথায় লাগে।

এতে নবীগঞ্জ-বানিয়াচং সড়কে প্রাণ হারান মুক্তিযোদ্ধা ধ্রুব। ওই যুদ্ধে পাক-হানাদার বাহিনীর গুলিতে আরও তিনজন মুক্তিযোদ্ধা গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন। পরে মুক্তি বাহিনী পিছু হাঁটে। তখন যুদ্ধে নিহত মুক্তিযোদ্ধা ধ্রুবের মরদেহ নবীগঞ্জ-বানিয়াচং সড়কে পড়ে থাকে। পচন ধরে ধ্রুবের মরদেহে। পরবর্তীতে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৬ ডিসেম্বর নবীগঞ্জ থানাকে শত্রুমুক্ত করার ঘোষণা দিয়ে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।

মুক্তিযোদ্ধা রশীদ জানান, নবীগঞ্জ স্বাধীন হওয়ার পর বর্তমান নবীগঞ্জ থানার গেটের সামনেই মাটিচাপা দেওয়া হয় ধ্রুবকে। মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে বিভিন্ন মহল থেকে ধ্রুবের স্মৃতি রক্ষার্থে শহীদ মিনার ও স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করার আশ্বাস দিলেও স্বাধীনতার ৫০ বছরেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এ নিয়েও চরম ক্ষোভ ঝাড়েন মুক্তিযোদ্ধা মুর্শেদ জামান রশিদ।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক বীর সেনানীর নাম ধ্রুব

একাত্তরের যুদ্ধে অংশ নেওয়া রশীদ বাহিনীর প্রধান মুক্তিযোদ্ধা মুর্শেদ জামান রশিদ আরও বলেন, মারা যাওয়ার পূর্বে যদি দেখে যেতে পারি শহীদ ধ্রুবের নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে তাহলে মরার পরেও শান্তি পাবো এবং ধ্রুবের আত্মাও শান্তি পাবে।

জানা গেছে, দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা ধ্রুবের সমাধিটি আজও চিহ্নিত করা হয়নি। ২৬ শে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস, ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে ফুল দিয়ে সম্মান জানানো হয় মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানীদের। কিন্তু ঠিকানাবিহীন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ধ্রুবের সমাধি আজও অচিহ্নিত অবস্থায় নবীগঞ্জ থানা সংলগ্ন নবীগঞ্জ-বানিয়াচং সড়কের পাশে রাজনগর গ্রামের কবর স্থানের এক পাশে পড়ে আছে।

একজন টগবগে যুবক যার তখনও মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার বয়স হয়নি কিন্তু দেশ মাতৃকার টানে ধ্রুব অপরিণত বয়সে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। অনেকেই বলেন শ্রীমঙ্গলের কোনো এক চা-বাগানের দরিদ্র শ্রমিক পিতা-মাতার সন্তান ছিল শহীদ ধ্রুব। একদিকে ঠিকানাবিহীন, অন্যদিকে সমাধি অচিহ্নিত, অবহেলিত এই কি ছিল শহীদ ধ্রুবের স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশ।

এ বিষয়ে দিনারপুর কলেজের অধ্যক্ষ তনুজ রায় বলেন, যুদ্ধের ময়দানে পাক-হানাদার বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারায় তরুণ মুক্তিযোদ্ধা ধ্রুব। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও তার সঠিক সমাধিস্থল নির্ধারণ করা যায়নি। তার স্মৃতি রক্ষার্থে কোনো স্মৃতিস্মারক বা স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়নি। নবীগঞ্জবাসীর দাবি দ্রুত শহীদ ধ্রুবের নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হোক।

নবীগঞ্জ পৌরসভার সাবেক প্যানেল মেয়র এটিএম সালাম জানান, স্বাধীনতার ইতিহাস খুবই নির্মম, নবীগঞ্জকে শত্রুমুক্ত করতে গিয়ে পাক-হানাদার বাহিনীর গুলিতে মুক্তিযোদ্ধা ধ্রুব নিহত হন। নবীগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক বীর সেনানীর নাম ধ্রুব।’ শহীদ ধ্রুবের সমাধিস্থল শনাক্ত করে সরকারিভাবে সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে শাহাদাতবার্ষিকী পালনের জন্য সবার প্রতি দাবি জানান তিনি।

এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে স্বাধীনতার ৫০ বছরেও ধ্রুবের সমাধিস্থল শনাক্ত করতে না পারার ব্যাপারে ব্যর্থতা রয়েছে স্বীকার করে নবীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের আহ্বায়ক ফজলুল হক চৌধুরী সেলিম বলেন, শহীদ ধ্রুবের সমাধিস্থল শনাক্ত করা যায়নি বলে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়নি। উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে দ্রুত ধ্রুবের সমাধিস্থল শনাক্ত করে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

এমআরএম/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]