‘শব্দদূষণে বিকলাঙ্গ প্রজন্ম তৈরির প্রক্রিয়া তীব্রতর হচ্ছে’

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:১৩ পিএম, ২৮ মে ২০২২

স্থপতি ইকবাল হাবিব। নগর পরিকল্পনাবিদ। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক। জন্ম, ১৯৬৩ সালে। পড়াশোনা করেছেন বুয়েটের স্থাপত্যবিদ্যায়। ঢাকার হাতিরঝিল, ধানমন্ডি লেক, টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধি কমপ্লেক্স, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনসহ অসংখ্য দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের অন্যতম ডিজাইনার।
শব্দদূষণ ও জনজীবন প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলেছেন জাগো নিউজের সঙ্গে। বলেন, নিয়ন্ত্রণহীন শব্দদূষণের কারণে এক বিকলাঙ্গ প্রজন্মের সৃষ্টি হচ্ছে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ: শব্দদূষণে অতিষ্ঠ জনজীবন। দিন যাচ্ছে পরিস্থিতি বেসামাল হচ্ছে। নগর পরিকল্পনা নিয়ে গবেষণা করছেন, লিখছেন। শব্দদূষণের মাত্রা নিয়ে কী বলবেন?

ইকবাল হাবিব: শব্দদূষণের মূল কারণ হচ্ছে, আমরা প্রতিবেশ সংবেদনশীল কাজের জন্য আইনের যথাযথ প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করতে পারিনি। সেটা নির্মাণ কার্যক্রম হোক কিংবা গাড়ির হর্ন-ই হোক। নির্মাণকাজ আর গাড়ির উচ্চশব্দে হর্ন বাজানো শব্দদূষণের মূল কারণ। সরকারি-বেসরকারি অথবা ব্যক্তিগতভাবে নির্মাণ কাজগুলো ব্যাপকভাবে শব্দদূষণের জন্য দায়ী।

জাগো নিউজ: এটি এড়ানো সম্ভব ছিল?

ইকবাল হাবিব: শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করার যাবতীয়ভাবে আধুনিক টেকনোলজি বা প্রকৌশলগত সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। কিন্তু বাধ্যবাধকতা না থাকার কারণে আদিম প্রথায় প্রতিবেশীর প্রতি অসংবেদশীল থেকে এই অন্যায় কার্যক্রম চলছে এবং সেটা দিন-রাত সব সময়ই। কাঁচামাল প্রক্রিয়াই হোক, নির্মাণকাজ হোক অথবা নির্মাণসামগ্রী পরিবহনের ক্ষেত্রেই হোক, শব্দদূষণে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।

দ্বিতীয়ত, যান চলাচলের ক্ষেত্রে উচ্চশব্দে হর্ন বাজানো এবং বিভিন্ন রকমের উচ্চশব্দ প্রয়োগ করার মতো নির্বিচারে চালিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা বহাল রাখা। ট্রাফিক পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিআরটিএ ও পরিবেশ অধিদপ্তর- তাদের নিজ দায়িত্ব থেকে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণচেষ্টার আগ্রহ নেই। এ কারণেই নিয়ন্ত্রণহীনভাবে রাস্তায় হর্ন বাজিয়ে আসছে।

জাগো নিউজ: ক্ষতির মাত্রা নিয়ে এখন কী বলা যায়?

ইকবাল হাবিব: শব্দদূষণের মনোদৈহিক বিকাশের অন্তরায় থেকে শুরু করে শ্রবণইন্দ্রিয় ক্ষতির মাধ্যমে বিকলাঙ্গ প্রজন্ম তৈরির প্রক্রিয়া তীব্রতর হচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জনস্বাস্থ্য চরম হুমকির মুখে। বয়স্করা বিভিন্ন রকম পীড়ায় ভুগছেন। কর্ন ও মস্তিষ্কের প্রদাহে ভুগছেন। ডাক্তাররা মনোদৈহিক সমস্যা নিয়ে জোরালোভাবে সতর্ক করে যাচ্ছেন।

এরপরও পরিবেশ অধিদপ্তর, জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ কেউই উদ্যোগ বা তৎপরতা নিচ্ছে না। তারা একেবারেই নির্বিকার। এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার কথা বিআরটিএর। এই প্রতিষ্ঠানটি মাঝে মধ্যে অভিযানের নামে যা করে, তাতে জনগণের কোনো কল্যাণ হচ্ছে না।

জাগো নিউজ: জনদায়ও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জনসচেতনতার প্রশ্নে…

ইকবাল হাবিব: আমরা মনে করি, একদম স্কুল লেভেলে ক্যাম্পেইন থেকে শুরু করে জনসচেতনতার প্রশ্নে বিনিয়োগের জায়গায় সরকার ব্যর্থ। আমরা যদি স্কুলের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে বোঝাতে পারতাম যে, তোমার গাড়ির ড্রাইভার যেন হর্ন না দেয়, তুমি এটি নিশ্চিত করো। হর্ন দিলে তোমারও ক্ষতি আরেকজনেরও ক্ষতি। তোমার যে বন্ধু তোমার মতো গাড়িতে উঠতে পারছে না, হয়তো রিকশায় যাচ্ছে নতুবা হেঁটে যাচ্ছে, হর্ন দিলে তার সমস্যা হয়। তার শ্রবণইন্দ্রিয় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এটি যদি আমরা শেখাতে পারতাম, তাহলে ঘর থেকেই প্রতিকার পেতাম। জনসচেনতা এখানে সবচেয়ে বড় অস্ত্র। আর হচ্ছে আইনের প্রয়োগ।

সরকারের উচ্চদপদস্থ কর্মকর্তা থেকে মন্ত্রী, এমপি, পুলিশের ড্রাইভাররা নির্বিচারে হাইড্রোলিক হর্ন দেন। ভোঁ ভোঁ শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে মানুষ। আমরা তা কোনো প্রতিবিধান করি না। তখন বুঝতে হবে সরকারিভাবে আমরা দুষ্টের লালন করে চলছি।

এই প্রক্রিয়া থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জায়গাগুলো সুচিহ্নিত। নির্মাণকাজে শব্দদূষণ রোধ, সংবেদনশীল আচরণ, নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে আইনের কোনো সুরক্ষা নেই। একইভাবে গাড়ির অযথা হর্ন বাজানোর কারণে চালকের শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারেও সুস্পষ্ট বিধান নেই। শব্দদূষণ রোধে এই দুটি বিষয় অন্তরায় বলে মনে করি।

জাগো নিউজ: শাস্তিই সমাধান? আইনের প্রয়োগ অপরাধ কমাতে পারে?

ইকবাল হাবিব: আইনের সুরক্ষা ও প্রয়োগ অবশ্যই থাকতে হবে। জনসচেতনতা তো অবশ্যই জরুরি এবং এটিই মূল কার্যক্রম বলে মনে করি। অথচ জনসচেতনতায় কোনো বিনিয়োগ নেই।

জাগো নিউজ: রাজধানী ঢাকার সঙ্গে তুলনা করে অন্য শহরগুলোর কী চিত্র দেখছেন?

ইকবাল হাবিব: শব্দদূষণের মহামারি প্রতিটি শহরেই। এমনকি গ্রামেও। এই দূষণ দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছে। আবার যানজট নিয়ে সরকারের কর্তাব্যক্তিরাও গর্বিত।

মন্ত্রী-এমপিরা বলছেন, আমরা ফের নির্বাচিত হলে উপজেলা পর্যায়েও যানজট দেখতে পাবেন। এমন আশাবাদ যখন ব্যক্ত করেন, তখন আর আমাদের কিছুই বলার থাকে না। যানজটের সঙ্গে হর্ন বাজানোর সম্পর্ক ডাইরেক্ট। জ্যামে আটকা থাকলে মানুষ হর্ন দেওয়ার গতি বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশজুড়ে এ অজ্ঞতা, অসচেতনতা, নিষ্ক্রিয়তা আমাদের জন্য ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি করছে।

জাগো নিউজ: এই পরিস্থিতি আমাদের ভবিষ্যৎ কী নির্মাণ করছে?

ইকবাল হাবিব: ভবিষ্যতে যে সমাজ তৈরি হচ্ছে, তা কোনোভাবেই আপনার-আমার কাম্য হবে না। আমরা পৃথিবীর অন্য দেশের মানুষের চেয়ে এমনিতেই জোরে কথা বলা শুরু করেছি। আমাদের মতো উচ্চৈঃস্বরে অন্যরা কথা বলে না। এর কারণ হচ্ছে, আমরা আসলে কম শুনি। যে কম শোনেন সে স্বভাবতই জোরে কথা বলে। ফলে আমাদের ষড় ইন্দ্রিয় অকেজো হয়ে পড়ছে। বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ছি। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি শরীরবৃত্তীয় বিকলাঙ্গ হতে থাকে তাহলে রাষ্ট্র, সমাজও বিকলাঙ্গ হতে থাকবে।

জাগো নিউজ: রাষ্ট্র বিনিয়োগ করছে অনবরত। উন্নয়নও ঘটছে। আবার রাষ্ট্র, সমাজ বিকলাঙ্গ…

ইকবাল হাবিব: উন্নয়ন শব্দ যে পরিত্যজ্য তা অনেকেই ভুলে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী বারবার টেকসই উন্নয়নের কথা বলছেন। টেকসই উন্নয়নের জন্য তিনি বিশ্ব দরবারে স্বাক্ষর করে এসেছেন। টেকসই উন্নয়নের ফোরামে বাংলাদেশও নেতৃত্বে রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানকেও এরা বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন। যে উন্নয়ন নিয়ে গর্ব করে উল্লাস প্রকাশ করছে, সেটা কোনো উন্নয়নই নয়। এ উন্নয়ন কারও জন্যই কাম্য নয়। আমাদের টেকসই উন্নয়ন দরকার।

জনসচেতনতায় বিনিয়োগ করতে হবে। আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। আইনের দুর্বলতা কাটিয়ে সঠিক আইন করতে হবে। সংসদ বানানোই হয়েছে আইন করার জন্য। সংসদ গল্প করার জন্য বানানো হয়নি। আইনের অনুশাসন বাস্তবায়ন করতে হবে। আর টেকসই উন্নয়নের বাইরে যেসব উন্নয়ন আছে, তা বন্ধ করে দিতে হবে।

এএসএস/এএসএ/এএসএম

ট্রাফিক পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিআরটিএ ও পরিবেশ অধিদপ্তর- তাদের নিজ দায়িত্ব থেকে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণচেষ্টার আগ্রহ নেই। এ কারণেই নিয়ন্ত্রণহীনভাবে রাস্তায় হর্ন বাজিয়ে আসছে

সরকারের উচ্চদপদস্থ কর্মকর্তা থেকে মন্ত্রী, এমপি, পুলিশের ড্রাইভাররা নির্বিচারে হাইড্রোলিক হর্ন দেন। ভোঁ ভোঁ শব্দে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে মানুষ। আমরা তা কোনো প্রতিবিধান করি না। তখন বুঝতে হবে সরকারিভাবে আমরা দুষ্টের লালন করে চলছি

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]