‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে উত্তরের রূপ বদলে যাবে’

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১১:২৬ এএম, ২৯ জুন ২০২২

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোতাহার হোসেন, এমপি। সভাপতি, লালমনিরহাট জেলা শাখা, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। সাবেক প্রতিমন্ত্রী।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা, তিস্তার বন্যা-ভাঙন, জীবন-জীবিকা নিয়ে মুখোমুখি হন জাগো নিউজের। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সায়েম সাবু।

জাগো নিউজ: তিস্তা নিয়ে বহু আলোচনা। তিস্তা মহাপরিকল্পনাও এ আলোচনায় যুক্ত হয়েছে। আপনার নির্বাচনী এলাকা তিস্তা নদীর অববাহিকায়। এখানকার জীবন-জীবিকা কোনো না কোনোভাবে এ নদী দ্বারা প্রভাবিত। তিস্তার মহাপরিকল্পনা নিয়ে এখন কী বার্তা দেবেন?

মোতাহার হোসেন: চীনের দুঃখ যেমন হোয়াংহো, তেমনি আমাদের দুঃখ তিস্তা। তিস্তা নিয়ে যে মহাপরিকল্পনার আলোচনা, তার কোনো অগ্রগতি এখন আছে বলে আমার জানা নেই। চীন ও ভারত এক প্রকার ব্লাকমেইলিং করে আমাদের এই প্রকল্প আটকে দিয়েছে।

জাগো নিউজ: কিন্তু সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী তো বললেন চীনের সঙ্গে এ বিষয়ে চুক্তি সম্পন্ন…

মোতাহার হোসেন: তিনি কোন প্রেক্ষাপটে বলেছেন, তার ব্যাখ্যা আমি দিতে পারবো না। তিনি ভোজ্যতেলের দাম কমানোর কথা বলেছিলেন। আরও বেড়েছে।

জাগো নিউজ: এই পরিকল্পনায় মূল সমস্যাটা কোথায়?

মোতাহার হোসেন: চীন এই প্রকল্প আট হাজার কোটি টাকায় করে দিতে চাইছে। আর ভারত করে দিতে চাইছে দুই হাজার কোটি টাকায়। সমস্যাটা দাঁড়িয়েছে এখানেই। অথচ চীনের প্রস্তাবটাই যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করা হয়।

জাগো নিউজ: তিস্তার কান্না তো বাড়ছে। বর্ষায় বন্যা যেমন ভাসায় তেমনি শুষ্ক মৌসুমে ধু-ধু বালু চর জাগায়। প্রাণ-প্রকৃতির ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে।

মোতাহার হোসেন: তিস্তার দুঃখ দেখানোর কোনো জায়গা নেই আমাদের। কেউ মুখ তুলে তাকায় না। তিস্তা নদীর দু’তীরের মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সামান্য পানিতেই অতিবন্যা। আবার মাইলের পর মাইল বালুচর পড়ে থাকে শুষ্ক মৌসুমে। প্রতি বছর শত শত হেক্টর জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কৃষিজমি হারিয়ে কৃষক দিশেহারা। বাড়ি-ঘর ভেঙে যাওয়ায় অনেকেই নিঃস্ব। বিপর্যস্ত এখানকার প্রাণ-প্রকৃতি।

তিস্তার ওপর একটি ব্যারেজ, দুটি সেতু রয়েছে। অথচ একটি সেতু দিয়ে পণ্যবাহী যান চলাচল করতে পারছে। অদৃশ্য কারণে দুটি সেতু দিয়ে পরিবহন পার হতে পারছে না। তিস্তা ব্যারেজ দিয়ে গাড়ি গেলে সাংবাদিকরা সমালোচনা করে লেখেন। কিন্তু কাকিনা সেতু দিয়ে কেন পরিবহন যেতে দেওয়া হয় না, তা তো লেখেন না। ২শ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘শেখ হাসিনা সেতু’ তাহলে কেন করা হলো? কারা গাড়ি যেতে দেয় না, কেন দেয় না, তা জনস্বার্থেই খোঁজ নেওয়া দরকার।

জাগো নিউজ: আপনার কাছে কী কারণ মনে হয়?

মোতাহার হোসেন: দেখুন, কী অজুহাতে তিস্তা ব্যারেজে পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা, তা আমাদের কাছে অজানা। লালমনিরহাট-কাউনিয়া সেতুতে যারা টোল আদায় করে তাদের সঙ্গে সিন্ডিকেট করেই তিস্তার ডালিয়া ব্যারেজ এবং কাকিনা সেতুর পণ্যবাহী পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বলে মনে করি। সব গাড়ি একটি সেতু দিয়ে পার হলে একটি মহলই লাভবান হবে। এর বাইরে তো আর কোনো কারণ আমি দেখতে পাই না।

জাগো নিউজ: কিন্তু জনগণ তো ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। সময় এবং ব্যয় দুটোই বাড়ছে।

মোতাহার হোসেন: এই ভোগান্তির কথা আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছেও জানিয়েছি। এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আমি এই ভোগান্তির কথা লিখিনি।

জাগো নিউজ: তার মানে একটি সিন্ডিকেটের কাছে একটি অঞ্চলের মানুষ জিম্মি হয়ে থাকবে?

মোতাহার হোসেন: হ্যাঁ, আমরা জিম্মি হয়ে পড়েছি। তিন বছর চেষ্টার পর আমি কাকিনা সেতু থেকে ব্যারিকেড তুলে দিয়েছিলাম। পুলিশকে ম্যানেজ করে পরদিন ফের ব্যারিকেড দেওয়া হয়।

যদি সেতুর দুর্বলতার কারণে এমনটি করা হয়, তাহলে তো এতদিন সেতু ভেঙে পড়ার কথা। তিস্তা ব্যারেজে পাথরবোঝাই ট্রাক চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে। ওভারলোডের বিপক্ষে আমিও। কিন্তু ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রাকগুলো তো যেতে পারে। যদি সামান্য একটি ট্রাকই যেতে না পারে তাহলে ১৭শ কোটি টাকা ব্যয়ে কেন এই ব্যারেজ করা হলো? এখানে ব্যারেজ এবং ব্রিজ দুটোই সংযুক্ত। ব্যারেজের অজুহাতে ব্রিজটি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। তাহলে ব্রিজ করছে কেন?

জাগো নিউজ: নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে তিস্তা। বিকল্প কী?

মোতাহার হোসেন: আমি আরেকটি বিকল্প নিয়ে এগিয়েছি। আরেকটি সেতু হচ্ছে তিস্তা ব্যারেজের ভাটিতে। ব্যারেজ থেকে দুই কিলোমিটার ভাটিতে ছয় লেন সড়ককে যুক্ত করবে, যে সড়ক পাগলাপীর হয়ে জলঢাকা থেকে এসে হাতীবান্ধা উপজেলার বড়খাতার দোয়ানী মোড়ে বুড়িমারী সড়কে যুক্ত করবে। একই জায়গায় রংপুর-লালমনিরহাট থেকে বর্তমান মহাসড়কটি ছয় লেন হয়ে যুক্ত হবে। সাসেক-৪ নামের এই প্রকল্প উত্তরবঙ্গের রূপ বদলে দেবে বলে বিশ্বাস করি।

জাগো নিউজ: তিস্তার বন্যা প্রথমেই প্লাবিত করে আপনার নির্বাচনী এলাকা। নদীভাঙনও হয় সমানতালে। বানে ভাসা মানুষদের জন্য কী বলবেন?

মোতাহার হোসেন: আমি ১৯৮৫ সালে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হই। আমি দেখে এসেছি তিস্তায় প্রতি বছরই ৫/৭ হাজার বাড়ি নদীগর্ভে চলে যায়।

জাগো নিউজ: ভাঙন ঠেকানোর উপায় কী? নদীশাসনও তো করা হচ্ছে।

মোতাহার হোসেন: তিস্তার ব্যারেজের কারণে এই নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। নদীর রূপও বদলে গেছে। যে কারণে স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এ নদীশাসন করে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

আমি মনে করি, নদীর দু’পাড়ে বাঁধ দেওয়া জরুরি। এরপর ড্রেজিং। নদী সুরক্ষা বাঁধ নির্মাণ না করে খনন করলে কোনো ফল আসবে না। বছরের পর বছর ধরে উজান থেকে বালু নেমে এসে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। সামান্য পানি হলেই পাড় উপচে লোকালয় প্লাবিত হয়।

তিস্তার ড্রেজিং ঘিরেই মহাপরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। ব্যারেজ থেকে একেবারে গাইবান্ধা, যেখানে গিয়ে তিস্তা নদী যমুনার সঙ্গে মিলিত হয়েছে সেই পর্যন্ত এই পরিকল্পনার অংশ ধরা হয়েছে।

জাগো নিউজ: তিস্তা মহাপরিকল্পনা এখন কী পর্যায়ে আছে?

মোতাহার হোসেন: চীন ও ভারতের কারণে বিষয়টি তামাদি পর্যায়ে। বাংলাদেশ সরকার এগোতেও পারছে না আবার পেছাতেও পারছে না।

সরকার নিজস্ব পরিকল্পনায় ব্যারেজ ঘিরে খননের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। সামনের মাসে এ বিষয়ে মিটিং আছে। ওই মিটিংয়ে মহাপরিকল্পনার এজেন্ডাও থাকবে।

আমি ব্যক্তিগতভাবে তিস্তা মহাপরিকল্পনার তাগিদ দিচ্ছি। প্রতি সংসদ অধিবেশনে এ নিয়ে আলোচনা রাখছি। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে উত্তরের রূপ বদলে যাবে। মানুষের জীবন-জীবিকার আমূল পরিবর্তন আসবে।

জাগো নিউজ: এই মহাপরিকল্পনায় বৈদেশিক অংশীদার না মিললে?

মোতাহার হোসেন: আমি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ নিয়ে সাক্ষাৎ করেছি। প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছি, প্রয়োজনে পুনঃমূল্যায়ন করে নিজস্ব অর্থায়নে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন করুন। উনি হতাশ না করে বিবেচনায় রেখেছেন। তিস্তার সংস্কার ছাড়া এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন আসবে না।

জাগো নিউজ: আপনি দীর্ঘকাল ধরে জনপ্রতিনিধি হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। দেশের উন্নয়ন তো হচ্ছে। আপনার এলাকার উন্নয়ন নিয়ে কী বলবেন?

মোতাহার হোসেন: ১৯৮৫ সাল থেকে জনগণের সঙ্গে আছি একজন প্রতিনিধি হিসেবে। আমি আটবার নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। ২০০১ সাল থেকে আমি মহান জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছি। ২০০১ সালের নির্বাচনের ফলাফলে সারাদেশে আওয়ামী লীগের বিপর্যয় ঘটে। ওই সময় আমি বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয়ী হই। বলতে পারেন উত্তরবঙ্গে জাতীয় পার্টির দুর্গে আমিই বড় আঘাত করি।

আমার এই এলাকার মানুষ এক সময় মঙ্গার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতো। এখন মঙ্গা নেই। উন্নয়নের সুবিধা ঘরে ঘরে। রাস্তা-ঘাট, কালভার্ট, স্কুল-কলেজের উন্নয়ন মানুষের ভাগ্যে পরিবর্তন ঘটিয়েছে। বিদ্যুৎ ঘরে ঘরে।

কিন্তু নদীভাঙন এলাকার মানুষের দুঃখ আমাকে প্রতি মুহূর্তে ব্যথিত করে। এই কষ্ট আমার উন্নয়নকে অনেকটাই ম্লান করে দিচ্ছে।

জাগো নিউজ: আপনার নির্বাচনী এলাকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হচ্ছে বুড়িমারী স্থলবন্দর। যে বন্দরের সঙ্গে একাধারে ভারত, নেপাল ও ভুটান যুক্ত। এই বন্দরের উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে কী বলবেন?

মোতাহার হোসেন: বুড়িমারী স্থলবন্দরের উন্নয়নের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন জড়িত। আমি রেলমন্ত্রীকে দু’বার নিয়ে এসেছি এই বন্দরে। ঢাকা থেকে বুড়িমারী ও বুড়িমারী হয়ে ভারতের সঙ্গে রেল যোগাযোগের কথা ছিল। তা না করে রেলমন্ত্রী চিলাহাটীর সঙ্গে যুক্ত করলেন।

জাগো নিউজ: রেলের এই পরিকল্পনা এখন কী পর্যায়ে আছে?

মোতাহার হোসেন: চিলাহাটী-হলদিবাড়ী রেলপথ সবে যুক্ত হলো। এখন আমাদের এই পথ অনেকটাই কঠিন হলো। বুড়িমারী রেলপথ হচ্ছে মিটারগেজের। ভারতের সঙ্গে যুক্ত করতে হলে ব্রডগেজের প্রয়োজন। রেললাইন সংস্কার না করে তো এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

জাগো নিউজ: ছয় লেনের সড়ক রংপুরে এসে ঠেকছে। বুড়িমারী স্থলবন্দরে যুক্ত হবে কবে?

মোতাহার হোসেন: পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু একনেকে পাস না হলে তো কিছুই বলা যাবে না। আমি গত সংসদে এ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বক্তব্য দিয়েছি। আমি দ্রুত এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রত্যাশা করছি।

জাগো নিউজ: তিস্তার অববাহিকায় প্রচুর ভুট্টা চাষ হচ্ছে, এ অঞ্চলের মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। ভুট্টানির্ভর শিল্প-প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি এখানে।

মোতাহার হোসেন: এ অঞ্চলে প্রথম ভুট্টা চাষের ব্যবস্থা আমিই করি। ১৯৮৭ সালের কথা। আমি তখন উপজেলা চেয়ারম্যান। ব্র্যাক আমাকে থাইল্যান্ড নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে দেখি নদীর পাড়ে বালু জমিতে ভুট্টা চাষ করছে। পরিকল্পনা তখন থেকেই। সানিয়াজান ইউনিয়নে প্রথম চাষ শুরু হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ভুট্টা চাষ এবং অর্থায়নে আপত্তি জানালেন। আমি ২০০১ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে সানিয়াজানে নিয়ে এসে থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতার কথা জানালাম। ছবি, ভিডিও দেখালাম। অর্থায়নে রাজি হলেন। পরে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক আমার এলাকার কৃষকের জন্য ১৫ কোটি টাকা ঋণ বরাদ্দ করলো।

থাইল্যান্ড থেকে বীজ এনে ব্র্যাক প্রথমে সহায়তা করতে থাকলো। এখন আমার এলাকার প্রধানতম ফসল ভুট্টা। এর ফলনে একজন গরিব চাষিও নগদ অর্থ হাতে পাচ্ছে। জমির উপযোগিতা বাড়ছে। অভাব দূর হয়েছে। দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ ভুট্টা লালমনিরহাট থেকে পূরণ হচ্ছে, যে ভুট্টার পুষ্টিগুণ খুবই উন্নতমানের।

কৃষিনির্ভর বিভিন্ন কোম্পানিকে আমি বারবার অনুরোধ করেছি এখানে কিছু একটা করার। ভুট্টার ওপর নির্ভর করে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু তারা যোগাযোগ, বিদ্যুতের অজুহাতে বিনিয়োগ করতে চাইছে না।

জাগো নিউজ: শিল্পের জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা, গ্যাস-বিদ্যুৎ তো জরুরি।

মোতাহার হোসেন: বিদ্যুতের সমস্যা এখানে আর নেই বললেই চলে। যোগাযোগও আগের চেয়ে অনেক ভালো। গ্যাস তো আর চাইলেই সম্ভব নয়। সময় লাগবে।

এখানে বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় সুবিধা হতে পারে সস্তা শ্রম। এখানকার শ্রমিক গিয়ে ঢাকায়, গাজীপুরে শ্রম দিচ্ছে। সবকিছু ঢাকা ঘিরেই হওয়া চাই। এ কারণেই উন্নয়নের সুষ্ঠু বণ্টন হচ্ছে না। ‘উত্তরবঙ্গ’ নামে আমাদের আলাদা পরিচয় দাঁড় করিয়েছে।

জাগো নিউজ: জীবনের এ বেলায় মানুষের ভালোবাসা নিয়ে কী বলবেন?

মোতাহার হোসেন: ১৯৬৯ সালে বিএসসি পরীক্ষা দিয়ে স্কুলের শিক্ষকতা শুরু করি। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেই। এরপর সেনাবাহিনীর অফিসার পদে নিয়োগ পাই। উপজেলা চেয়ারম্যান, এমপি, মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব, হুইপ নির্বাচিত হয়েছি। মানুষের সঙ্গেই তো আছি। মানুষের ভালোবাসা না পেলে তো বারবার নির্বাচিত হতে পারতাম না। আর মানুষের প্রতি ভালোবাসা আছে বলেই তারা বিশ্বাস করছে-আস্থা রাখছে।

মোতাহার হোসেন: কোনো দুঃখবোধ আছে উন্নয়ন প্রশ্নে?

মোতাহার হোসেন: আমার এলাকা দুর্গম বলতেই পারেন। কিন্তু নদীর ভাঙন আর রেলের উন্নয়ন ছাড়া সব সমস্যাই প্রায় সমাধান করতে পেরেছি। ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে রেলেরও উন্নয়ন করা হয়েছে।

২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী বুড়িমারী এক্সপ্রেসের ঘোষণা দিলেন। ২০২২ সালে এসেও এর বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তিস্তা নদীর মতো আরেকটি দুঃখ তিনবিঘা এক্সপ্রেস না হওয়া।

সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে দিয়েছি জনগণের সেবা করবো বলে। জনগণের সঙ্গেই আছি। জনগণের সমস্যাই আমার সমস্যা। তিস্তা নদী ও রেলের উন্নয়ন না হওয়ায় মানুষ কষ্টে আছে, যা আমাকেও অস্বস্তি দেয়, দুঃখ দেয়।

তিস্তা নদীর ওপর সবচেয়ে বড় সেচ প্রকল্প। এটি আমার নির্বাচনী এলাকায়। অথচ এই সেচ প্রকল্পই আমার এলাকার জন্য ক্ষতি বয়ে আনছে।

জাগো নিউজ: কীভাবে?

মোতাহার হোসেন: এই ক্ষতির জন্য মূলত প্রথমত জিয়াউর রহমান এবং পরে এরশাদ দায়ী।

তিস্তা ব্যারেজের কারণে দেশের একটি অংশ উপকৃত হচ্ছে ঠিক, কিন্তু আমার এলাকা তো মরুভূমি হচ্ছে।

আমি একটি টিম নিয়ে ইন্ডিয়ার গজলডোবা বাঁধ দেখে এসেছি। সেখানে উভয় তীরই সেচ প্রকল্পের আওতায় রেখেছে। আর আমাদের এখানে একপাশে সেচের আওতায় রাখা হয়েছে। বন্যা-খরায় মরছে আমার এলাকার মানুষ, আর উপকার পাচ্ছে অন্য জেলার মানুষ।

জাগো নিউজ: এখন সুবিধার আওতায় আনার সুযোগ আছে কি না?

মোতাহার হোসেন: সেচের আওতায় আনার আর সুযোগ নেই আমার এলাকাকে। ব্যারেজের মূল নকশা ছিল আরও দশ কিলোমিটার ভাটিতে। তখন পানির ধারণক্ষমতা (রির্জাভার) আরও বেশি হতো। তা না করে একেবারে ইন্ডিয়ার সীমানার কাছাকাছি এই ব্যারেজ করা হয়। পানি রিজার্ভ করলেই ভারতে চলে যেত। তারা লাভবান হতো। পরে গেটগুলো তিন ফুট করে কাটা হয়। মূল জায়গা থেকে দশ কিলোমিটার উজানে হওয়ার কারণেই এই সমস্যা দেখা দেয় এবং লালমনিরহাট সেচ থেকে বঞ্চিত হয়। জিয়াউর রহমান ও এরশাদ সাহেবের কারণেই মূল নকশা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের প্রকৌশলীরা ভুলভাবে প্রভাবিত করেছিলেন।

এএসএস/এএসএ/জেআইএম

আমি ব্যক্তিগতভাবে তিস্তা মহাপরিকল্পনার তাগিদ দিচ্ছি। প্রতি সংসদ অধিবেশনে এ নিয়ে আলোচনা রাখছি। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে উত্তরের রূপ বদলে যাবে। মানুষের জীবন-জীবিকায় আমূল পরিবর্তন আসবে।

কৃষিনির্ভর বিভিন্ন কোম্পানিকে আমি বারবার অনুরোধ করেছি এখানে কিছু একটা করার। ভুট্টার ওপর নির্ভর করে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। কিন্তু তারা যোগাযোগ, বিদ্যুতের অজুহাতে বিনিয়োগ করতে চাইছে না।

তিস্তার দুঃখ দেখানোর কোনো জায়গা নেই আমাদের। কেউ মুখ তুলে তাকায় না। তিস্তা নদীর দু’তীরের মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সামান্য পানিতেই অতিবন্যা। আবার মাইলের পর মাইল বালুচর পড়ে থাকে শুষ্ক মৌসুমে।

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]