খোকন রইবেন চলচ্চিত্রের ইতিহাসে
নন্দিত চলচ্চিত্র পরিচালক শহীদুল ইসলাম খোকন। আর কোনোদিন তিনি মনিটরে চোখ রেখে ‘ওকে, ডান, টেক, কাট’ বলবেন না। কোনোদিন হাসবেন না রসবোধে। কোনোদিন মিষ্টি পান খাওয়া লাল টুকটুক মুখে বলবেন না কাউকে কোনো কথাও। তিনি যে এসবের বাইরে চলে গেলেন চিরদিনের জন্য।
সত্যি কী তাই? একদমই মানতে নারাজ তার দীর্ঘদিনের সহকর্ম নায়ক রুবেল। তিনি বলেন, ‘খোকন ছিলো আমার বন্ধু ও সহপাঠি। তার অসংখ্য ছবির নায়ক আমি। কখনো তার ছবিতে বঙ্গবন্ধু হয়ে এসেছি, কখনো কোনো বিপ্লবী, কখনো বা ন্যায় নিষ্ঠাবান কোনো পুলিশ হয়ে। তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা এমন যে চোখের সামনে না থাকলেও খোকন থাকবে অন্তরে। এবং আমি মনে করি চলচ্চিত্রের সাথেও তার সম্পর্কটাও এমনই। খোকনদের উত্থান হয় সময়ের প্রয়োজনে। এদেরে পতন হয় না কোনোদিন। তাই স্বশরীরে না থাকলেও খোকন আমাদের কাছে চিরদিন বেঁচে থাকবে।’
চিত্রনায়ক রুবেল ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, ‘সকাল থেকেই সবগুলো গণমাধ্যমে খোকন ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদ এসেছে। কিন্তু অনেক তারকাই এখানে অনুপস্থিত। অন্য কারো ক্ষেত্রে এটা হলে মেনে নেওয়া যায় কিন্তু খোকন ভাইয়ের ক্ষেত্রে মেনে নেওয়া যায় না।’
আজ সোমবার বিকেলে এফডিসিতে খোকনকে শেষ বিদায় জানাতে এসে এসব কথা বলেন রুবেল। এসময় এফডিসিতে উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুসহ আরো অনেকেই। তারাও খোকনকে নিয়ে কথা বলেন, স্মৃতিচারণ করেন।
খোকন স্মরণে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘আশি-নব্বই-এর সময়ে প্রখ্যাত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন খোকন। তার হাত ধরেই অনেক কলাকুশলী এ জগতে এসেছেন। তার হাত ধরেই হুমায়ূন ফরীদির মতো অভিনেতাকে উপহার পেয়েছিলো ঢাকাই চলচ্চিত্র।’
তিনি আরো বলেন, ‘আজকে যখন চলচ্চিত্র ঘুরে দাঁড়াচ্ছে তখন তাকে হারাতে হলো। তাই নতুন প্রজন্মের কলাকুশলীদের তার কাজ দেখতে হবে। সেখান থেকে শিখে এ শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে এতে হবে।’
এটিএম সামজুজ্জামান বলেন, ‘আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না যে খোকন চলে গেছে। সে তার কাজের মধ্য দিয়ে বেঁচে আছে, বেঁচে থাকবে।’
তিনি আর বলেন, খোকন যে চিন্তা চেতনা থেকে কাজ করতো তা অনেকেই করতে পারবে না। কিন্তু তার দেখানো পথে কাজের চেষ্টা করতে পারবে। সেটা করা উচিত। নতুনদের অনেক কিছু শিখার আছে, জানার আছে খোকনের কাছ থেকে।’
ওমর সানি বলেন, ‘আমার স্ত্রী মৌসুমি খোকন ভাইয়ের সর্বাধিক ছবির হিরোইন। সেই সুবাদে খোকন ভাইয়ের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক ছিল আমাদের। তার কাজ খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কিন্তু আফসোস, আমি তার ছবির নায়ক হতে পারিনি।’
ওমর সানি আরো বলেন, ‘খোকন ভাই মারা যাওয়াতে আমি বিস্মিত হইনি। তিনি এর মাধ্যমে মুক্তি পেয়েছেন। কিছু কিছু মৃত্যু মুক্তিও নিয়ে আসে।’
খোকনের স্মরণে কিংবদন্তি অভিনেত্রী আনোয়ারা বলেন, ‘খোকন আর আসবেন না, হাসবেন না এটাই ভাবা যায় না। কি দারুণ এক মানুষ ছিলেন। যেমনি চলচ্চিত্র জ্ঞান, তেমনি মানুষকে সম্মান করবার চমৎকার মানসিকতা ছিলো। খোকন আজ আর নেই। তিনি আমাদের রেখে চলে গেছেন। তার আত্মার শান্তি কামনা করি।‘
তার স্মৃতিচারণ করে আনোয়ারা বলেন, ‘খোকন ভাইয়ের কাছ থেকে মাঝেমধ্যে পান খেতাম। তার কাছে সবসময় মিষ্টি পান থাকতো। আমি মাঝেমধ্যে জিজ্ঞেস করতাম এত পান আপনি কোথায় পান? তিনি হেসে বলতেন-মুন্সিগঞ্জ ও কক্সবাজার থেকে পান আনি। এমন কত কথাই আজ মনে আসছে। এভাবেই স্মৃতিতে চির সবুজ হয়ে থাকবেন খোকন।’
খোকনের ছেলে হৃদয় ইসলাম বলেন, ‘আমার বাবা শুধু একজন নির্মাতাই ছিলেন না একজন আদর্শ বাবাও ছিলেন। এত ভালবাসতেন যা প্রকাশ করতে পারব না। দুনিয়ার সবকিছুর বিনিময়েও আমার বাবার হাসির মূল্য হবে না। সবাইকে তিনি ভালোবাসতেন। এজন্যই হয়তো মরনব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েও দীর্ঘদিন তিনি অনেক বেঁচে ছিলেন। সবাই আমার বাবার বিদেহি আত্মার জন্য দোয়া করবেন। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।’
এলএ/পিআর