আমরাও পারি
রাজু দেওয়ান, গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এক বছরের ছোট। ছোট-বড় বা জুনিয়র-সিনিয়রদের সঙ্গে মেশা রাজুর স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য। সমসাময়িক সব সেমিষ্টারের ছাত্র-ছাত্রীরা রাজুকে চিনে। সবার সঙ্গে রাজুর চেনা-জানা ও সখ্য ছিলো। সবার সঙ্গে মেশা- রাজুর একটা বড় গুণ। রাজুর পুরোনাম রাজু দেওয়ান। বাড়ি সাভারের আশুলিয়ায়। ৬ বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তনে রাজুর সঙ্গে দেখা হয়েছিলো। এরপর আর যোগাযোগ হয়নি। আমার পরিবারের কর্তা তাঁর কর্মস্থল ঢাকার পরিবর্তে নারায়ণগঞ্জ নির্ধারণ করলে ফতুল্লা থানার ভূইগড়ে বসবাস শুরু করি।
গত বছরের শেষ দিকে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার নিজ বিভাগে ফ্যাকাল্টি মেম্বার হিসেবে যোগদান করায় ফতুল্লা ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি চলে আসতে হয়। এক্ষেত্রে বাসার কর্তা আমার সহযোগী হয়ে তাঁর হেড অফিস ঢাকায় অফিস করতে শুরু করেন। সাভারের অরুণা পল্লীর একটি বাসায় আমরা উঠি। সাভারের সিএন্ড বি-আশুলিয়া রোডের দক্ষিণ পাশে অরুণা পল্লী, যা জলাশয়, পুকুর আর অরণ্যে ছায়াঘেরা এক নির্জন বসতী। সাম্প্রতিক সময়ে এখানে কিছু ভৌত অবকাঠামো গড়ে উঠেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ বিশাল আয়তনের অরুণা পল্লীর অধিকাংশ প্লটের মালিক। ইট পাথরে ঘেরা যারা ঢাকায় বসবাস করেন, অরুণা পল্লী তাদের জন্য মনে হবে এ এক সত্যিকারের গহীন পল্লী। ঢাকা শহরে বসবাসকারী এ প্রজন্মের যারা এখনো শিয়ালের ডাক শোনেননি, শিয়াল দেখেননি, সন্ধ্যার পর অরুণা পল্লী তাদের জন্য শিয়াল দেখার উৎকৃষ্ট স্থান। দল বেঁধে শিয়ালের হাঁটাহাঁটি আর ডাকাডাকি; যে কারো মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, এ কোন অরণ্যে এলাম!
নতুন জায়গায়, নতুন পরিবেশে নিত্য প্রয়োজনীয় ভোগপণ্য কেনাকাটার প্রয়োজন হয়। অরুণা পল্লী লাগোয়া কোনো লোকালয় না থাকায় সেসব পাওয়া সহজ নয়। এর মধ্যে গাভীর দুধ পাওয়া আরো কঠিন। পরিচিত এক লোকের মাধ্যমে জানতে পেরে দুধ আনার জন্য জিরাবর রাস্তার পাশে কাঠগড়ায় দেওয়ান বাড়ি খামারে যাই। দেখি এ খামারের মালিক আমার বিভাগের ছোট ভাই সেই রাজু। রাজু আমাকে দেখে চমকে যায়, আমিও বিস্মিত! বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজুর মধ্যে প্রাণ চাঞ্চল্য দেখেছি, গল্প-আড্ডায় মাতিয়ে রেখছিলো, সেই রাজু উদ্যোক্তা হয়েছে। ভাবতেই আমার ভালো লাগলো। রাজুর সঙ্গে আলাপ করে জানলাম যে, তার বাবার মৃত্যুর পর বড় ভাইয়ের উৎসাহ আর অনুপ্রেরণায় রাজু এ খামার গড়ে তুলেছেন। ২০০৯ সালে প্রথম ১টি গাভী দিয়ে খামারের কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে গাভীর সংখ্যা ৬০টি। প্রতিদিন উৎপাদিত দুধের পরিমাণ প্রায় সাড়ে তিন শ কেজি। রাজুর খামারের নাম ‘দেওয়ান ডেইরি ফার্ম’। দেওয়ান ডেইরি ফার্মে কাজ করে ১৫জন শ্রমিক। প্রত্যেকের মাসিক গড় বেতন দশ হাজার টাকার ওপরে। রাজু জানান, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে আমি চাকরির পেছনে ছুটি নাই। আমি নিজে আরো কয়েকজনের চাকরি ব্যবস্থা করেছি। রাজু আরো বলেন, লেখাপড়া করার মূল উদ্দেশ্য চাকরি করা নয়। উদ্যোক্তা হতে পারলে বরং দেশের জন্য বেশি কিছু করা যায়। উদ্যোক্তা হতে গেলে পুঁজির প্রয়োজন। রাজু মনে করেন, সেটাও খুব সমস্যা না। নিজের এবং আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতায় পুঁজি যোগাড় হয়ে যায়। আজকাল ব্যাংকগুলোতে এ ক্ষেত্রে ঋণ দিতে উৎসাহী। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন উদ্যোগ ও পরিকল্পনা। রাজু মনে করেন, গাভীর খামার গড়ে তোলার মধ্যদিয়ে রাজু শুধু নিজে কর্মে নিয়োজিত হয়েছেন- তা নয়, আরো পনেরটি পরিবার চলে এ খামারের আয় দিয়ে। পাশাপাশি দেশের দুধের চাহিদা পূরণেও তিনি অবদান রাখতে পারছেন। রাজু বহুমুখী উদ্যোক্তা। তিনি নিজেদের সম্পদ কাজে লাগিয়ে আরো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। সিএনবি-জিরাবর রাস্তার পাশে তার পৈত্রিক জমিতে দেওয়ান ইলেকট্রনিক্স নামে একটি শোরুম গড়ে তুলেছেন। এই শোরুমে চাকরি করছে ৫জন কর্মচারী।
বিশাল জনগোষ্ঠী ও ছোট আয়তনের বাংলাদেশকে সুখী ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেবে কিছু মানুষের সম্মিলিত প্রয়াস। রাজু এই মানুষদের একজন। আমরা বর্তমানে অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীনের উত্থান পর্বের কথা জানি। সমাজতান্ত্রিক চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও সেতুং ১৯৪৯ সালে চীনা বিপ্লবের পর কৃষি ও শিল্প নীতি প্রয়োগ করে চীনকে পরিবর্তনের পথে অগ্রসর করেছিলেন। এক সময় অর্থনৈতিকভাবে রুগ্ন ফিলিপিন্সও এখন জমি থেকে সর্বোচ্চ উপযোগ নেয়ার মধ্য দিয়ে উন্নত দেশ হিসেবে রূপান্তরের চেষ্টা করছে। ফিলিপিন্স সরকার বড় বড় বাড়ি নির্মাণ আইন দ্বারা সীমিত করে ফিলিপিন্সের জমিতে ধান এবং অন্যান্য ফসল উৎপাদনের আইন প্রয়োগ করেছে। ভিয়েতনামও বর্তমানে কৃষি ও শিল্পায়নের মাধ্যমে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। উদ্যোক্ততা রাজুর এসব কাহিনী জানা। তাই রাজু পৈত্রিক সব জায়গা-জমি অন্যদের মতো বিক্রি করে দুধ কিনে খেয়ে দিন পার করার চেয়ে উদ্যোক্ততা হয়েছে। এই রাজুদের ছোট ছোট অবদানের মধ্যদিয়ে দেশ এগিয়ে যাবে। রাজুর ভাষায় ‘শুধু উন্নত বিশ্বই নয়- আমরাও নিজেরাই নিজেদের দেশ গড়তে পারবো।’
লেখক : শিক্ষক, রাজনীতি ও প্রশাসন বিভাগ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়
এইচআর/পিআর