ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি নাকি পরাজয়ের স্বীকারোক্তি?

প্রশান্ত কুমার শীল
প্রশান্ত কুমার শীল প্রশান্ত কুমার শীল , গণমাধ্যম শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
প্রকাশিত: ১২:১৪ পিএম, ১২ এপ্রিল ২০২৬

শৈশবের সেই ছড়া “আমপাতা জোড়া জোড়া/ মারব চাবুক, চড়ব ঘোড়া”। এটি শুধু শিশুতোষ কৌতুক ছড়া নয়। এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ক্ষমতা, ভয় এবং নিয়ন্ত্রণের এক গভীর মনস্তত্ত্ব। ‘পাগলা ঘোড়া’ আসলে অনিয়ন্ত্রিত শক্তির প্রতীক। যে শক্তি কখনও ঔপনিবেশিক শাসকের হাতে, কখনও আধুনিক রাষ্ট্রনায়কের কৌশলে প্রকাশ পায়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এই ঘোড়াকে বশে রাখা সহজ নয়। একসময় যেমন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ব্যর্থ হয়েছিল, তেমনই আজকের বিশ্ব রাজনীতিতে সেই ‘পাগলা ঘোড়া’-র রাশ টানতে গিয়ে হোঁচট খেয়েছেন স্বয়ং ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ইরানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সংঘাত এবং আকস্মিক যুদ্ধবিরতির ঘোষণার প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—ট্রাম্প কেন এই সিদ্ধান্ত নিলেন? এটি কি কৌশলগত বিরতি, নাকি এক প্রকার বাধ্যতামূলক পশ্চাদপসরণ? একইসঙ্গে আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—এই যুদ্ধে প্রকৃত ‘লুজার’ কে?

প্রথমত, যুদ্ধবিরতির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ অর্থনীতি। যুদ্ধ মানেই অনিশ্চয়তা, আর অনিশ্চয়তা মানেই বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা। মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে ইরান, বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র। সংঘাত বাড়লে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়। যার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি। যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তাঁর প্রধান হাতিয়ার। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সেই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি ছিল প্রবল। ফলে যুদ্ধবিরতি ছিল এক ধরনের অর্থনৈতিক আত্মরক্ষার কৌশল।

দ্বিতীয়ত, সামরিক বাস্তবতা। ট্রাম্প শুরুতে যেভাবে ‘এক রাতে ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকি দিয়েছিলেন, বাস্তবে তা কার্যকর করা এত সহজ নয়। ইরান কোনো দুর্বল রাষ্ট্র নয় বরং এটি একটি জটিল ভূরাজনৈতিক শক্তি। যার রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ সক্ষমতা। যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত জয় অর্জনের পরিবর্তে সংঘাত ক্রমেই দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিচ্ছিল। এই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই ট্রাম্প হয়তো বুঝেছেন, এই যুদ্ধ তাঁর কল্পিত ‘দ্রুত বিজয়’ অর্জন করা এতো সহজ নয়।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক চাপ। ইউরোপীয় মিত্ররা শুরু থেকেই এই সংঘাত নিয়ে অস্বস্তিতে ছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। একইসঙ্গে চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তিধর রাষ্ট্রও এই সংঘাতকে বিস্তৃত আকার নেওয়া থেকে বিরত রাখতে সক্রিয় ছিল। ফলে ট্রাম্প এক ধরনের কূটনৈতিক একাকীত্বে পড়ে যান। ফলে যুদ্ধবিরতি এই চাপ থেকে বেরিয়ে আসার একটি উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে শুধু ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করলেই পুরো চিত্র স্পষ্ট হয় না। প্রশ্ন হলো—এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় ‘লুজার’ কে?

অনেক বিশ্লেষকের মতে, সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই। কারণ, এই যুদ্ধ আমেরিকার বৈশ্বিক নেতৃত্বের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। একসময় যে দেশ গণতন্ত্র ও নৈতিকতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো, আজ তার নেতৃত্বের ভাষায় যখন ‘সভ্যতা ধ্বংস’-এর মতো হুমকি শোনা যায়, তখন সেই নৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণাকে তাই অনেকেই কৌশলগত নয়, বরং বাধ্যতামূলক পিছু হটা হিসেবে দেখছেন।

এই সংঘাত আমাদের একটি মৌলিক সত্যের সামনে দাঁড় করায়। তা হলো শক্তি সব সমস্যার সমাধান নয়। আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ কেবল সামরিক সংঘর্ষ নয় বরং এটি অর্থনীতি, কূটনীতি এবং মানবিক মূল্যবোধের জটিল সমীকরণ। ‘পাগলা ঘোড়া’-য় চেপে বসা সহজ, কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ট্রাম্পের অভিজ্ঞতা সেই চিরন্তন সত্যকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। মহাভারতের আখ্যানে শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, প্রকৃত যুদ্ধের জন্য প্রয়োজন সংযম, দূরদৃষ্টি এবং নৈতিক অবস্থান। সেই গুণাবলির অভাবেই হয়তো আজকের এই পরিস্থিতি। যুদ্ধবিরতি আপাতত স্বস্তি এনে দিলেও, অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে অমীমাংসিত। আর যতদিন সেই দ্বন্দ্বের সমাধান না হবে, ততদিন ‘পাগলা ঘোড়া’ ছুটতেই থাকবে—নতুন রূপে, নতুন প্রেক্ষাপটে।

দ্বিতীয়ত, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। সৌদিআরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো জিসিসি ভুক্ত দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু এই সংঘাত তাদের মনে সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। আমেরিকা কি আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য তাদের? এর ফলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নতুন করে গঠিত হতে পারে। যা ভবিষ্যতে আরও বড় সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।

তৃতীয়ত, ইরান নিজেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। অবকাঠামো ধ্বংস, অর্থনৈতিক সংকট, এবং মানবিক বিপর্যয়—সব মিলিয়ে দেশটি গভীর সংকটে। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। তা হলো ইরান ভেঙে পড়েনি। বরং তারা আলোচনার টেবিলে নিজেদের শর্ত তুলে ধরে প্রমাণ করেছে, তারা এখনো একটি কার্যকর রাজনৈতিক শক্তি।

চতুর্থত, ইসরায়েলের ভাবমূর্তিও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এতদিন তাদের সামরিক ও গোয়েন্দা সক্ষমতা নিয়ে যে ‘অজেয়তার’ ধারণা ছিল, এই সংঘাত তা আংশিকভাবে ভেঙে দিয়েছে। একইসঙ্গে আমেরিকার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে।

তবে যদি এককভাবে ‘সবচেয়ে বড় লুজার’-এর কথা বলতে হয়, তাহলে অনেক বিশ্লেষকই আঙুল তুলছেন ট্রাম্পের দিকেই। দ্যা ইকোনমিস্ট (The Economist) এর বিশ্লেষণে তাঁকে এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় পরাজিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ, তিনি যে লক্ষ্য নিয়ে এই সংঘাতে জড়িয়েছিলেন তা হলো: ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন, আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, এবং পারমাণবিক হুমকি নির্মূল—তার কোনোটিই পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।

বরং এই যুদ্ধ তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করেছে। দেশের অভ্যন্তরে সমালোচনা বেড়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর নেতৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, এবং অর্থনৈতিক ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধবিরতি তাই তাঁর জন্য বিজয়ের ঘোষণার চেয়ে বেশি। যা মূলত একটি ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি। যদিও তা সরাসরি উচ্চারিত হয়নি।

এই সংঘাত আমাদের একটি মৌলিক সত্যের সামনে দাঁড় করায়। তা হলো শক্তি সব সমস্যার সমাধান নয়। আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ কেবল সামরিক সংঘর্ষ নয় বরং এটি অর্থনীতি, কূটনীতি এবং মানবিক মূল্যবোধের জটিল সমীকরণ। ‘পাগলা ঘোড়া’-য় চেপে বসা সহজ, কিন্তু তাকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। ট্রাম্পের অভিজ্ঞতা সেই চিরন্তন সত্যকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। মহাভারতের আখ্যানে শ্রীকৃষ্ণ বলছেন, প্রকৃত যুদ্ধের জন্য প্রয়োজন সংযম, দূরদৃষ্টি এবং নৈতিক অবস্থান। সেই গুণাবলির অভাবেই হয়তো আজকের এই পরিস্থিতি। যুদ্ধবিরতি আপাতত স্বস্তি এনে দিলেও, অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব রয়ে গেছে অমীমাংসিত। আর যতদিন সেই দ্বন্দ্বের সমাধান না হবে, ততদিন ‘পাগলা ঘোড়া’ ছুটতেই থাকবে—নতুন রূপে, নতুন প্রেক্ষাপটে।

লেখক : গণমাধ্যম শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
[email protected]

এইচআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।