বগুড়া

টাকা দিয়েও মিলছে না বোতলজাত সয়াবিন তেল, মুরগির দামে আগুন

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক বগুড়া
প্রকাশিত: ০৯:৪২ পিএম, ১২ এপ্রিল ২০২৬

উত্তরের বাণিজ্যিক কেন্দ্র বগুড়ার ফতেহ আলী বাজারে চাল, ডাল, সবজি ও মাছ-মাংসসহ প্রায় সব ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে সয়াবিন তেলের তীব্র সংকট আর পাকিস্তানি মুরগির লাগামহীন দামে সাধারণ ক্রেতাদের নাভিশ্বাস উঠছে।

রোববার (১২ এপ্রিল) সরেজমিনে দেখা যায়, বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র ফতেহ আলী বাজারে এখন নিত্যপণ্যের দামের লড়াই চলছে। একদিকে প্রশাসনের টাঙানো মূল্য তালিকা ক্রেতাদের কিছুটা স্বস্তি দিলেও, অন্যদিকে সরবরাহ সংকট আর দরদামের মারপ্যাঁচে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, টাকা দিয়েও মিলছে না ৫ লিটারের বোতলজাত সয়াবিন তেল। সপ্তাহের ব্যবধানে সোনালি বা পাকিস্তানি মুরগির দাম কেজিতে ১০০ টাকার বেশি বেড়ে যাওয়ায় আমিষের বাজারেও বিরাজ করছে তীব্র অস্থিরতা। সরবরাহ সংকটের অজুহাতে সয়াবিন তেলের সঙ্গে অন্য পণ্য দেওয়ার ট্যাগিং বাণিজ্য আর প্রতিটি নিত্যপণ্যের এই ঊর্ধ্বমুখী দামে পহেলা বৈশাখের আনন্দ ম্লান হওয়ার জোগাড় মধ্যবিত্তের।

রূপচাঁদা তেলের সেলসম্যান মো. সাগর জানান, তেলের সরবরাহ এখন এতটাই কম যে আগে যেখানে দৈনিক ২ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি হতো, সরবরাহ সংকটে এখন তা নেমে এসেছে মাত্র ৫০ হাজারে। খুচরা বিক্রেতা মো. রফিকুল ইসলাম তেলের বাজারের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলেন, ১ লিটার রূপচাঁদা ১৯২ টাকায় কিনে ১৯৫ টাকায় বিক্রি করছি। ২ লিটার ৩৮৪ টাকায় কিনে ৩৯০ থেকে ৩৯৫ টাকায় দিচ্ছি। কিন্তু ৫ লিটারের বোতল ৯৪০ টাকা দিয়েও এখন পাওয়া যাচ্ছে না। তেলের সংকটের এই সুযোগে চিনি ও ডালের বাজারও ঊর্ধ্বমুখী। গত সপ্তাহে ১০০ টাকা থাকা চিনি চলতি সপ্তাহে ১০৩ টাকা এবং ১৩০ টাকার মসুর ডাল ১৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

আমিষের বাজারে যেখানে সাধারণ মানুষ ভিড় করতেন একটু স্বস্তির খোঁজে, সেখানেও এখন আগুনের আঁচ। বিশেষ করে পাকিস্তানি বা সোনালি মুরগির দাম গত এক সপ্তাহে হু হু করে বেড়েছে। গত সপ্তাহে ৩২০ টাকায় বিক্রি হওয়া এই মুরগি এখন ৩৮০ থেকে ৪৩০ টাকা কেজি। মুরগি পট্টির ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম বলেন, আবহাওয়া পরিবর্তন আর রোগের কারণে অনেক মুরগি মারা যাচ্ছে, এর ওপর সরবরাহ কম। তাই দামটা একটু বেশি। বাজারে ব্রয়লার মুরগি ১৮০ টাকা এবং লেয়ার ৩২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে ইলিশের সরবরাহ নিয়ে মাছ ব্যবসায়ী আবুল কাশেম বলেন, গত বছরের চেয়ে সরবরাহ ভালো, দামও কেজিতে ২০০-৩০০ টাকা কম। তবে বাজারে ৮০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ ১৬০০ টাকা আর ১ কেজি ওজনের ইলিশ ১৮০০ টাকায় বিক্রি হওয়ায় ক্রেতাদের মাঝে ক্ষোভ রয়েই গেছে। দেড় কেজি ওজনের ইলিশের দাম ঠেকেছে ২২০০ টাকায়। মাছের বাজারের অন্যান্য পণ্যের মধ্যে রুই ৩৫০, টেংরা ৬০০, বোয়াল ১০০০, জাউর ৩০০, মাগুর ৫০০ এবং পাতাসি মাছ ১২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

এই বাজারের সবজি ব্যবসায়ি খোকন জানান, সপ্তাহের ব্যবধানে সবজির দামেও বড় রদবদল হয়েছে। গত সপ্তাহে ৬০ টাকার বেগুন আজ ৮০ টাকা, আর ৩০ টাকার টমেটো ও পেঁপে কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারে নতুন পটল ১০০ টাকা হলেও আলুর বাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা আছে। আলু বিক্রি হচ্ছে ২৫ টাকায়। পেঁয়াজের দাম মানভেদে কেজি প্রতি ৪০-৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মশলার বাজারে দেশি আদা ১৪০ টাকা, দেশি রসুন ১০০ টাকা এবং চায়না রসুন ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

শাকের সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও দামে রয়েছে ভিন্নতা। এখানে শাক বিক্রি হচ্ছে কেজি এবং আঁটি উভয় পদ্ধতিতেই। বাজারে লাল শাক, পুঁই শাক ও পাট শাক প্রতি কেজি ৫০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে আঁটি হিসেবে কিনলে লাল শাক ৩০ টাকা এবং পুঁই ও পাট শাক প্রতি আঁটি ২০ টাকায় মিলছে। এছাড়া কলমি শাক ও লাউ শাকের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়, যেখানে প্রতি আঁটি কলমি শাক পাওয়া যাচ্ছে ১৫ টাকায়। অন্যদিকে রান্নার অন্যতম অনুষঙ্গ ধনিয়া পাতা মানভেদে ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

চালের বাজারেও যেন শান্তি নেই; প্রতি কেজি চালের দাম গড়ে ২ টাকা করে বেড়েছে। বাসমতি ২২০ টাকা, চিনি আতপ ১৫০ টাকা এবং কালোজিরা চাল ১৩০ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। সাধারণের প্রিয় কাটারি চালের দাম কেজিতে ২ টাকা বেড়ে ৭৮-৮০ টাকা এবং মিনিকেট ৮৪ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বিআর-২৮ চাল ৬৫-৭০ টাকা, নাজিরশাইল ৯০ টাকা এবং রণজিত চাল ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।

বাজারে কেনাকাটা করতে আসা ক্রেতারা বলছেন, মূল্য তালিকা টানিয়ে রাখায় ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত দাম নেওয়ার সুযোগ কিছুটা কম পেলেও সরবরাহ সংকটের দোহাই দিয়ে পকেট কাটা থামছে না। বৈশ্বিক পরিস্থিতি আর স্থানীয় সরবরাহের এই টানাপড়েনে বগুড়ার সাধারণ মানুষের রান্নাঘরের বাজেট এখন এক বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

সয়াবিন তেলের এই সংকটের নেপথ্যে উঠে এসেছে ট্যাগিং বাণিজ্যের এক নতুন কৌশল। ফতেহ আলী বাজার দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. লেলিন শেখ এই পরিস্থিতির জন্য বিশ্ববাজারের জ্বালানি সংকট ও যুদ্ধকে দায়ী করলেও তেলের সাথে অন্য পণ্য চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও সামনে আনেন। তিনি জানান, ডিপো মালিকরা এখন শর্ত দিচ্ছেন যে তেল নিতে হলে সাথে চাল, আটা, ময়দা বা সুজি নিতে হবে যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে খুচরা বাজারে।

এল.বি/কেএইচকে/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।